চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যার ক্ষত
চার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২০ হাজার নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১০:১৫ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে চার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাটহাজারী ও সাতকানিয়া উপজেলায়। হাটহাজারীতে ১৮৫টি আর সাতকানিয়ায় ৬৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার প্রায় ২০ হাজারের মতো নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে এসব ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া গেছে।
একই সঙ্গে জেলার ১৫টি উপজেলা ও চট্টগ্রাম মহানগরের ২৪টি ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে জনজীবন, কৃষি, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৪০০ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের হিসাবে, চট্টগ্রাম মহানগরের ২৪টি ওয়ার্ডের প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এতে ২ হাজার ২৪৬টি বসতঘর, ৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ১২৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শ্রেণিকক্ষ, মাঠ, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ নষ্ট হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে বেশ সময় লাগবে।
ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- হাটহাজারীতে সবচেয়ে বেশি ১৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতকানিয়ায় ৬৫টি, মহানগরে ৫০টি, চন্দনাইশে ২৮টি, রাঙ্গুনিয়ায় ২০টি, ফটিকছড়িতে ১২টি, সীতাকুণ্ডে ৭টি, বাঁশখালী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, মীরসরাই, পটিয়া ও লোহাগাড়ায় ৫টি করে, সন্দ্বদ্বীপে ৩টি, বোয়ালখালীতে ৩টি এবং রাউজানে ২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বন্যায় চট্টগ্রাম দক্ষিণের তিন উপজেলা সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলা বিশুদ্ধ পানির উৎস নলকূপের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি ও বিভিন্ন অবকাঠামোর পাশাপাশি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া, কাদামাটি জমে যাওয়া এবং পাহাড় ধসের কারণে প্রায় ২০ হাজার নলকূপ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ হাজার ৬৯৪টি টয়লেট। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে পড়েছেন এ তিন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ-এ তিন উপজেলায় ১৯ হাজার ৯৬১টি নলকূপ সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ১১০টি নলকূপ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, আর ৭ হাজার ৮৫১টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপগুলোর মধ্যে সরকারি ও ব্যক্তিগত উভয় ধরনের নলকূপ রয়েছে।
ডিপিএইচই জানিয়েছে, হাটহাজারীসহ অন্য উপজেলাগুলোতে বন্যার কারণে নলকূপ ও টয়লেটের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে দক্ষিণাঞ্চলের এ তিন উপজেলায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন্যার পানি নেমে গেলেও কিছু কিছু এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অভাব রয়ে গেছে। অধিকাংশ নলকূপে এখনও ঘোলা, দুর্গন্ধযুক্ত ও দূষিত পানি উঠছে। অনেক নলকূপ কাদা ও বালুতে ভরে গেছে, আবার অনেক নলকূপ পাহাড় ধস ও পানির স্রোতে ভেঙে গেছে। ফলে হাজার হাজার পরিবার এখন দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক এলাকায় মানুষ পুকুর, খাল কিংবা অনিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহার করায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে। এছাড়া বন্যায় উপজেলার ২ হাজার ১৫৬টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস যুগান্তরকে জানান, প্রায় ২০ হাজারের মত নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলা
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল সাতকানিয়া উপজেলায়। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। চট্টগ্রাম মহানগরের ২৪টি ওয়ার্ডের প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। এতে নগরীর সড়ক, বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এছাড়া বাঁশখালীর ১৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৬০ শতাংশ, আনোয়ারার ১১টি ইউনিয়নের ৭০ শতাংশ, কর্ণফুলীর ৫টি ইউনিয়নের ২৫ শতাংশ, সন্দ্বীপের ১৬টি ইউনিয়নের ৮০ শতাংশ, সীতাকুণ্ডের ১০টি ইউনিয়নের ৪০ শতাংশ, মীরসরাইয়ের একটি ইউনিয়নের ১০ শতাংশ, ফটিকছড়ির ১০টি ইউনিয়নের ৬৫ শতাংশ, হাটহাজারীর ১০টি ইউনিয়নের ৮০ শতাংশ, রাউজানের ৬টি ইউনিয়নের ৬০ শতাংশ, রাঙ্গুনিয়ার ১০টি ইউনিয়নের ৩০ শতাংশ, বোয়ালখালীর ৭টি ইউনিয়নের ২০ শতাংশ, পটিয়ার ১৮টি ইউনিয়নের ২৫ শতাংশ, চন্দনাইশের ১০টি ইউনিয়নের ৩৫ শতাংশ এবং লোহাগাড়ার ৫টি ইউনিয়নের ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
