তের ঘণ্টা পর মিলল কাপড়ে মোড়ানো হালিমার দেহ
Advertisement
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৮ এএম
তিন বছরের হালিমা আক্তারকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। তিন সন্তানকে নিয়ে সকালের নাস্তা করেছিলেন রাশেদা আক্তার। স্বামী নাছির উদ্দীন ও তিন সন্তানকে নিয়ে জমির মাঝখানে ভাঙাচোরা একটি ঘরে তাদের সংসার। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিচিন্তা হিন্দু পাড়ার পাশে তাদের সেই ছোট্ট ঘর।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ৭ টার দিকে নাস্তা শেষে শিশুরা যে যার মতো খেলতে চলে যায়। কিন্তু এক ঘণ্টা পরই পরিবারের মধ্যে নেমে আসে আতঙ্ক। তিন সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, তিন বছরের হালিমা আক্তারকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
প্রথমে বাড়ির আশপাশে খাল ও চাষের জমি থেকে শুরু করে পরিচিত স্থানে খোঁজ করেন পরিবারের সদস্যরা। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছোটাছুটি, পরিচিতদের কাছে জিজ্ঞাসা—কোথাও মিলছিল না হালিমার সন্ধান। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরটি ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে। শিশুটিকে খুঁজতে একত্র হন প্রতিবেশী ও গ্রামবাসী। বাড়ির আশপাশ, সম্ভাব্য বিভিন্নস্থান—সবখানেই চলতে থাকে খোঁজাখুঁজি।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উদ্বেগ। সন্তানকে হারানোর আশঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েন মা রাশেদা আক্তার। একপর্যায়ে কয়েক দিন আগে প্রতিবেশী আবদুল আউয়ালের পরিবারের সঙ্গে ঝগড়ার বিষয়টি সামনে আসে। সেই বিরোধের জেরে হালিমাকে আটকে রাখা হয়েছে কি না, এমন সন্দেহ থেকে গ্রামবাসী ওই বাড়িতেও খোঁজ করেন। তবে তখন শিশুটির কোনো সন্ধান মেলেনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থেকে শুরু করে মসজিদের মাইকে হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সন্দেহভাজন বাড়িটি ঘিরে তল্লাশি শুরু করে। অবশেষে শনিবার রাত ৯ টার দিকে পাওয়া যায় হালিমাকে। তবে জীবিত নয়— বাড়ির ১ শত ৫০ ফুট পূর্বে প্রতিবেশী আবদুল আউয়ালের ঘরের আলনার পেছনে কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় পড়ে ছিল তিন বছরের শিশুটির নিথর দেহ। সকাল থেকে যে শিশুটিকে ফিরে পাওয়ার আশায় সবাই ছুটছিলেন, রাতের অন্ধকারে তার মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে সেই অপেক্ষার করুণ পরিণতি ঘটে।
মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন মা রাশেদা আক্তার। তার অভিযোগ, প্রতিবেশী পরিবারের সঙ্গে পূর্ববিরোধের জের ধরে তার মেয়েকে হত্যা করতে পারে অথবা কারো থেকে টাকা নিয়ে মেয়েকে হত্যা করতে পারে।
তিনি দাবি করেন, হালিমার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল, শরীর কালো হয়ে গেছে, বিভিন্ন স্থানে ফুলে গেছে,পড়নে প্যান্ট ভিজে ছিল, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।
হালিমার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন আশপাশের গ্রামের শত শত মানুষ। শোক, ক্ষোভ আর নানা প্রশ্নে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। যে বাড়িতে সকালেও ছিল স্বাভাবিক জীবনযাপনের ব্যস্ততা, সেই বাড়িতেই সন্ধ্যার পর নেমে আসে শোকের মাতম।
তার প্রতিবেশী তাজু সওদাগর বলেন, বড়দের মধ্যে ঝগড়া থাকতে পারে, এই মাছুম শিশুটির কী দোষ ছিল যে তাকে এই ভাবে হত্যা করতে হবে। যে বয়সে মায়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেড়ানোর কথা, উঠানে খেলাধুলা আর হাসি-আনন্দে কাটার কথা দিন—সেই বয়সেই তার এমন করুণ পরিণতি পুরো এলাকা থমকে গেছে বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আবদুল আউয়াল, তার মেয়ে আসমা ও ছেলে রবিউলকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ।
তিনি বলেন, ‘নিহত হালিমা সকাল থেকে নিখোঁজ ছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর সন্দেহভাজন আবদুল আউয়ালের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে ঘরের আলনার পেছন থেকে হালিমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য শিশুটির মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

