সংসারের খরচ সামলে সঞ্চয় করবেন যেভাবে
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকেই। আয় আগের মতো থাকলেও বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিলসহ নানা খরচ।
মাসের শুরুতে বেতন হাতে পাওয়ার পর একের পর এক খরচ মেটাতে গিয়ে শেষ দিকে অনেকেরই হাতে টাকা থাকছে না। ফলে হঠাৎ কোনো বিপদ বা জরুরি প্রয়োজনে পড়তে হচ্ছে আর্থিক সংকটে।
এমন পরিস্থিতিতে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। তবে সঞ্চয় করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় খরচ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা জীবনযাত্রাকে অতিরিক্ত সংকুচিত করার প্রয়োজন নেই। বরং পরিকল্পনা করে আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখলে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাতে পারেন।
সংসারের বাজেট তৈরি ও সঞ্চয় বাড়াতে অনুসরণ করতে পারেন কয়েকটি সহজ কৌশল।
১. মাসিক আয়ের হিসাব করুন
বাজেট তৈরির প্রথম ধাপ হলো পরিবারের মোট আয় নির্ধারণ করা। চাকরির বেতন, ব্যবসার আয়, বাড়িভাড়া কিংবা অন্য কোনো নিয়মিত আয়ের উৎস থেকে মাসে কত টাকা আসে, তার হিসাব রাখুন।
আয় যদি প্রতি মাসে কমবেশি হয়, তাহলে গত তিন থেকে ছয় মাসের গড় আয় হিসাব করতে পারেন। বাজেট করার সময় সম্ভাব্য বা অনিশ্চিত আয়ের পরিবর্তে নিশ্চিত আয়ের ওপর নির্ভর করাই ভালো।
২. প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় খরচ আলাদা করুন
মাসিক খরচগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করুন। যেমন—বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, বাজার, যাতায়াত, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, ঋণের কিস্তি ও মোবাইল-ইন্টারনেট বিল।
এরপর খরচগুলোকে প্রয়োজনীয় ও ঐচ্ছিক—এই দুই ভাগে সাজান। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও যাতায়াতের মতো প্রয়োজনীয় খরচের পাশাপাশি বাইরে খাওয়া, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কিংবা বিনোদনের পেছনে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তা-ও খেয়াল করুন।
এতে কোন খাতে খরচ কমানো সম্ভব, তা সহজেই বুঝতে পারবেন।
৩. প্রতিটি খরচ লিখে রাখুন
ছোট ছোট খরচের হিসাব না রাখলে মাস শেষে বড় অঙ্কের টাকা কোথায় চলে গেল, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিদিনের খরচ লিখে রাখার অভ্যাস করুন।
এ জন্য খাতা-কলম, মুঠোফোনের নোট অ্যাপ কিংবা স্প্রেডশিট ব্যবহার করতে পারেন। বাজার, যাতায়াত, নাশতা, অনলাইন কেনাকাটা—সব খরচের হিসাব রাখুন।
মাস শেষে হিসাব পর্যালোচনা করলে কোন খাতে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং কোথায় কাটছাঁট করা সম্ভব, তা স্পষ্ট হবে।
৪. মাসের শুরুতেই বাজেট তৈরি করুন
আয় ও খরচের হিসাব পাওয়ার পর মাসের শুরুতেই একটি বাস্তবসম্মত বাজেট তৈরি করুন। কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করবেন, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখুন।
যেমন, বাজারের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করুন। প্রয়োজনীয় কেনাকাটার তালিকা তৈরি করে বাজারে যান। এতে অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার প্রবণতা কমবে।
একইভাবে বাইরে খাওয়া, ঘোরাঘুরি ও শখের কেনাকাটার জন্যও সীমা নির্ধারণ করুন। তবে বাজেট এমন হওয়া উচিত, যা বাস্তবে মেনে চলা সম্ভব।
৫. বেতন পাওয়ার পরই সঞ্চয় করুন
অনেকেই মাসের সব খরচ মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা সঞ্চয় করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বাস্তবে বেশির ভাগ সময়ই হাতে টাকা থাকে না।
তাই বেতন পাওয়ার পরই একটি নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে রাখুন। সামর্থ্য অনুযায়ী আয়ের ১০ থেকে ২০ শতাংশ সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন। তবে আয় কম হলে অল্প টাকা দিয়ে শুরু করলেও সমস্যা নেই। নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সঞ্চয়ের টাকা দৈনন্দিন খরচের টাকা থেকে আলাদা রাখতে আলাদা ব্যাংক হিসাব বা উপযুক্ত সঞ্চয়মাধ্যম ব্যবহার করতে পারেন।
৬. জরুরি তহবিল গড়ে তুলুন
অসুস্থতা, চাকরি হারানো, হঠাৎ বাড়তি চিকিৎসা ব্যয় কিংবা অন্য কোনো বিপদে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এসব পরিস্থিতি সামলাতে জরুরি তহবিল থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
ধীরে ধীরে এমন একটি তহবিল গড়ে তোলার চেষ্টা করুন, যাতে অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার খরচ মেটানো যায়। একবারে এত টাকা জমাতে না পারলেও নিয়মিত অল্প অল্প করে সঞ্চয় করুন।
জরুরি তহবিলের অর্থ এমন জায়গায় রাখুন, যেখান থেকে প্রয়োজনের সময় সহজে টাকা তোলা যায়। দৈনন্দিন কেনাকাটা বা বিনোদনের খরচে এই অর্থ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
৭. নিয়মিত বাজেট পর্যালোচনা করুন
একবার বাজেট তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতি মাসে আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করুন। কোনো খাতে নির্ধারিত সীমার বেশি খরচ হলে তার কারণ খুঁজে বের করুন।
দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন পরিবর্তিত হলে বাজেটও নতুন করে সাজাতে হবে। পাশাপাশি ঋণের কিস্তি, ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের পড়াশোনা বা বড় কোনো কেনাকাটার জন্য আগেভাগে পরিকল্পনা করুন।
সঞ্চয় বাড়াতে আরও কিছু বিষয় মনে রাখুন
কেনাকাটার আগে তালিকা করুন: প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা তৈরি করে কেনাকাটা করলে বাড়তি খরচ কমানো যায়।
তুলনা করে পণ্য কিনুন: একই পণ্য কেনার আগে বিভিন্ন দোকানের দাম ও মান যাচাই করুন।
অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন বন্ধ করুন: ব্যবহার করেন না—এমন অ্যাপ, অনলাইন সেবা বা অন্যান্য সাবস্ক্রিপশনের খরচ পর্যালোচনা করুন।
হুট করে কেনাকাটা এড়িয়ে চলুন: প্রয়োজন নেই এমন কিছু কেনার ইচ্ছা হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছুটা সময় অপেক্ষা করুন।
পরিবারের সদস্যদের যুক্ত করুন: সংসারের বাজেট সম্পর্কে পরিবারের সবাইকে ধারণা দিন। এতে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
পরিকল্পিত খরচেই আর্থিক স্বস্তি
সঞ্চয় করার জন্য সব সময় বেশি আয় করতে হবে, এমন নয়। বরং আয় অনুযায়ী খরচের পরিকল্পনা করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং নিয়মিত সঞ্চয় করাই আর্থিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
শুরুতে অল্প টাকা জমলেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ধারাবাহিকভাবে সঞ্চয় করলে একসময় তা বড় অঙ্কে পরিণত হবে। মনে রাখতে হবে, সঞ্চয় শুধু ভবিষ্যতের বড় কোনো প্রয়োজন মেটানোর জন্য নয়; বরং অনিশ্চিত সময়ে আর্থিক চাপ কমিয়ে মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।


