Logo
Logo
×
   

Advertisement

বিনোদন

সিনেমা রিভিউ

জীবন অন্বেষণের প্রেরণা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’

Advertisement

Icon

সাদিক আহমেদ প্রান্ত

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম

জীবন অন্বেষণের প্রেরণা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ তানিম নূরের সিনেমাটি শুধু একটি যাত্রা না বরং সিনেমাটি দেখতে দেখতে মনে হয় এই যাত্রাটা মানুষের জীবনেরই একটা মেটাফোর। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে যা নির্মিত হয়েছে। 

ট্রেনের কামরাগুলো যেন বাংলাদেশেরই একটা ছোট্ট জীবন্ত মানচিত্র—যেখানে প্রত্যেক যাত্রী তার নিজস্ব দুঃখ, স্মৃতি আর অসমাপ্ত আশা নিয়ে চলেছে। 

সিনেমাটি শুরু হয় সেই পরিচিত ট্রেনের শব্দে। কিন্তু খুব শীঘ্রই বোঝা যায়, এটা কোনো সাধারণ যাত্রা নয়। এখানে একজন মন্ত্রী তার ক্ষমতার ভার বয়ে চলেছেন, একজন পিতা তার মৃত সন্তানের লাশ আর পোস্টকার্ডের স্মৃতি নিয়ে যাচ্ছেন, একজন গর্ভবতী নারী যন্ত্রণা আর আশার মাঝে দোল খাচ্ছেন, একজন চিকিৎসক তার স্ত্রীহারা জীবন আর মানসিকভাবে অসুস্থ মায়ের বোঝা টানছেন, ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীরা।

প্রত্যেক চরিত্রই যেন একেকটি অধ্যায়—আলাদা আলাদা, তবু একই ট্রেনের ছাদে বাধা। তানিম নূর এই চরিত্রগুলোকে এমন নিপুণভাবে বুনেছেন যে কাউকেই ছোট মনে হয় না। প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকের দুঃখই সামগ্রিক দুঃখের অংশ। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ এপিফ্যানির মুহূর্তগুলোই ছবিটিকে শুধু গল্প থেকে একটা দার্শনিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে। এখানে বিভিন্ন যাত্রীর ব্যক্তিগত দুঃখ- যন্ত্রণা-সুখ যখন একে অপরের সঙ্গে মিলিয়ে যায়। সেই মিলনে একটা বড় সত্য আমাদের সত্য হয়ে উঠে আসে—কেউই সত্যিকার অর্থে একা নয় বরং আমাদের জীবন হচ্ছে আত্মমানবিক এবং জন্ম আর মৃত্যুর সূক্ষ্ম সেতু। 

হুমায়ূন আহমেদের দার্শনিক জগতকে তানিম নূর সম্পূর্ণ নিজস্ব ভাষায় ধরে রেখেছেন—শান্ত, স্তরে স্তরে সাজানো, কিন্তু গভীরভাবে আলোড়িত করা। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনা অসাধারণ। ট্রেনের জানালা দিয়ে বয়ে যাওয়া বাংলার দৃশ্য যেন নিজেই একটা কবিতা। আর সংগীত? শেষ দিকে যখন আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠ উঠে আসে, তখন পুরো হল ঘর নীরব হয়ে যায়। সেই গান শুধু ছবির সমাপ্তি টানে না, বরং ছবিটিকে আরও বড় করে দেয়। পর্দা ম্লান হয়ে গেলেও আবেগ থেকে যায়—যেন ট্রেনটা এখনো চলছে, আমাদের ভেতরেই। 

উত্তর-আধুনিকতাবাদ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রান্তিক মানুষদের গল্প বলে,  এটি তাদের মর্যাদা ও কণ্ঠস্বর দেয় এবং মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ট্রেনের স্টাফদের একটা রেজিস্টেনস দেখা যায়। 

দুঃখের ভারী বোঝা নিয়েও মানুষ যখন একে অপরের দিকে হাত বাড়ায়, তখনই জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। সিনেমাটির শেষ অংশে প্রতিটা চরিত্রের মধ্যে বেঁচে থাকার আশা সঞ্চার করে। আমাদেরকে আশা নিয়েই বাঁচতে হয়। জীবনে আনন্দের চেয়ে দুঃখই বেশি, কিন্তু সেই ক্ষণিকের সুখ আর সংযোগের মুহূর্তগুলোই আমাদের টিকিয়ে রাখে। 

তানিম নূরের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ একটি চমৎকার চলচ্চিত্র। যা দেখার পর মনে হয়, বনলতা ট্রেনটি হচ্ছে আমাদের জীবনের ছুটে চলা আর ট্রেনের যাত্রী হচ্ছি আমরা যারা আগে থেকেই কারোর সঙ্গে পরিচিত না, কিন্তু সাহায্য-সহমর্মিতা-সহানুভূতি দিয়ে একে অপরের সঙ্গে জড়িত। 

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম