স্টেশনে যাত্রীদের পানি পান করিয়ে ছেলের স্মৃতি খুঁজে ফেরেন মুন্নু সেখ
Advertisement
রাজবাড়ী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৩ পিএম
স্টেশনে যাত্রীদের পানি পান করিয়ে ছেলের স্মৃতি খুঁজে ফেরেন মুন্নু সেখ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘টাকা ছাড়া ঠাণ্ডা পানি কে খাবেন? টিউবওয়েলের একেবারে ফ্রেশ ঠাণ্ডা পানি’- এভাবেই জোরে হাঁকডাক দিয়ে পানিভর্তি বালতি হাতে প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের জানালায় যাত্রীদের পানি হাতে তুলে দিচ্ছেন এক হতভাগ্য বাবা।
ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের তৃষ্ণা মিটিয়ে ছেলের স্মৃতি মনে করে খুঁজে ফিরছেন তার হারানো সন্তানকে। সেই খুঁজে ফেরা ছেলের বাবার নাম মুন্নু সেখ।
মুন্নু পেশায় একজন চটপটি বিক্রেতা হলেও প্রতিদিন দুপুরে রাজশাহীগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন কালুখালী স্টেশনে পৌঁছামাত্রই পানি নিয়ে হাজির হন প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন থামামাত্রই তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে তুলে দেন ঠাণ্ডা পানির বোতল। যাত্রীদের পানির বোতল দিয়ে পানিটুকু পান করিয়ে তাদের কাছে থাকা বোতলটি জানালা দিয়ে নিচে ফেলতে যাত্রীদের অনুরোধ করেন।
জানা যায়, ২০১৮ সালে মুন্নু শেখের ৯ বছরের ছেলে সবুজ শেখের ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। ছেলেকে নিয়ে নিয়মিত এই ট্রেনে করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাতায়াত করতেন। অনেক সময় ফেরার পথে অসুস্থ ছেলেকে এক বোতল পানি কিনে দেওয়ার মতো টাকাও তার পকেটে থাকত না। দীর্ঘ দিন লড়াই শেষে ক্যানসারের কাছে হার মেনে ২০২০ সালে না-ফেরার দেশে চলে যায় তার ছেলে সবুজ।
সন্তানের মৃত্যু মুন্নু শেখকে দমিয়ে রাখতে না পারলেও তিনি এক সময় প্রতিজ্ঞা করেন- যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিনই ট্রেনে কোনো তৃষ্ণার্ত যাত্রীকে পানির কষ্ট পেতে দেবেন না। তার এরকম প্রতিজ্ঞা থেকেই তিনি প্রতিদিন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন কালুখালী স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই নিজের চটপটির দোকান বন্ধ করে দিয়ে পানি সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরপর ঠাণ্ডা পানির বোতল হাতে ছুটে যান ট্রেনের প্রতিটি বগির সামনে। তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে তুলে দেন একে একে পানির বোতল।
ট্রেনের যাত্রী সোহেল রানা বলেন, রাজবাড়ীর বসন্তপুর একটা জরুরি কাজে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ট্রেনে কালুখালী স্টেশনে এসেই ট্রেনের হকার মুন্নুকে বিনা টাকায় মানুষকে বোতল ভরা পানি দিতে দেখলাম। মুন্ন যে সেবাটা দিচ্ছেন এটা নজিরবিহীন। তার একটা বোতল সংগ্রহ করে পানি খেয়ে তৃষ্ণা মেটালাম। তার ভালো মানুষি স্বভাব আমাকে মুগ্ধ করেছে।
অপর যাত্রী রোজি সিদ্দিকী বলেন, যাত্রাপথে বিনামূল্যে ট্রেনে থাকা যাত্রীদের মুন্নু ভাইয়ের পানি খাওয়ানোর বিষয়টা একদম ভালো লেগেছে। পানি হচ্ছে জীবন। সেই পানি পান করিয়ে মুন্নু ভাই আমাদের কত মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। তার এ কর্মটা সত্যিই প্রশংসনীয়।
মুন্নু শেখ বলেন, যখন কোনো মানুষের হাতে পানি তুলে দেই তখন আমার ছেলে সবুজের কথাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সবুজের স্মৃতি বুকে ধারণ করে মানুষকে পানি পান করাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, যাত্রীদের পানি খাওয়ানোর জন্য প্রথমে বোতল সংগ্রহ করি। পরে বোতলগুলো ভালোভাবে ধুইয়ে টিউবওয়েলের ঠাণ্ডা পানি বোতলে ভরে রাখি। এরপর ট্রেনে আসা যাত্রীদের কাছে ছুটে গিয়ে বোতল দিয়ে এভাবে ছয় বছর যাবত পানি পান করানোর কাজ করছি।
তিনি বলেন, আমার আর্থিকভাবে কিছুটা ক্ষতি হলেও মনে কোনো কষ্ট নেই। আমার কাজে মানুষ আমাকে দোয়া করছেন, এটাই আমার জন্য বড় পাওয়া।
