দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশাহারা সাধারণ মানুষ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাজারে গিয়ে মাছ-মাংসের দাম শুনে ফিরে আসতে হচ্ছে অনেককে। সন্তানের পছন্দের খাবার কেনার ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না। কোনো পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে মাছ-মাংস, আবার কারও সংসারে চাল, ডাল আর আলুই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা। এমনকি কোনো কোনো পরিবারে সন্তানের জন্য দুধ কেনার টাকাও জুটছে না। সংসারের খরচ সামলাতে কেউ কমিয়েছেন খাবারের পরিমাণ, কেউ বাদ দিয়েছেন প্রয়োজনীয় পণ্য। তবু মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না স্বল্প আয়ের মানুষ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি চাপে পড়েছেন মধ্যবিত্তরাও। সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযুদ্ধে প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে নতুন সংকট। একদিকে বাজারের বাড়তি খরচ, অন্যদিকে যাতায়াত, রান্না ও অন্যান্য ব্যয়। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি আয়। বরং কারও কারও কাজ ও উপার্জন কমেছে। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে বিলাসিতা তো দূরের কথা, মৌলিক প্রয়োজনেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। কমছে খাবারের বৈচিত্র্য, সঞ্চয়ে পড়ছে টান, অপূর্ণ থাকছে সন্তানের আবদার।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা, বিক্রেতা ও নানা পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমন চিত্র। তাদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট, দ্রব্যমূল্যের চাপ এখন আর শুধু বাজারের হিসাব নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যাভ্যাস ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সংকট।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিফাতের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে তার ব্যবসায়ও। আগে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা নেমে এসেছে প্রায় তিন হাজার টাকায়। আয় কমে যাওয়ায় সংসার ও ব্যবসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
রিফাত বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে। আগে যে আয় হতো, এখন তা হচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় জিনিসও কিছুটা ত্যাগ করতে হচ্ছে। কোনোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে আছি, আর কি।’
রাস্তার পাশের আরেক দোকানি মিজানের অবস্থা আরও করুণ। আগে সপ্তাহে এক-দুবার মাছ-মাংস খেতে পারলেও এখন সবজি কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। দৈনিক আয় ছয় থেকে সাতশ টাকা হলেও খরচ হচ্ছে সাত থেকে আটশ টাকা। ঘাটতি মেটাতে খাবারের খরচ কমানো ছাড়া উপায় নেই তার।
মিজান বলেন, ‘আমরা নিম্নমধ্যবিত্তরা বেশি কষ্টে আছি। অতি নিম্নবিত্তরা কারও কাছে হাত পাততে পারে, কিন্তু আমরা তো পারি না। সন্তানের আবদার পূরণ করা তো দূরের কথা, প্রয়োজনও ঠিকমতো মেটাতে পারছি না।’
বাজারের বাড়তি খরচে দিশাহারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মধ্যবিত্তরাও। এক দম্পতি জানান, বাজারে ঢুকলেই অন্তত দুই হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। কয়েক ধরনের সবজি কিনতেই চলে যায় পাঁচশ টাকা। মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতন হলে বাজারের খরচেই ব্যয় হয় অর্ধেকের বেশি। এরপর যাতায়াত ও অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় তো রয়েছেই।
একটি পোশাক কারখানায় মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কাজ করেন সাইফ। তার মতে, পণ্যের দাম বাড়ারও একটি সহনীয় সীমা রয়েছে। সেই সীমা পেরিয়ে গেলে মানুষের পক্ষে আগের জীবনযাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাইফ বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার। আবেগের জায়গা থেকে সব সময় যেটা খেতে অভ্যস্ত, সেটাই খেতে চাই। কিন্তু সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের চাহিদার সঙ্গেও আপস করতে হচ্ছে। একেবারে খাওয়া বন্ধ করার সুযোগ নেই, তাই কমিয়ে-বাড়িয়ে খেতে হচ্ছে।’
আগে কম টাকায় বেশি পণ্য কেনা গেলেও এখন কেনাকাটায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। বাজারে এসে বেশি দাম দেখে অনেক সময় প্রয়োজনীয় পণ্য না কিনেই ফিরতে হয়। আবার একান্ত প্রয়োজনের কারণে কোনো কোনো পণ্য বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে।
খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, ক্রেতারা আগের মতো কেনাকাটা করছেন না। অনেকে প্রয়োজনের তালিকা ছোট করেছেন, কমিয়েছেন পণ্যের পরিমাণ। আহাদ আলী নামে এক বিক্রেতা বলেন, ‘ক্রেতা খুবই কম। সবাই হিসাব করে কেনাকাটা করছেন। আমরা পাইকারিতে আগে যে দামে পণ্য কিনতাম, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বিক্রি করতে হচ্ছে বেশি দামে।’
তিনি বলেন, গত এক বছরে পাম তেল ও পোলাওয়ের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে পাইকারিতে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে পাম তেল কিনতেন। এখন সেই দামে আর কিনতে পারছেন না। ফলে বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দরে। বিক্রির দাম গিয়ে ঠেকেছে ১৮৫ থেকে ১৮৬ টাকায়।
মাছ বিক্রেতা শাকিলের অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, ‘তিন-চার বছর আগে ১৮০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে মোটামুটি ভালো পরিমাণে বাজার করা যেত। এখন শুধু সবজি কিনতেই পাঁচশ টাকা খরচ হয়ে যায়। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য হচ্ছে না।’
দিনমজুর আমীন আলীর জীবনেও সংকটের শেষ নেই। আগে একটি কাজ করে পাঁচ থেকে আটশ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারতেন। এখন কাজই পান কম, পেলেও অনেক সময় আয় হয় মাত্র চার-পাঁচশ টাকা। সেই টাকায় সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানো এবং রান্নার জ্বালানির ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আমীন আলী বলেন, ‘আমাদের জীবন অনেক কষ্টে আছে। কাজ পাই না। যা আয় হয়, তাতে অনেক কষ্টেই চলছি।’
গরুর মাংসের কথা উঠতেই আক্ষেপ ঝরে তার কণ্ঠে। বলেন, ‘গরুর মাংস আমাদের জন্য না, এটা বড় লোকদের খাবার। আমার আয় যদি ছয়-সাতশ টাকা হয় আর গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা, তাহলে এক কেজি গরুর মাংস কিনলে চাল-তেল কিনব কিভাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে মাসে দুইবার মাছ-মাংস খেতে পারলেও এখন একবারও পারি না। আমাদের মতো মানুষের এখন দুই-বেলা চাল, ডাল কেনাই কঠিন।’
তার ভাষ্য, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য চাল, ডাল, তেল, আলু—এই চারটি জিনিসের দাম কমলেই আমরা খুশি। আমাদের আর কিছু লাগবে না।’
সংসারের টানাপোড়েনের সবচেয়ে নির্মম চিত্র উঠে আসে এক মধ্যবয়স্ক বাবার কথায়। পাঁচ বছর আগেও সীমিত আয়ে সংসার চালানো তুলনামূলক সহজ ছিল। এখন রান্নার জ্বালানি জোগাড় করতেও বাড়তি খরচ হচ্ছে। গ্যাস না থাকায় কখনো কাঠের চুলা, কখনো কেরোসিন ব্যবহার করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘আগে সীমিত আয়েও চলতে পারতাম। এখন মরা ছাড়া বাঁচার পথ নাই।’
সন্তানের খাবারের প্রসঙ্গ তুলতেই অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, ‘সন্তানের দুধ কেনার টাকা নেই। সাবু জ্বাল দিয়ে খাওয়াতে হয়। বাচ্চা খেতে চায় না। সন্তানদের কিছুই দিতে পারিনি।’
সংসারের ব্যয় সামলাতে স্ত্রীকেও কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন সেলাইয়ের কাজ করা মিলন। তিনি জানান, ‘বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না। সবকিছুর দাম অনেক বেড়েছে। বাধ্য হয়ে বউকেও বাইরে কাজে পাঠিয়েছি। কী করব, তিনটা সন্তান আছে, সংসার তো চালাতে হবে।’
সাধারণ মানুষের এমন দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাড়তি দ্রব্যমূল্যের চাপ সামাল দেওয়ার সামর্থ্য সচ্ছল মানুষের থাকলেও নিম্ন আয়ের মানুষের সেই সুযোগ নেই। ফলে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে।
গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক গ্রাহক নিয়মিত গ্যাস না পেলেও বিল দিচ্ছেন। টাকা দিয়েও সেবা না পাওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, উৎপাদন পর্যায় থেকে পণ্য ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে কয়েক দফা হাতবদল ও পরিবহন খরচের কারণে দাম বাড়ে। চালের দাম জাত ও মানভেদে ভিন্ন। ডিমের দামও বর্তমানে ক্রেতাদের নাগালে রয়েছে। অন্যদিকে ভোজ্যতেলের দাম সরকার নির্ধারণ করছে। বাজারে চাল নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কিনা, সে বিষয়েও অধিদপ্তর নজর রাখছে।
