শহর-গ্রামে ভয়াবহ লোডশেডিং, তীব্র গরমে জনজীবনে নাভিশ্বাস
Advertisement
আতাউল করিম খোকন, ময়মনসিংহ ব্যুরো
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ময়মনসিংহে তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শহরতলী ও গ্রাম এলাকার মানুষ। জেলার প্রতিটি উপজেলায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও প্রকট। ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলার ও গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ময়মনসিংহ ছাড়াও জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলার বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানেও বিদ্যুতের একই চিত্র। দিনে-রাতে দফায় দফায় বিদ্যুৎ না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং শিক্ষার্থীদের কষ্ট এখন চরমে পৌঁছেছে। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চিকিৎসাসেবা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বেশ কিছুদিন যাবত নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। একবার গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টার আগে বিদ্যুতের দেখা মেলে না। এতে এ অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। নগরীর প্রায় সব এলাকায় দিনে ও রাতে বারো থেকে ষোলো ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। আর গ্রামীণ এলাকাগুলোতে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
বিদ্যুৎ সরবরাহ কম হওয়ায় নগরীর চড়পাড়া, মাসকান্দা, বাঘমারা, ব্রাহ্মপল্লী, সিকে ঘোস রোড, নাটক ঘরলেন, গাঙ্গিনারপাড়, ভাটিকাশর, নওমহল, কেওয়াটখালি, নতুনবাজার, জিলা স্কুল মোড়, পণ্ডিত পাড়া, আকুয়া, কলেজ রোড, জামতলা মোড়, সানকিপাড়া, পুলিশ লাইন, কাঠগোলা এলাকাসহ নগরীর প্রায় সব এলাকায় লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে নগরীর নতুনবাজার এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী শামছুন নাহার বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পাম্পের সাহায্যে পানিও ওঠানো সম্ভব হচ্ছে না। দুপুরে অসহনীয় গরমে বাইরে বের হয়ে আসতে হচ্ছে।
ভাটিকাশর এলাকার মাজহারুল ইসলাম বলেন, বাচ্চারা তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। গত কয়েক দিন ধরে এমন লোডশেডিং চলছে। দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে সহ্য করা যায়, কিন্তু রাতের বেলায়ও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে অসহ্য লাগে। রাতে গরমে ঘুমাতে পারি না। খুব কষ্টে আছি আমরা।
গাঙ্গিনারপাড় এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, একটু গরম বেশি হলেই বারবার লোডশেডিং হচ্ছে। এতে আমাদের ব্যবসার খুব ক্ষতি হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
জামতলা এলাকার শিক্ষার্থী কুনতলা শবনম ছোয়া বলেন, বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় আমাদের লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। একদিকে প্রচণ্ড গরম অন্যদিকে লোডশেডিং তাই গরমে ঘরে বসে পড়তে অসুবিধা হচ্ছে। সরকারের এদিকে নজর দিলে আমাদের ভোগান্তি কমে আসবে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের ময়মনসিংহ জেলার সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা মাসুম বলেন, ময়মনসিংহ নগরীর সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা চরপাড়া। এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ আসে। এই এলাকায় প্রায় তিনশর বেশি ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল রয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটু পরপর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ না থাকলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভিন্ন মেশিন বন্ধ থাকে। এতে করে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী এবং স্বজনদের বিপাকে পড়তে হয়। এছাড়াও ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মুমূর্ষু রোগীদের অপারেশন করার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। তেলের দাম বেশি থাকায় জেনারেটর দিয়ে কাজ চালালে খরচ অনেক বেশি হচ্ছে। আর এটা কোনো স্থায়ী সমাধান না। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই। এভাবে বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষকে সেবা দিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে আমাদের।
ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ জোনে অফপিক সময়ে ৪৫০ থেকে ৪৬০ মেগাওয়াট, পিক সময়ে ৫০০ থেকে ৫২০ মেগাওয়াট এবং দিনের অন্যান্য সময়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট ঘাটতি থেকে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হয়।
এদিকে ময়মনসিংহ পাওয়ার গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল হক জানান, ময়মনসিংহ জোনের জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ১৩শ থেকে ১৪শ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১ হাজার ৯১ থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। যে কারণে এই লোডশেডিংয়ের সমস্যায় আমাদের পড়তে হচ্ছে।
