রমেকে এক মেশিনে চলছে ক্যাথল্যাব, বাড়ছে হৃদরোগীদের ভোগান্তি
Advertisement
মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
ক্যাথল্যাবের দুটি মেশিনের মধ্যে একটি প্রায় এক বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে হৃদরোগ বিভাগে স্থাপিত ক্যাথল্যাবের (কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন ল্যাবরেটরি) দুটি মেশিনের একটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল। ফলে একমাত্র সচল মেশিনটির ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এতে উত্তরের আট জেলার হৃদরোগীদের ভোগান্তি বেড়েছে। প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগীকে ঢাকায় যেতে হচ্ছে। তবে আর্থিক সংকটে ঢাকায় গিয়েও চিকিৎসা নিতে পারছেন না অনেকে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যাথল্যাবের দুটি মেশিনের মধ্যে একটি প্রায় এক বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। সচল মেশিনটির ওপর চাপ কমিয়ে এর আয়ুষ্কাল বাড়াতে ‘রেশনিং পদ্ধতিতে’ অর্থাৎ পালা করে নির্দিষ্ট দিনে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
রমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উত্তরের আট জেলার হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীরা নিয়মিত এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য ২০১২ সালে ক্যাথল্যাবের দুটি ইউনিট চালু করা হয়। পরে দীর্ঘ সময় যান্ত্রিক ত্রুটিসহ নানা কারণে এর কার্যক্রম বন্ধ ছিল। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় ২০১৯ সালের প্রথম দিকে আবার ক্যাথল্যাবের কার্যক্রম চালু হয়। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন চিকিৎসকরা।
বর্তমানে সচল একটি মেশিনের মাধ্যমে এনজিওগ্রাম, হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে স্টেন্ট বা রিং বসানো এবং পেসমেকার স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা করানোর খরচ ও ভোগান্তি দুটিই কমেছে। রমেকে ক্যাথল্যাবের চিকিৎসার সফলতার হার ৯৯ দশমিক ২ শতাংশ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে রমেকের ক্যাথল্যাবে ১১০টি এনজিওগ্রাম, ২০টি রিং ও সাতটি পেসমেকার স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জন রোগী এনজিওগ্রামের জন্য ভর্তি হন। তাদের মধ্যে তিন থেকে পাঁচজনের রিং স্থাপনের প্রয়োজন হয়। প্রতি মাসে গড়ে দুই থেকে তিনটি স্থায়ী পেসমেকারও স্থাপন করা হয়।
এনজিওগ্রামের মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের ধমনিতে ব্লক বা সংকোচন শনাক্ত করা হয়। প্রয়োজন হলে বেলুন বা স্টেন্ট (রিং) বসিয়ে বন্ধ বা সংকুচিত রক্তনালি সচল করা হয়। তবে একটি মেশিন বন্ধ থাকায় রোগীর চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। প্রয়োজনের সময় সেবা না পেয়ে অনেক রোগীকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
গুরুতর রোগীদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের অনেকে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। যাদের আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
রমেক হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে হাসপাতালে প্রথম ক্যাথল্যাব চালু হয়। বেসরকারি হাসপাতালে হার্টের এনজিওগ্রাম করতে খরচ হয় ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালে এর খরচ ২ হাজার টাকা। একেকটি রিংয়ের দাম প্রকারভেদে ৭০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।
সরকারি হাসপাতালে রিং বসাতে খরচ হয় ২ হাজার টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে রিং বসানোর চার্জ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। পেসমেকার যন্ত্রের দাম দেড় লাখ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। এটি স্থাপনে বেসরকারি হাসপাতালে খরচ হয় ৬০ হাজার টাকার বেশি, যেখানে সরকারি হাসপাতালে খরচ হয় ২ হাজার টাকা।
রমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হরিপদ সরকার বলেন, ক্যাথল্যাবের একটি মেশিন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় একটি মেশিন দিয়েই পালাক্রমে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফিলিপস কোম্পানির মাধ্যমে ল্যাবের একটি মেশিন সচল করা হয়েছে। সেটি দিয়েই বর্তমানে হৃদরোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ল্যাব সচল রাখতে ফিলিপস কোম্পানির সঙ্গে কমপ্রিহেনসিভ মেইনটেন্যান্স কেয়ার (সিএমসি) চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একমাত্র সচল ক্যাথল্যাবটির আয়ুষ্কাল বাড়াতে রেশনিং পদ্ধতিতে রোববার, সোমবার ও মঙ্গলবার এনজিওগ্রাম এবং বুধবার ও বৃহস্পতিবার পেসমেকার ও রিং স্থাপনের কাজ করা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের অনেক রোগী অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। এনজিওগ্রামে রক্তনালিতে ব্লক ধরা পড়ার পর অর্থের অভাবে অনেকে রিং স্থাপন করতে পারেন না। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রিংসহ প্রয়োজনীয় সব উপকরণ সরবরাহ করা হলে দরিদ্র রোগীরা উপকৃত হতেন। বন্ধ মেশিনটি চালু হলে হৃদরোগীদের চিকিৎসাসেবাও বাড়বে।
অধ্যাপক হরিপদ সরকার বলেন, রমেক হাসপাতালে কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ না থাকাও বড় সীমাবদ্ধতা। পরীক্ষায় কোনো রোগীর বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হলে তাকে ঢাকায় যেতে হয়। সেখানে কম খরচে কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যাবে, তা নিয়েও রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রমেকে কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ থাকলে তুলনামূলক কম খরচে বাইপাস সার্জারি করা সম্ভব হতো।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আশিকুর রহমান বলেন, হাসপাতাল চত্বরে নির্মাণাধীন ১৫ তলা ৪৬০ শয্যার সমন্বিত ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা ইউনিটের কাজ আগামী বছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। তখন নতুন ক্যাথল্যাবও পাওয়া যাবে। এ কারণে স্বল্প সময়ের জন্য পুরনো ক্যাথল্যাব মেরামত অথবা নতুন ক্যাথল্যাব কেনার পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি এখন বিবেচনা করা হচ্ছে না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ঢাকায় জানানো হয়েছে।

-6ac0f68e19a41.jpg)
-6ac0f2b8c76bd.jpg)