Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগ

Advertisement

Icon

গাজীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগ

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগ

Advertisement

‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’—একটি মুহূর্তের অসাবধানতা কিংবা একটু বেপরোয়া মনোভাব একটি সাজানো সংসারকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিতে পারে। সেই নির্মম বাস্তবতার কিছু খণ্ডচিত্র উন্মোচিত হলো গাজীপুরে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ কর্তৃক আয়োজিত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে ১ কোটি ১ লাখ টাকার মোট ৩৫টি চেক বিতরণ করা হয়।

এটি রাষ্ট্রের একটি মানবিক উদ্যোগ, কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল স্বজনহারা মানুষের কান্নায় আর পঙ্গুত্বের আকুল আকুতিতে। টাকার অঙ্কে যে জীবনের মূল্য মাপা যায় না, তা প্রমাণ হয় সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখে।

১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বনাম এক মুহূর্তের নিয়তি

৩০ বছরের রুনা খাতুন এসেছিলেন তার দুই বছরের অবুঝ শিশুকে কোলে নিয়ে। তার হাতে তুলে দেওয়া হলো পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক। ঠিক এক বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তার পেশাদার চালক স্বামী।

রুনা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ১৫ বছরের ড্রাইভিং অভিজ্ঞতাও উনাকে বাঁচাতে পারল না। এই টাকা দিয়ে এখন আমি কী করব? আমি তো আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটাই হারিয়ে ফেলেছি।

রুনার এখন একমাত্র লক্ষ্য পিতৃহীন সন্তানকে কোনোমতে মানুষ করা; কিন্তু স্বামীর শূন্যতা আর এই চেকে ঢাকা পড়বে না।

নব্বই বছরের পিতার অবিনাশী শোক

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ৯০-ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ তুলা শেখ। এ বয়সে যেখানে সন্তানের কাঁধে ভর দিয়ে তার চলার কথা, সেখানে তিনি এসেছেন তার আদরের ধনকে হারানোর পর অনুদান নিতে। এক বছর আগে এক ব্যস্ত রাস্তা পার হতে গিয়ে পিষ্ট হয়েছিল তার সন্তান। বৃদ্ধ বাবার কাছে এ অনুদানের অর্থ তার সন্তানের স্মৃতির এক টুকরো করুণ স্মারক মাত্র।

চেকটি হাতে নিয়ে কাঁপা গলায় তিনি বললেন, আমার যাওয়ার বয়স হয়েছিল, কিন্তু চলে গেল ছেলেটা। এমন দুর্ঘটনা যেন আর কোনো বাবার জীবনে কখনো না আসে।

মহাসড়কের সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত

চল্লিশ বছর বয়সি জীবন প্রসাদ যখন ক্রাচে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, হলরুমের সবাই তখন স্তব্ধ। মহাসড়কে এক অটোরিকশা দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে। সেই অভিশপ্ত মুহূর্তে তিনি নিজেও একই অটোরিকশার যাত্রী ছিলেন। নিজের শারীরিক পঙ্গুত্ব আর চোখের সামনে স্ত্রীর চলে যাওয়ার সেই বীভৎস দৃশ্য আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়। জীবন প্রসাদের কাছে এই অনুদান স্ত্রীর জীবনের বিনিময়ে এক অপূরণীয় সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

কর্মক্ষম হাত থেকে কর্মহীন অন্ধকারের গল্প

৪৮ বছরের মো. সোনু মিয়া ছিলেন ঢাকার কারওয়ানবাজারের এক ব্যস্ত আড়তের দিনমজুর। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভোর ৫টায় কাজে বেরিয়েছিলেন তিনি; কিন্তু একটি ঘাতক ট্রাকের চাকা তার জীবনের চাকা থামিয়ে দেয়, কেড়ে নেয় একটি পা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি আজ সম্পূর্ণ অচল।

সালাম তার ছোট ছোট দুই সন্তানের কথা ভেবে শিউরে ওঠেন, আমার তো একটা পা চলে গেল, কিন্তু আমার এই অবুঝ বাচ্চা দুটোর ভবিষ্যৎ কী? ওদের কে দেখবে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো চেকে লেখা থাকে না।

উপরের চারটি ঘটনা ভিন্ন হলেও সবই আসলে এক সুতোয় গাঁথা—যার নাম সড়ক দুর্ঘটনা। সত্যিকার অর্থে যারা এ ভয়াবহতার শিকার হন, কেবল তারাই এর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের এ দুঃখের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন অনুষ্ঠানের সভাপতি গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।

সভাপতির বক্তব্যে তিনি এক ভিন্নধর্মী তুলনা টেনে আনেন। তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বে যদি একটি হরিণ বা একঝাঁক হাঁসও রাস্তা পার হয়, তবে হাইওয়ের সমস্ত গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের দেশে চালকদের এই ধৈর্যের বড্ড অভাব।

তিনি মহাসড়কের বর্তমান বিশৃঙ্খলার কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে কমগতির অটোরিকশা বা সাইকেলগুলো হাইওয়েতে বড় বড় দ্রুতগামী গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে।

একটি বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন, জীবনটা অনেক ছোট, কিন্তু এই জীবনের হেফাজতের দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই।

মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ফেরাতে জেলা প্রশাসক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুসংবাদ ও পদক্ষেপের কথা জানান।

সুসংবাদগুলো হলো- গাজীপুর জেলার মহাসড়ক সংলগ্ন হকারদের অন্যত্র পুনর্বাসন করা হবে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রয়োজনীয় বাইপাস সড়ক চালু করা হবে, হাইওয়েতে হুটহাট শ্রমিক আন্দোলনের সংস্কৃতি বন্ধে এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণের মতো ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এসএম আশরাফুল আলম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুনসহ জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, এনজিও কর্মী ও সুধীরা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

‘সিলেটে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে’ গভীর রাতে বাসায় ঢুকে প্রকৌশলীকে মারধর-হুমকি

‘সিলেটে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে’ গভীর রাতে বাসায় ঢুকে প্রকৌশলীকে মারধর-হুমকি

ফাঁড়িতে হামলা করে আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা, রামদায়ের কোপে ২ পুলিশ আহত

ফাঁড়িতে হামলা করে আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা, রামদায়ের কোপে ২ পুলিশ আহত

শিশুকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে বিপাকে, ওসিসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

শিশুকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে বিপাকে, ওসিসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

হত্যা মামলায় একই পরিবারের চারজনের যাবজ্জীবন

হত্যা মামলায় একই পরিবারের চারজনের যাবজ্জীবন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম