একে একে হারিয়েছেন ১০ সন্তান-স্বামীকে, অনাহারে দিন কাটছে মাহফুজার
মুহসিন আল জাবির, হাতিয়া (নোয়াখালী)
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
মাহফুজা খাতুন
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একে একে কোলের দশটি সন্তানকে নিজ হাতে কবরে শায়িত করেছেন, বছর খানেক আগে চিরতরে ছেড়ে চলে গেছেন একমাত্র জীবনসঙ্গী স্বামীও।
চরম শোক, নিঃসঙ্গতা আর নিদারুণ দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে এক জরাজীর্ণ টিনের ঘরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বৃদ্ধা মাহফুজা খাতুন।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই বিধবা বৃদ্ধার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই; সরকারি স্থায়ী কোনো সামাজিক সুরক্ষার আওতায় না থাকায় প্রতিবেশীদের সাহায্য আর অনাহার-অর্ধাহারেই দিন পার করছেন তিনি।
মাহফুজা খাতুনের জীবনের ইতিহাস চরম দুঃখ ও শোকের এক জীবন্ত দলিল। তার গর্ভে জন্ম নিয়েছিল মোট ১০টি সন্তান—যার মধ্যে ছিল ৬ জন ছেলে ও ৪ জন মেয়ে; কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শৈশব ও বিভিন্ন বয়সে একে একে তার সব সন্তানই মৃত্যুবরণ করেছে। মাতৃত্বের সব অবলম্বন হারানোর পর বছরখানেক আগে তার স্বামীও মারা যান। ফলে এই বৃদ্ধ বয়সে তার খবরাখবর নেওয়ার কিংবা একমুঠো অন্ন মুখে তুলে দেওয়ার মতো কোনো নিকটাত্মীয় বা আপনজন আর রইল না। বর্তমানে পুরোপুরি অভিভাবকহীন অবস্থায় একা টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের একটি নির্জন জায়গায় অত্যন্ত ভাঙাচোরা, ঝরঝরে ও স্যাঁতসেঁতে একটি টিনের ঝুপড়িতে মাহফুজা খাতুনের বসবাস। ঘরের টিনগুলোতে মরিচা ধরে ফুটো হয়ে গেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই পানি চুইয়ে পড়ার উপক্রম হয়। ছাউনি ও বেড়া প্রায় ধ্বংসের মুখে। বয়োবৃদ্ধ শরীরে এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও অরক্ষিত ঘরে একা বসবাস করা যেকোনো সাধারণ মানুষের জন্যই চরম ভীতি ও কষ্টের। যেকোনো দুর্যোগ বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় আশ্রয়টুকু ধসে পড়ার সার্বক্ষণিক আতঙ্কে কাটে তার প্রতি মুহূর্ত।
চোখের জলে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বৃদ্ধা মাহফুজা খাতুন জানান, ক্ষুধা নিবারণের জন্য নিয়মিত খাবার জোটানো তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো দিন প্রতিবেশীরা বাড়ি থেকে তরকারি বা রান্না করা খাবার দিলে তা খেয়ে ক্ষুধা মেটান। আর সাহায্য না পেলে শুধু লবণ-মরিচ দিয়ে ভাত মেখে অথবা শুকনা খাবার খেয়েই দিন পার করেন।
তিনি বলেন, পবিত্র রমজান মাসে আত্মীয়-স্বজন বা আশপাশের মানুষের দেওয়া ফিতরা ও জাকাতের সামান্য অর্থ দিয়ে কয়েক মাস কোনোমতে চালিয়ে নেন; কিন্তু সেই সাহায্য ফুরিয়ে গেলে আবার অন্যের দরজায় হাত পাততে হয়।
বৃদ্ধা মাহফুজার অভিযোগ, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে চরম দুঃসময়েও তিনি কোনো ধরনের স্থায়ী সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পাননি। তার নামে এখনো পর্যন্ত কোনো বিধবা ভাতা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড ইস্যু করা হয়নি। মাঝে মাঝে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেবল কিছু চাল বা শুকনো খাদ্যসামগ্রী প্রদান করা হলেও তা তার দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার জন্য খুবই অপ্রতুল। এমন হৃদয়বিদারক বাস্তবতায় উপজেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে অবিলম্বে একটি স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা করা ও বসবাসের উপযোগী একটি নিরাপদ ঘর নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন অসহায় এই নারী।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল ইতিবাচক আশ্বাস দিয়ে বলেন, সন্তান ও স্বামী হারিয়ে একজন বয়োবৃদ্ধ নারীর এভাবে কষ্টে দিনযাপন করার বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। অতি দ্রুত উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার সার্বিক খোঁজখবর নেওয়া হবে।
