গলাচিপায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দেদার ইলিশ শিকার
Advertisement
গলাচিপা দক্ষিণ (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গলাচিপায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে দেদার ইলিশ শিকার। আইনকে তোয়াক্কা না করে অসাধু প্রভাবশালী একটি মহল এ মাছ শিকারে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে। মাছ শিকারের আগে গ্রাহকের নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হয়েই ইলিশ দেওয়ার কথা স্বীকার করেন এসব ব্যবসায়ীরা। এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় চলছে ইলিশ নিধন।
গলাচিপার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে অনেকটা প্রকাশ্যেই এসব ব্যবসা করার অভিযোগ রয়েছে। মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন নদী ও সাগরে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে এই গোপন বেচাকেনা। অপরদিকে অভিযান চলাকালেও স্থানীয় জেলেদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয় ভ্রাম্যমাণ আদালতকে। এদিকে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে উপজেলার অন্তত ১০ থেকে ১৫টি স্থানে দালাল ও নির্ধারিত ক্রেতাদের মাধ্যমে চলছে অবৈধ ইলিশ বিক্রি। গলাচিপার বিভিন্ন এলাকায় শনি ও রোববার ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে গলাচিপা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ দিনে গলাচিপায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ২৮৫ মেট্রিক টন ইলিশ জব্দ করা হয়। এ সময় এক লাখ ৫৭৫ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের জাল জব্দ করা হয়েছে; যার বাজার মূল্য ২৩ লাখ ৬২০ টাকা এবং ১২টি মামলায় ৬ জন জেলেকে সাজা ও ২০ হাজর টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, মোবাইল করলে ইলিশ মিলবে ঠিকই কিন্তু কোনো অপরিচিত ব্যক্তির কাছে মাছ বিক্রি করা হয় না। জেলেদের নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা সব বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণ করে। নির্ধারিত ব্যক্তিকে ফোনে অর্ডার দিলেই ব্যাগে করে পৌঁছে যায় ইলিশ মাছ।
অভিযোগ আছে, চরবিশ্বাসের প্রত্যন্ত এলাকা নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চলাকালে অনেক জেলে উল্টো প্রশাসনের ট্রলারকে ধাওয়া দেয়। একদিকে অভিযান চলে অন্যদিকে ইলিশ শিকার করে জেলেরা। দেদার মাছ ধরা এবং বিক্রি করা হয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে।
অপরদিকে গলাচিপা পৌর এলাকা সংলগ্ন রামনাবাদ নদী, চিকনিকান্দির দয়াময়ী মন্দিরসংলগ্ন তেতুলিয়া পয়েন্ট, বন্যাতলীর তেতুলিয়া পয়েন্ট, পানপট্টি লঞ্চঘাট এলাকার আগুনমুখার মোহনায় জেলেরা প্রশাসনের নজর এড়াতে রাতের আঁধারে জাল ফেলছে। প্রশাসনের ট্রলার দেখামাত্রই তারা দ্রুত বনবিভাগের সংরক্ষিত বনে লুকিয়ে গা-ঢাকা দেয়।
রোববার সকালের দিকে ছদ্মবেশে ইলিশের ক্রেতা সেজে ফোন দেওয়া হয় চরবিশ্বাস ইউনিয়নের জেলে মো. মন্নানের কাছে। ইলিশ চাইতেই প্রথমেই নাম-পরিচয় জানতে চান। পরে ক্রেতা ভেবে রোববার ২টার দিকে চরআগস্তি বাজারে অপেক্ষা করতে বলেন। সেখানে ২টার পর ইলিশ মাছ দেওয়ার নিশ্চয়তা দেন।
একইভাবে চরবিশ্বাস এলাকার মো. মিজানের কাছে ফোন দিলে তিনি কয়েক দফায় প্রশ্ন করে নিশ্চিত হন সঠিক ক্রেতার। এরপর তিনি ইলিশ মাছের বিভিন্ন গ্রেডের দাম বলেন। এক কেজির ইলিশ বিক্রি হয় ১৫০০ টাকায়, এক কেজির নিচের ইলিশ ৫০০-৬০০ টাকা, এর পরে ছোট মাছ বিক্রি করা হয় ৪০০ টাকা কেজি। তবে চাইলেই এসব মাছ তিনি সরাসরি হাতে দিতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, চরকাজল মিজানের ওয়ার্কশপে টাকা রেখে গেলে সেখানেই পৌঁছে দেওয়া হবে চাহিদামতো ইলিশ মাছ।
গলাচিপার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা লঞ্চঘাট, বড় শিবা, চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চর আগস্তি, জিমতলা, নোমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা খেয়াঘাট, চরবাংলা, রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী, পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট, সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা, পানপট্টি লঞ্চঘাট, বোয়ালিয়া স্লুইসগেট, পক্ষিয়া স্লুইসগেট, লঞ্চঘাট, লোন্দা স্লুইসগেট, গলাচিপা-পাটুয়া খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী দালালদের মাধ্যমে ইলিশ ধরা ও বিক্রি করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা বলেন, এসব চক্রের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পায় না। এমনকি ইলিশ মাছ ধরে আনার পর নৌকা বা মাছের কাছে মোবাইল ফোন নিয়েও যাওয়া নিষেধ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গলাচিপা উপজেলা মৎস্য অফিসার ভিক্টর বাইন বলেন, আমরা মৎস্য অফিস ও সরকার ঘোষিত বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রেখেছি। প্রতিদিনই একাধিক অভিযান চলে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় অনেক সময় সব জায়গায় দ্রুততম সময়ে পৌঁছানো সম্ভব না হলেও সেখানে অভিযান করা হয়।
তার কাছে জেলেদের হামলার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, চরবিশ্বাস নোমোর স্লুইস এলাকা এমনিতেই দুর্গম। সেখানে আমাদের অভিযান চলাকালে ওই এলাকার সংঘবদ্ধ একটি চক্র আমাদের ওপর হামলা করার চেষ্টা করে এবং ডাকচিৎকার করে। পরে অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
