ডিম উৎপাদনে স্বাবলম্বী ফকিরহাট, চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি ডিম যাচ্ছে সারা দেশে
Advertisement
ফকিরহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
বাড়তি ডিম বাগেরহাট ছাড়াও ঢাকা, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে সরবরাহ করা হয়।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডিমের দাম স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন সময়ে আমদানি করতে হয় ডিম। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা। এখানে বছরে প্রায় ৬ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ ডিম রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। তবে খাদ্য, ওষুধ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাপের মুখে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা।
খামারি ও ডিম ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, ২০১৯-২০ সালের তুলনায় বর্তমানে ফকিরহাটে বছরে ডিম উৎপাদন কমেছে প্রায় ১ থেকে দেড় কোটি। তাদের দাবি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব এবং জাতীয় পর্যায়ের বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় ছোট ও মাঝারি খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফকিরহাটে সরকারি হিসাবে ডিম উৎপাদিত হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ ৬২ হাজার। উপজেলায় নিবন্ধিত বাণিজ্যিক লেয়ার খামার রয়েছে ২১১টি এবং হাঁসের খামার ২৫টি। এসব খামারে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার লেয়ার মুরগি ও ১ লাখ ৪৮ হাজার হাঁস রয়েছে। তবে খামারিদের হিসাবে, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে উপজেলায় হাঁস-মুরগির সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ফকিরহাটের প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার মানুষের বছরে ডিমের চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ ১৮ হাজার। সে হিসাবে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর বছরে প্রায় ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৮২ হাজার ডিম উদ্বৃত্ত থাকে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ডিম উৎপাদিত হয়। এসব ডিম বাগেরহাট ছাড়াও ঢাকা, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে সরবরাহ করা হয়।
ফকিরহাট উপজেলার লেয়ার খামারি ও বাণিজ্য ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী নওশের আলী বলেন, ২০১৯-২০ সালের দিকে ফকিরহাটে বর্তমানে উৎপাদিত ডিমের তুলনায় বছরে প্রায় ১ থেকে দেড় কোটি বেশি ডিম উৎপাদিত হতো। কিন্তু খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, নানা প্রতিকূলতা ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক খামারি পিছিয়ে পড়েছেন।
তিনি বলেন, স্থানীয় প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন অনেকটাই আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। অতিরিক্ত গরম বা শীতে মুরগির ডিম উৎপাদন কমে যায়। অনেক সময় রোগে মুরগি মারা যায়। অন্যদিকে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার আধুনিক শেডে মুরগি পালন করায় তাদের উৎপাদন তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে।
নওশের আলীর দাবি, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উৎপাদিত খাদ্য ব্যবহার করায় তাদের উৎপাদন খরচ কম পড়ে। কিন্তু প্রান্তিক খামারিদের বেশি দামে পোলট্রি ফিড কিনতে হয়। ফলে একই বাজারে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ছোট খামারিরা টিকতে পারছেন না।
ফকিরহাট সদর ইউনিয়নের খামারি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত তার খামারে ৬০ হাজার লেয়ার মুরগি ছিল। বর্তমানে তা কমিয়ে ১১ হাজারে নামিয়ে এনেছেন। এখন প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার ৫০০ ডিম উৎপাদিত হয়।
তিনি বলেন, ২০১৯ সালে ৫০ কেজি লেয়ার ফিডের বস্তার দাম ছিল ১ হাজার ৬৭৫ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৯৬০ টাকা। একটি ডিম উৎপাদনে আগে খরচ হতো সাড়ে ৩ টাকা। বর্তমানে খরচ হচ্ছে প্রায় ৮ টাকা ৭০ পয়সা। অথচ পাইকারি বাজারে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে ৯ টাকায়। এতে কখনো কখনো লোকসান হচ্ছে। খুচরা বাজারে দাম বেশি থাকলেও পাইকারি বাজারে দাম কম।
লখপুর ইউনিয়নের বিকে পোলট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিডের স্বত্বাধিকারী মো. বিল্লাল হোসেন জানান, তার খামারে বর্তমানে ১২ হাজার ৫০০ লেয়ার মুরগি রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১১ হাজার ডিম উৎপাদিত হয়। এসব ডিম দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। তিনি বলেন, খাদ্য ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামার পরিচালনায় চাপ তৈরি হয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৪০০ হাঁস-মুরগিকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৫৪টি হাঁস-মুরগিকে চিকিৎসাসেবা এবং ৫৫৩ জন খামারিকে আধুনিক পদ্ধতিতে ডিম উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাসান আলী বলেন, খামারিদের উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু ডিমের দাম প্রায় একই রকম রয়েছে।

