Logo
Logo
×

Advertisement

আনন্দ নগর

এক নায়কে ডুবছে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এক নায়কে ডুবছে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি

Advertisement

একসময় ঢাকাই সিনেমার ব্যবসায়িক চাকা সচল থাকত একাধিক নায়কের জনপ্রিয়তা, দর্শকের রুচি ও গল্পের বৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে। ষাট থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত একের পর এক তারকা এসেছেন, নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন, আবার নতুন তারকার জন্য জায়গাও ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই সিনেমাশিল্প এসে দাঁড়িয়েছে এক নায়কনির্ভর বাস্তবতায়। শাকিব খান ছাড়া অন্য নায়কদের সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে পারছে না, আবার বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণের ঝুঁকি নিতে পারছেন না অধিকাংশ প্রযোজক। সংকট আরও গভীর হচ্ছে ঈদকেন্দ্রিক মুক্তির প্রবণতায়। শাকিব খানের সিনেমাও ঈদের বাইরে নিয়মিত ব্যবসায়িক সাফল্য পাচ্ছে না-এমন অভিযোগ রয়েছে সিনেমাসংশ্লিষ্টদের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে, যে শিল্পে একসময় একাধিক নায়ককে ঘিরে সমান্তরাল ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, সেখানে আজ কেন একজন তারকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে? এই নির্ভরতা কি সাময়িক বাস্তবতা, নাকি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা, দুর্বল প্রযোজনা ব্যবস্থা ও তারকানির্ভর বিপণনের পরিণতি?

* একাধিক তারকা থেকে একক নির্ভরতা

ষাটের দশকে রহমান, আজিম, গোলাম মোস্তফাদের জনপ্রিয়তা দিয়ে এগিয়েছে এ দেশের সিনেমা। ষাটের দশকের শেষভাগে রাজ্জাকের উত্থান ঢাকাই সিনেমায় নতুন তারকা যুগের সূচনা করে। সত্তরের দশকে রাজ্জাক হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক তারকা। তবে তার পাশাপাশি ফারুক, উজ্জ্বল, সোহেল রানা, আলমগীর, বুলবুল আহমেদ, জাভেদ ও ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো অভিনেতারাও নিজেদের দর্শক তৈরি করেন। ফলে প্রযোজকদের সামনে ছিল একাধিক তারকা নিয়ে সিনেমা নির্মাণের সুযোগ।

আশির দশকে এসে সেই বহুত্ব আরও বিস্তৃত হয়। ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মান্না, জসিম, ওয়াসিম, জাফর ইকবাল ও আলমগীরের মতো নায়করা নিজস্ব দর্শকশ্রেণি তৈরি করেন। নব্বইয়ের দশকে সালমান শাহ, নাঈম, ওমর সানী, আমিন খান, রিয়াজ, ফেরদৌস ও শাকিল খানের আবির্ভাব সিনেমায় নতুন প্রজন্মের দর্শক নিয়ে আসে। বিশেষ করে সালমান শাহর স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারও বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল, একজন নায়ক জনপ্রিয় থাকলেও অন্য নায়কের সিনেমার বাজার বন্ধ হয়ে যেত না। গল্প, পরিচালক, প্রযোজনা ও দর্শকপ্রিয়তার সমন্বয়ে একাধিক তারকা ঘিরে ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু শূন্য দশকের পর থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে নায়কের সংখ্যা কমতে থাকে। আর এখন সেটা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র একজনে! ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এখন একনায়ক-নির্ভর!

* কেন একজনের ওপর নির্ভরশীল ইন্ডাস্ট্রি

বর্তমান বাস্তবতায় শাকিব খান ঢালিউডের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক তারকা-এ নিয়ে সংশয় কম। তার নাম, জনপ্রিয়তা ও দর্শক টানার ক্ষমতা প্রযোজকদের কাছে বড় বিনিয়োগের নিশ্চয়তা হিসাবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সমস্যাটি হচ্ছে, সেই নিশ্চয়তা অন্য তারকাদের ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে না। ফলে বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণে প্রযোজকরা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। আবার নতুন নায়ক তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও ধারাবাহিক সিনেমা নির্মাণের পরিবেশও নেই।

এক সাক্ষাৎকারে প্রযোজক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ সিনেমার সংকট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ইন্ডাস্ট্রি কার্যত একনায়ক-নির্ভর হয়ে পড়েছে; শাকিব খানই একমাত্র নায়ক, যার সিনেমা থেকে মুনাফার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় বলে প্রযোজকরা মনে করেন।’ তার মতে, বিনিয়োগ ফেরত না পাওয়ায় প্রযোজকরা বাজার ছেড়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে, শাকিবের সিনেমার মুক্তিও এখন ঈদকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ২০২২ সালের পর থেকে ঈদের বাইরে শাকিব খান অভিনীত কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি। মাঝে অবশ্য একবার তরুণ নির্মাতা অনন্য মামুন শাকিব অভিনীত ‘দরদ’ নামে একটি সিনেমা ঈদের বাইরে মুক্তি দিয়ে ‘রিস্ক’ নিয়েছিলেন। কিন্তু ফলাফল, ব্যর্থ। অর্থাৎ, শাকিব খানও ঈদনির্ভর তারকা হয়ে গেছেন।

* সংকট শুধু নায়কের নয়, পুরো ব্যবস্থার

সিনেমায় অভিনয় নিয়ে একসময় তুমুল ব্যস্ত থাকতেন মিশা সওদাগর। ইন্ডাস্ট্রির দুরবস্থায় তিনি এখনো অনেকটা অবসর জীবনযাপন করছেন। এ অভিনেতা মনে করেন, ঢাকাই সিনেমার সংকটের অন্যতম কারণ তারকার স্বল্পতা এবং নিয়মিত সিনেমা নির্মাণ না হওয়া। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শাকিব খান ছাড়া আর কতজন নায়ক আছেন, যাদের নামেই একটি সিনেমা চলতে পারে? তার মতে, এখন প্রয়োজন আরও বেশি প্রযোজক, নায়ক-নায়িকা, সিনেমাহল, ভালো গল্প এবং সারা বছর নিয়মিত সিনেমা মুক্তি। তিনি আরও বলেন, ‘আগে নায়করাজ রাজ্জাকের নামেই সিনেমা চলত, পাশাপাশি আলমগীর, সোহেল রানা, ফারুক, ওয়াসিম ও সালমান শাহর মতো তারকাও ছিলেন। তাদের সিনেমার গল্পও ছিল শক্তিশালী। এখন তাদের মতো তারকা কোথায়?

এদিকে প্রেক্ষাগৃহের সংকটও এই নির্ভরতা বাড়িয়ে তুলছে। ঢাকার পুরোনো প্রেক্ষাগৃহের অনেকই কার্যত বন্ধ হওয়ার পথে। যে কয়টি সিঙ্গেল স্ক্রিল চালু আছে, সেগুলোও দর্শক টানতে শাকিব খানের পুরোনো সিনেমার ওপরও নির্ভর করছে। প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা বলছেন, সাধারণ দর্শকের কাছে শাকিব খানের এ সিনেমা দিয়ে প্রেক্ষাগৃহ চালানো সম্ভব নয়। নতুন নায়ক তৈরি না হলে এ সংকট মোটেও কাটবে না বলে তাদের বিশ্বাস।

* উত্তরণের পথ কোথায়

সিনেমাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একনায়ক-নির্ভরতা থেকে ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি।

প্রথমত, শুধু একজন তারকাকে কেন্দ্র করে সিনেমা নির্মাণের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুন নায়ক তৈরিতে প্রযোজকদের বিনিয়োগ করতে হবে। এক-দুটি সিনেমায় প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেই কোনো অভিনেতাকে বাদ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, গল্প ও চিত্রনাট্যে গুরুত্ব দিতে হবে। তারকা থাকলেই সিনেমা সফল হবে, এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শক্তিশালী গল্প, দক্ষ নির্মাতা এবং মানসম্মত নির্মাণের সমন্বয় ঘটাতে হবে। দর্শককে শুধু ঈদে নয়, বছরের অন্য সময়ও প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার মতো সিনেমা মুক্তি দিতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ উন্নয়ন, আধুনিকায়ন ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রদর্শনব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রযোজকদের বিনিয়োগ সুরক্ষা, স্বচ্ছ টিকিট বিক্রির হিসাব এবং পাইরেসি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ফিরতে হবে। বছরে একটি বড় বাজেটের সিনেমার ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন বাজেট ও ঘরানার একাধিক সিনেমা নির্মাণ করতে হবে। এতে নতুন অভিনয়শিল্পীদের কাজের সুযোগ তৈরি হবে, পাশাপাশি দর্শকের রুচি অনুযায়ী সিনেমা বেছে নেওয়ার সুযোগও বাড়বে।

* একজন নায়ক নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রি

এ মুহূর্তে শাকিব খান ঢাকাই সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তার জনপ্রিয়তা ও সাফল্যকে সংকটের কারণ হিসাবে দেখারও সুযোগ নেই। বরং তার সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে নতুন তারকা, নতুন প্রযোজক ও নতুন নির্মাতা তৈরির পরিবেশ গড়ে তোলাই সিনেমাসংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একসময় রাজ্জাক, ফারুক, আলমগীর, সোহেল রানা, জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, সালমান শাহ কিংবা মান্নার মতো তারকা নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। তাদের জনপ্রিয়তা একে অন্যের বাজার কেড়ে নেয়নি; বরং সিনেমার বাজারকে বিস্তৃত করেছে। সেই জায়গায় ফিরে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন সুস্থ প্রতিযোগিতা, নিয়মিত প্রযোজনা এবং দর্শকবান্ধব সিনেমা। আর একইসঙ্গে প্রয়োজন প্রেক্ষাগৃহের সংস্কার ও বক্স অফিস গড়ে তোলা। কারণ, একজন নায়ক দিয়ে একটি সিনেমা সফল হতে পারে, কিন্তু একজন নায়ক দিয়ে একটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কখনোই টিকিয়ে রাখা যায় না। ঢাকাই সিনেমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শাকিব খানের বিকল্প খোঁজার চেয়েও বেশি-একাধিক তারকা তৈরির মতো শক্তিশালী সিনেমাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

যে কারণে দ্বিতীয় বিচ্ছেদের পথে গায়িকা

যে কারণে দ্বিতীয় বিচ্ছেদের পথে গায়িকা

নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেন আমির খানের ভাগ্নে ইমরান খান

নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেন আমির খানের ভাগ্নে ইমরান খান

পারিশ্রমিকের প্রস্তাব ছিল আকাশছোঁয়া, তবু নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন শ্রদ্ধা

পারিশ্রমিকের প্রস্তাব ছিল আকাশছোঁয়া, তবু নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন শ্রদ্ধা

স্বামীর সঙ্গে সুন্দর মুহূর্তের ছবি পোস্ট করলেন মিম

স্বামীর সঙ্গে সুন্দর মুহূর্তের ছবি পোস্ট করলেন মিম

শিল্পীদের ব্যক্তিগত সময়েও গোপন ক্যামেরা, সতর্ক করলেন অভিনেত্রী

শিল্পীদের ব্যক্তিগত সময়েও গোপন ক্যামেরা, সতর্ক করলেন অভিনেত্রী

বিজেপির ‘দেশবিরোধী’ তকমা, নিশানায় দিয়া মির্জাসহ যেসব তারকা

বিজেপির ‘দেশবিরোধী’ তকমা, নিশানায় দিয়া মির্জাসহ যেসব তারকা

আরও পড়ুন

এক নায়কে ডুবছে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি

এক নায়কে ডুবছে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি

ডিভোর্স নিয়ে এখনো আলোচনায় শবনম ফারিয়া

ডিভোর্স নিয়ে এখনো আলোচনায় শবনম ফারিয়া

ভিন্ন অ্যাকশন অবতারে এনটিআর ও প্রভাস

ভিন্ন অ্যাকশন অবতারে এনটিআর ও প্রভাস

এক শর্তে জ্যাক স্প্যারো হয়ে ফিরতে রাজি জনি ডেপ

এক শর্তে জ্যাক স্প্যারো হয়ে ফিরতে রাজি জনি ডেপ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম