ইসমাইল হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘তুমি যদি টাকা-পয়সা নাও, তাহলে শান্তিতে থাকতে পারবা। আর যদি মনে করো এখন আমার ভাইকে (ইসমাইল হোসেন) জেলে ঢুকাবা, আমি যেভাবেই হোক ভাইকে বের করব। বের করলে তখন তুমি আর শান্তিতে থাকতে পারবা না।’ — এভাবেই ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে এক অসহায় কিশোরীকে হুমকি দিয়েছে ধর্ষকের বোনসহ স্বজনেরা। শুধু ওই কিশোরীকেই নয়, তার মাকেও হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘শান্তিতে থাকতে দেবে না, জানে মেরে ফেলবে। পুলিশ তো সব সময় সাথে সাথে থাকবে না।’
বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সামনে ‘যুগান্তর’-এর কাছে এভাবেই নিজেদের আতঙ্কের কথা তুলে ধরেন ভুক্তভোগী কিশোরী ও তার মা। ঢামেক হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) থেকে জরুরি সেবা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, স্বামীর নির্যাতন থেকে বাঁচানোর আশ্বাস দিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের খেজুরবাগ এলাকার ভাড়া বাসায় ডেকে ১৬ বছরের ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন শুভাঢ্যা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন। এ ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় দায়ের করা মামলায় ইসমাইল এবং তার সহযোগী রাজু ও শাওনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে ইসমাইলকে গ্রেফতারও করেছে। ঘটনার পর ইসমাইলকে তার সাংগঠনিক পদ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে স্বেচ্ছাসেবক দল। ইসমাইলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে তার কাছ থেকে ইট-বালু নিতে বাধ্য করাসহ নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী কিশোরী বলেন, আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। স্বামী যৌতুক চেয়েছিল। আমার বাবা নেই, মা যৌতুক দিতে পারেনি; এ জন্য স্বামী আমার ওপর নির্যাতন করত। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এক বছরের ছেলেকে নিয়ে মায়ের কাছে কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের জিয়ানগরে চলে আসি। সিদ্ধান্ত নিই স্বামীকে ডিভোর্স দেব। কিন্তু আমার স্বামী মায়ের বাসায় এসে ঝামেলা করছিল। তখন স্থানীয় একজন বলেছিল, ইসমাইলের কাছে গেলে ন্যায়বিচার পাব এবং বাচ্চার খরচ ও কাবিনের টাকাও তুলে দেবে। এ জন্য ইসমাইল ভাইয়ের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি কথা দিয়েছিলেন সব ঝামেলা মিটিয়ে দেবেন। কিন্তু তিনি যে এভাবে আমার সর্বনাশ করবেন, তা বুঝতে পারিনি।’
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী কিশোরী আরও বলেন, ‘আমি অনেক কেঁদেছি, তার হাত-পা ধরেছি, এমনকি ‘বাবা’ বলেও ডেকেছি। কিন্তু তিনি আমাকে ছাড়েননি। জোর করে আমার পোশাক খুলে ভিডিও করে ইসমাইল। তখন সে বলে— তুই যদি এখন আমার সাথে খারাপ কাজ না করিস, তাহলে সব অনলাইনে ছেড়ে দেব। আমি এখানকার নেতা, পুলিশ-প্রশাসন আমার পকেটে থাকে। এরপর বটি এনে গলায় ধরে আমার সাথে খারাপ কাজ করে।’
ভুক্তভোগী কিশোরীর মা বলেন, মামলা করার পর ডেকে নিয়ে ধর্ষকের পরিবারের সদস্যরা টাকা দিয়ে বিষয়টি মিটমাট করতে চেয়েছে। আমি রাজি না হওয়ায় তারা ভবিষ্যতে আমাদের বড় ধরনের ঝামেলায় ফেলার হুমকি দিচ্ছে।’ তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, আমার কোনো টাকা লাগবে না, আমি বিচার চাই; যেন আর কোনো অসহায় মেয়ে এভাবে ধর্ষণের শিকার না হয়।’
এ বিষয়ে জানতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তবে ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জামিলুল হক বলেন, হুমকির বিষয়টি আমাদের জানা নেই। আইন অনুযায়ী ভুক্তভোগীদের সব ধরনের সহায়তা ও নিরাপত্তা দেওয়া হবে।’
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় হওয়া মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে ফয়সাল নামে এক যুবকের সঙ্গে ওই কিশোরীর বিয়ে হয়। তাদের একটি সন্তান রয়েছে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বর্তমানে তারা আলাদা থাকছেন। প্রায় এক মাস আগে ইসমাইলের সঙ্গে ওই কিশোরীর পরিচয় হয়। ইসমাইল তার স্বামীর সঙ্গে বিরোধ মীমাংসা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফোন করে তাকে একটি ক্লাবের সামনে যেতে বলেন ইসমাইল। সেখানে যাওয়ার পর রাজু তাকে ইসমাইলের ভাড়া বাসায় নিয়ে যান বলে অভিযোগ কিশোরীর। সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে স্বামীকে তালাক দিতে টাকা লাগবে বলে জানানো হয় ওই কিশোরীকে। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়। এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে রাত ১১টার দিকে একটি কক্ষে নিয়ে কিশোরীটিকে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার কথা কাউকে জানালে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের চরম ক্ষতি করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী।



-6aa18ec109237.jpg)