Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

পূজার আনন্দ ছুঁতে পারেনি লতা রানীকে, রাত কাটে অন্যের বারান্দায়

Advertisement

Icon

হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম

পূজার আনন্দ ছুঁতে পারেনি লতা রানীকে, রাত কাটে অন্যের বারান্দায়

দুর্গাপূজার আনন্দের মাঝেও আশ্রয়হীন লতা রানী। দিন কাটে পরিত্যক্ত ভবনে, রাত কাটে অন্যের বারান্দায়: ছবি যুগান্তর

Advertisement

‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, 

রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।

বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,

একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।

একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,

তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।’

পল্লিকবি জসীম উদদীনের ‘আসমানী’ কবিতার এই পঙক্তিগুলোতে আসমানীদের ঘরের দৃশ্য তুলে ধরেছেন কবি। কবিতায় আসমানীদের জরাজীর্ণ অন্তত একটি ঘর ছিল, কিন্তু কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের ডাংহাট গ্রামের ৫৩ বছর বয়সি লতা রানীর নেই নিজের সেই নিরাপদ আশ্রয়টুকুও।

চারদিকে এখন দুর্গাপূজার আনন্দ। মণ্ডপে মণ্ডপে আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য আর নতুন পোশাকে মানুষের উচ্ছ্বাস; অথচ লতা রানীর কাছে উৎসবের চেয়ে বড় চিন্তা দুবেলা খাবার আর রাতের নিরাপদ আশ্রয়। অর্থের অভাবে এবার পূজামণ্ডপেও যাওয়া হয়নি তার। উৎসবের এ সময়েও তার জীবনে আনন্দের চেয়ে অভাব আর অনিশ্চয়তাই বড়।

স্বামী নাটু রায়ের মৃত্যুর পর গত ১৫ বছর ধরে একটি পরিত্যক্ত সরকারি ব্লক সুপারভাইজারের কার্যালয়ে বসবাস করছেন লতা রানী। ভবনটির দরজা-জানালা নেই, নেই বিদ্যুৎ। সুপারি গাছের পাতা দিয়ে জানালার ফাঁকা ঢেকেছেন, কাঠ আর ছেঁড়া কাপড় দিয়ে তৈরি করেছেন দরজা; কিন্তু তাতেও রাতের নিরাপত্তা মেলে না। তাই সন্ধ্যা হলেই আশ্রয়ের জন্য যেতে হয় প্রতিবেশীর বাড়িতে। সেখানেও ঘরে জায়গা মেলে না, রাত কাটে বারান্দায়।

একসময় সংসার ছিল তার। স্বামী মারা যাওয়ার পর বদলে যায় জীবনের হিসাব। নিজের কোনো সন্তান নেই, সৎ ছেলে-মেয়েরাও খোঁজখবর নেন না। শেষপর্যন্ত পরিত্যক্ত ভবনটিই হয়ে ওঠে তার ঠিকানা। সেখানে একটি কক্ষে সরস্বতী দেবীর পূজার স্থান, অন্য কক্ষে রান্নার ব্যবস্থা। দুটি ছেঁড়া কাঁথা, তিনটি শাড়ি, একটি চুলা, একটি বালতি আর একটি হাঁড়ি- এই সামান্য সম্বলেই চলছে তার জীবন।

প্রতিবেশী দয়াল চন্দ্র বর্মণ বলেছেন, অন্তত পনেরো বছর ধরে এই বেচারি এখানে থাকেন। স্বামী বেঁচে থাকতেই জমিজমা যা ছিল তা বিক্রি করে গেছেন। এখন এই বেচারির যাওয়ার জায়গা নেই।

লতা রানীর কষ্ট এখানেই শেষ নয়। দৃষ্টিশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। চার বছর আগে চোখে অস্ত্রোপচার করিয়েও স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে পাননি। তিন মাস আগে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় পাশের পুকুরে পড়ে যান। পরে গ্রামবাসী তাকে উদ্ধার করেন। চোখে ঠিকমতো দেখেন না, অথচ পাশে থাকার মতো আপনজনও নেই।

প্রতিবেশী চিনি বালা বলেন, “তিন মাস আগোত ডিগিত পরি মরবের ধরছিল। গ্রামবাসী উদ্ধার করি কোনোমতে বাঁচাইছে। এই ঘরোত আনি থুইছিল। মুই দেখাশুনা করছোং। হামরা না দেখলে কুনদিনে মোরিল হয়।”

প্রতিবেশীদের সহযোগিতাই এখন তার ভরসা। বিধবা ভাতা পান, কিন্তু সেই সামান্য টাকায় খাবার, চিকিৎসা আর নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা কঠিন। যে বয়সে একটু নিশ্চিন্তে থাকার কথা, সেই বয়সে প্রতিটি দিন পার করতে হচ্ছে অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে।

স্থানীয় মিলন মিয়া বলেছেন, “ইনি চোখে দেখেন না। থাকার জাগাও নাই। সরকার যদি এই মহিলাকে থাকার জাগা দিলেন হয় তাইলে শেষ বয়সে শান্তিতে থাইকপার পাইল হয়।”

প্রতিবেশী মাধব চন্দ্র বলেছেন, “বিএস কোয়ার্টারে থাকতেছে। এখানে দরজা, জানালা কিচ্ছু নাই। এজন্য রাতে আমাদের বাড়ির বারান্দায় থাকেন উনি। আমাদের পরিবারের লোকসংখ্যা বেশি এজন্য ঘরে জায়গা দিতে পারি না।”

দুর্গাপূজা আসে, আবার চলেও যায়। মণ্ডপের আলো নিভে যায়, থেমে যায় উৎসবের কোলাহল; কিন্তু লতা রানীর জীবনের অন্ধকার কাটে না। তার চাওয়া খুব বেশি নয়- একটি নিরাপদ ঘর, যেখানে রাত হলে অন্যের বারান্দায় আশ্রয় খুঁজতে হবে না, যেখানে চোখ বন্ধ করলে অন্তত মনে হবে- এই ঘরটুকুই তার নিজের।

এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোছা. ববিতা খাতুন বলেছেন, উনার নাম্বারে আমরা কথা বলেছি। আমি চেক করলাম উনি আমাদের একজন  বিধবা ভাতাভোগী। এবার আমরা পে-রোল দিয়েছি দুই-একদিনের মধ্যে ওনার ভাতার টাকা ঢুকবে। অন্য কোনো সুযোগ সুবিধা এলে অবশ্যই আমরা ওনাকে সহায়তা করব।

জসীম উদদীনের ‘আসমানী’ কবিতার মতো লতা রানীর জীবনও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া কখনো কখনো শুধু একটুখানি নিরাপদ আশ্রয়। উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই আনন্দের আলো পৌঁছায় সমাজের অবহেলিত মানুষের ঘরেও।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

মীরসরাইয়ে স্বজনদের তিন দিনব্যাপী বইপড়া উৎসব সম্পন্ন

মীরসরাইয়ে স্বজনদের তিন দিনব্যাপী বইপড়া উৎসব সম্পন্ন

বর্ষা এলেই শুরু হয় ভাঙন, ঢেউ গিলে খায় ফসলি জমি!

বর্ষা এলেই শুরু হয় ভাঙন, ঢেউ গিলে খায় ফসলি জমি!

ময়মনসিংহ মেডিকেলে হাম আক্রান্ত আরও ১ শিশুর মৃত্যু

ময়মনসিংহ মেডিকেলে হাম আক্রান্ত আরও ১ শিশুর মৃত্যু

মীরসরাইয়ে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় পিকআপচালক নিহত

মীরসরাইয়ে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় পিকআপচালক নিহত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম