ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন
বলিউডে তারকাদের বদনাম করতে খরচ করা হয় কোটি কোটি টাকা
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বলিউডে কোনো জনপ্রিয় তারকার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এখন আর শুধু সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক খবর প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ানো, কুৎসা রটানো, পোস্টে কমেন্ট করা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করানোর জন্য অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ করা হচ্ছে ট্রল বাহিনী। আর এই পুরো কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তারকাদের পাবলিক রিলেশনস (পিআর) ও অনলাইন রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট (ওআরএম) সংস্থাগুলো।
ধরা যাক, কোনো তরুণ তারকা ছুটির দিনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করলেন। একই সময়ে এক তরুণী শিক্ষার্থীও একই রকম পটভূমির ছবি প্রকাশ করলেন। রেডিটে কেউ দুজনের ছবি পাশাপাশি দিয়ে তাদের সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা শুরু করল। বিষয়টি চোখে পড়ল প্রতিদ্বন্দ্বী এক তারকার পিআর সংস্থার। দ্রুত যোগাযোগ করা হলো ওআরএম এজেন্সির সঙ্গে।
এরপর শুরু হলো পরিকল্পিত প্রচারণা। একটি ট্রল অ্যাকাউন্ট থেকে প্রশ্ন ছোড়া হলো—কার্তিক আরিয়ান কি অপ্রাপ্তবয়স্ক এক তরুণীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন? ওই তরুণীর প্রোফাইলে বয়স ১৭ লেখা থাকায় সন্দেহ আরও উসকে দেওয়া হলো। পালটা আরেকটি ট্রল অ্যাকাউন্ট দাবি করল, মেয়েটির বয়স আসলে ১৮। পরে মেয়েটি নিজের ইনস্টাগ্রাম বায়োতে স্পষ্ট করে জানালেন, তিনি কার্তিককে চেনেনই না। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়ে গেছে একটি বিতর্কিত বয়ান।
বিনোদন জগতের বাজেটের অংশ
বলিউডের একজন অভিজ্ঞ পিআর পেশাজীবীর মতে, পেইড ট্রলিং এখন অনেক সিনেমার বাজেটেরই অংশ। তার ভাষায়, কেউ পেইড ট্রলিং না করলেও নিজেদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কুৎসা মোকাবিলার জন্য একটি ওআরএম এজেন্সিকে প্রস্তুত রাখতে হয়।
তার মতে, এই চর্চা পুরোপুরি নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগের আগে প্রতিদ্বন্দ্বী তারকারা কখনো কখনো সংবাদপত্রে বেনামে নেতিবাচক খবর প্রকাশের জন্য অর্থ দিতেন। পার্থক্য হলো, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জায়গার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, একই সঙ্গে জবাবদিহিও কম।
অভিনেত্রী রিদ্ধিমা কাপুরের ভাষায়, বিনোদন জগতে অনেক সময় এক তারকার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির অন্য তারকার বিরুদ্ধে কৃত্রিম জনরোষ তৈরি করে। ফলে প্রকৃত ভক্তদের ক্ষোভ আর অর্থের বিনিময়ে তৈরি করা ক্ষোভের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নারী তারকারাই বেশি নিশানায়
অভিযোগ রয়েছে, আলিয়া ভাট সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক পেইড ট্রলিংয়ের শিকার হয়েছেন। তার সিনেমা ‘আলফা’ মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অভিনয়, অ্যাকশন দৃশ্যে সক্ষমতা, এমনকি উচ্চতা নিয়েও নানা নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়। সংশ্লিষ্ট একজন প্রযুক্তিবিদ দাবি করেছেন, কয়েকজন শীর্ষ নারী তারকার পিআর সংস্থার পক্ষ থেকে এসব প্রচারণা চালানো হয়ে থাকতে পারে। তবে ওই তারকারা নিজেরা কতটা বিষয়টি জানতেন, তা নিশ্চিত নয়।
দীপিকা পাড়ুকোনও চলচ্চিত্রের সেটে আট ঘণ্টার কর্মঘণ্টার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর অনলাইনে ট্রলের শিকার হন। কৃতি শ্যাননের একটি বিজ্ঞাপন নিয়েও ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়। এমনকি জনসম্মুখ থেকে দূরে থাকা ক্যাটরিনা কাইফও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শরীরের ওজন ও পোশাক নিয়ে ট্রলের শিকার হয়েছেন।
তবে পেইড ট্রলিং থেকে পুরুষ তারকারাও রেহাই পাচ্ছেন না। বরুণ ধাওয়ানের অভিনয়ের ধরন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। রণবীর কাপুর ও রণবীর সিংকেও বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পিত অনলাইন আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে।
অভিনেতা-নির্মাতা অংশুমান ঝা জানান, তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ব্যাপক হারে রিপোর্ট করা হয়েছিল, যাতে তার পোস্টের প্রচার কমে যায়। তার মতে, এই কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো তারকার ভূমিকা থাকতে পারে।
খরচ কত?
পেইড ট্রলিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট রেট রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো অ্যাকাউন্টে গণহারে রিপোর্ট করার জন্য খরচ হতে পারে কয়েক হাজার রুপি। প্রায় এক হাজার সমন্বিত পোস্টের একটি প্রচারণার জন্য লাগতে পারে প্রায় ১ লাখ রুপি। আর বড় ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো কুৎসা প্রচারণায় খরচ ৫০ লাখ রুপিরও বেশি হতে পারে।
এক সাবেক পেইড ট্রলের দাবি, মানুষের মাধ্যমে পরিচালিত ট্রল ফার্মের খরচ বটের তুলনায় বেশি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এ ধরনের প্রচারণাকে আরও সস্তা করেছে। প্রথমে কিছু মানব ট্রল দিয়ে বয়ান তৈরি করে পরে শত শত বটের মাধ্যমে সেটিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
অভিনেত্রী রিদ্ধিমা কাপুরের মতে, এখন এই কর্মকাণ্ডের বড় অংশই বটনির্ভর। পুরোনো অ্যাকাউন্ট ‘বাল্ক’-এ কেনা হয়, ভুয়া পরিচয়ে নতুন প্রোফাইল তৈরি করা হয় এবং স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে কয়েক মিনিটের মধ্যে কোনো পোস্টের কমেন্ট সেকশন বা হ্যাশট্যাগ ভরিয়ে ফেলা হয়।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অনলাইনে ‘সকপাপেট্রি’ বলা হয়। যার অর্থ, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে জনমতকে প্রভাবিত করার কৌশল।
ট্রলিংয়ের প্রভাব
অভিনেত্রী দিয়া মির্জা জানিয়েছেন, তিনি বছরের পর বছর অশ্লীল ভাষা, ধর্ষণ ও হত্যার হুমকির স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করে রেখেছেন। অভিনেত্রী রেণুকা শাহানে জানান, বহু বছর আগে ট্রলদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, একই ধরনের বানান ভুল, একই ভাষা ও একই ভুয়া তথ্য বারবার ব্যবহৃত হচ্ছে। পরে তিনি জানতে পারেন, তাদের অনেকেই বট।
পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপও পেইড ট্রলিংয়ের শিকার হয়েছেন। তার মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হলে বিষয়টি তাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় বলে জানিয়েছেন নির্মাতা অতুল মঙ্গিয়া।
কাশ্যপ নিজেও জানিয়েছেন, তিনি নিয়মিত ট্রলের শিকার হন। তার এক আত্মীয় পেইড ট্রলিংয়ের ব্যবসায় যুক্ত থাকায় তিনি জানেন, তার বিরুদ্ধে চালানো অনেক প্রচারণাই সাজানো।
চিত্রনাট্যকার সুমিত রায়ের অভিযোগ, শুধু ওআরএম সংস্থাই নয়, কিছু ইউটিউব সমালোচক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষ্যকার ও চলচ্চিত্র ইনফ্লুয়েন্সারও মুক্তির আগে প্রযোজকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন।
বলিউডের সংশ্লিষ্টদের মতে, পেইড ট্রলিং এখন আর নিরীহ অনলাইন কাণ্ড নয়। এটি তারকাদের মানসিক স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার এবং সিনেমার ব্যবসার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা বোসের মতে, ভালো বা খারাপ পিআর একটি সিনেমার ভাগ্য বদলে দিতে পারে। কিন্তু কাউকে হেয় করে নিজের অবস্থান শক্ত করার এই প্রবণতা বিনোদন জগতের মূল আনন্দ ও সৃজনশীলতাকেই নষ্ট করছে।
অংশুমান ঝা বলেন, চলচ্চিত্র জগতে এখন ‘ধারণাই মুদ্রা’, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে সেই মুদ্রার বাজার। তাই পেইড ট্রলিংকে একদিকে পুরোপুরি অপ্রতিরোধ্য শক্তি ভাবার যেমন সুযোগ নেই, অন্যদিকে একে নিছক নিরীহ অনলাইন কাণ্ড হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই।


-6a9d4e00c3790.jpg)
-6a9d04936967c.jpg)