লাশ নিয়ে চিকিৎসক-স্বজন হাতাহাতি, মৃতের ছেলেকে ‘কান ধরে উঠবস’
Advertisement
রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:৪২ পিএম
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের মধ্যে সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ ও মৃতের ছেলেকে কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শনিবার হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান এর ওই আদেশে মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আব্দুল বাসেতকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাহিদ ও সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. কানিজ সাবিহা।
হাসপাতাল ও স্বজনদের কাছে ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে জানা যায়, নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুর নাহার বেগম (৬২) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ভোরে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়।
তার ছেলে রিফাতের দাবি, মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি সেই সময় কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে মাকে অক্সিজেন দেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে চিকিৎসক আগে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই রোগীর মৃত্যু হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ স্বজনরা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালান এবং তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ঘটনার পরেই চিকিৎসক ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা জরুরি বিভাগের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
এদিকে স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার পর নুর নাহার বেগমের লাশ হিমঘরে নিয়ে রাখা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এর প্রতিবাদে তারা প্রথমে হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ করেন এবং পরে দুপুর বেলা ২ ঘণ্টা রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের মেডিকেল মোড় এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন।
মৃত নুর নাহার বেগমের বড় ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু বলেন, মায়ের মৃত্যুর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার মায়ের লাশ আটকে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমাদের লোকজন মায়ের লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পরও লাশ নামিয়ে হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। একজন মৃত মানুষকে নিয়েও হাসপাতাল কর্মচারী ও চিকিৎসকদের এমন আচরণ করবে তা কল্পনাও করিনি। তাই এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম হয়েছে।
এ সময় উত্তেজিত রমেকের ছাত্র ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মৃতের অপর এক ছেলে রিফাতকে আটক করে তাকে চিকিৎসকের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য করেন। পরে তাকে হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে নিয়ে গিয়ে সেখানে তাকে পুনরায় কান ধরে উঠবস করায় এবং তা ভিডিও ধারণ করে। তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে আমার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
এ কথা মঙ্গলবার জুম্মাপাড়ায় নিজ বাসায় এই প্রতিবেদককে বলেছেন ছোট ছেলে মো. রিফাত।
এ সময় তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে আনার পরে আমার মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় আমি এ সময় কিছুটা ক্ষুব্ধ হই; চিকিৎসক ও কর্মচারীদের সঙ্গে যা হয়েছে তা আমার শোকের কারণে অবচেতনভাবে হয়েছে। এটি আমার উচিত হয়নি। তাই ক্ষমা চেয়েছি; কিন্তু পরে ছাত্ররা আমাকে যখন পুনরায় পরিচালকের কক্ষে নিয়ে ক্ষমা চেয়ে কানধরে উঠবস করতে বলে সেই সময় আমি ভয় পাই ও অসহায় হয়ে পড়ি তখন মায়ের লাশ পাওয়ার জন্যই আমি কানধরে উঠবস করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার সঙ্গে এ আচরণ করা হবে আমি ভাবিনি।
এ নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, সেদিন যা ঘটেছে তা তদন্ত করে দেখার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এজন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মৃতের ছেলেকে কান ধরে উঠবস করার বিষয়টি সেই সময় তিনি জানতেন না। এ ঘটনাটি দুঃখজনক বলে তিনি মনে করেন। ঘটনা পর হাসপাতালে জরুরি সেবা বন্ধ ছিল। ছাত্র, কর্মচারী, চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মাঝে উত্তেজনা চলছিল, তাই কে কখন কী করেছে তা তিনি জানতেন না।
লাশ আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসপাতাল পরিচালক। তিনি বলেন, হাসপাতালের নিয়ম অনুসরণ করে লাশ দেওয়ার আগেই রোগীর স্বজনরা উত্তেজিত হয় পড়ে ওই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।
