একবেলা খাবারের জন্য বন্ধুর দরজায় যাওয়া সেই ছেলেটিই নানা পাটেকর
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
নানা পাটেকর। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘আমার কাছে চাপাটির (রুটি) ঘ্রাণের চেয়ে সুন্দর কোনো সুগন্ধ নেই’— কথাটি বলেছিলেন ভারতের সদ্যপ্রয়াত অভিনেতা নানা পাটেকর। জীবনের কঠিন দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে ক্ষুধা, অপমান আর অসহায়তার স্মৃতি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে তাকে কাজে নামতে হয়েছিল। স্কুল শেষে আট কিলোমিটার হেঁটে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন, মাস শেষে পেতেন মাত্র ৩৫ রুপি আর প্রতিদিন একবেলা খাবার। সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে গড়ে দিয়েছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী ও স্পষ্টভাষী এই অভিনেতাকে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভারতের গোয়ায় ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবী ত্যাগ করার পর নানা পাটেকরের জীবনের নানা অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০১৫ সালে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ ছবির মুক্তির আগে ‘বম্বে টাইমস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রাগ এবং জীবনবোধ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছিলেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল পর্দার কঠোর ও তেজস্বী মানুষটির নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা এক সংগ্রামী জীবনের গল্প।
১৩ বছরেই সংসারের দায়িত্ব
১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রে বিশ্বনাথ পাটেকর নামে জন্মগ্রহণ করেন নানা পাটেকর। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার পরিবার একসময় আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিল। তার বাবা ব্যবসা করতেন। কিন্তু বাবার ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়িক অংশীদারের প্রতারণার অভিযোগে পরিবারের ব্যবসা ও সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে মধ্যবিত্ত জীবন থেকে তাদের পরিবার ধীরে ধীরে নিম্নবিত্ত অবস্থায় নেমে আসে।
নানার ভাষায়, তাদের পরিবার প্রথমে মধ্যবিত্ত ছিল, পরে নিম্নমধ্যবিত্ত এবং শেষ পর্যন্ত দরিদ্র হয়ে পড়ে। বাবার সবকিছু হারানোর পর সংসারের হাল ধরতে হয় তাকেই।
তখন তিনি নবম শ্রেণির ছাত্র। যে বয়সে অন্য শিশুরা পড়াশোনা আর খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সেই জীবিকার তাগিদে কাজ শুরু করতে হয়েছিল তাকে।
২০১৫ সালের সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, স্কুল ছুটির পর তিনি হেঁটে চুনাভাট্টি যেতেন। সেখানে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। প্রতিদিন যাওয়া-আসা মিলিয়ে তাকে প্রায় আট কিলোমিটার হাঁটতে হতো। বিনিময়ে মাসে পেতেন মাত্র ৩৫ রুপি এবং প্রতিদিন একবেলা খাবার।
তিনি বলেছিলেন, ‘মাত্র ১৩ বছর বয়সে আমাদের পরিবার মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নমধ্যবিত্ত, তারপর দরিদ্র হয়ে যায়। আমার বাবার কাছের একজন তার সম্পত্তিসহ সবকিছু নিয়ে নিয়েছিলেন। হঠাৎ করেই ১৩ বছর বয়সে আমাকে কাজ শুরু করতে হয়।’
এই কাজ ছিল কেবল অর্থ উপার্জনের উপায় নয়; পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তার অংশগ্রহণ। জীবনের এই কঠিন অধ্যায়কে নানা কখনো নিছক দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখেননি। বরং তার বিশ্বাস ছিল, সেই অভিজ্ঞতাই তাকে এমন শিক্ষা দিয়েছে, যা কোনো অভিনয় বিদ্যালয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। কিন্তু সেই অপমান আর ক্ষুধা আমাকে এত কিছু শিখিয়েছে যে অভিনয় শেখার জন্য কোনো স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। বাবার সবকিছু হারিয়ে যাওয়ায় আমাকে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল।’
রুটির প্রতি গভীর ভালোবাসা
দারিদ্র্য নানা পাটেকরের খাবার সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিয়েছিল। শৈশবে এমন দিন গেছে, যখন পেট ভরানোর মতো খাবার তার কাছে ছিল না। তখন কখনো কখনো দুপুরে কিংবা রাতে বন্ধুর বাড়িতে চলে যেতেন। মনে মনে আশা করতেন, বন্ধুটি হয়তো তাকে খেতে বলবে, এক টুকরো রুটি এগিয়ে দেবে।
সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘দুপুরে কিংবা রাতের খাবারের সময়ে কোনো বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হতাম। বলতাম, “হাই, হ্যালো, কেমন আছ?” মনে মনে আশা করতাম, সে হয়তো আমাকে রুটি খেতে বলবে, জোর করে হলেও খাওয়াবে।’
এরপর এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা তার জীবনের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির গভীরতা বুঝিয়ে দেয়।
‘চাপাটির ঘ্রাণের চেয়ে সুন্দর কোনো সুগন্ধ নেই’
একসময় মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসতেন নানা। কিন্তু শৈশবে মিষ্টি কেনার সামর্থ্য ছিল না। সেই না-পাওয়ার স্মৃতি এত গভীরভাবে তার মনে গেঁথে গিয়েছিল যে বড় হয়েও মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস আর ফিরে আসেনি।
তিনি বলেছিলেন, ‘সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য, আজ আমি মিষ্টি খাই না। তখন মিষ্টি খুব ভালো লাগত। কিন্তু তখন খেতে পারিনি বলে আজও খাই না। এখন মিষ্টি আমার কাছে সোনার মতো—আমি তা খাব না।’
রাগের নেপথ্যে অপমানের ক্ষত
পর্দায় নানা পাটেকরকে প্রায়ই দেখা গেছে রাগী, দৃঢ়চেতা ও আপসহীন চরিত্রে। বাস্তব জীবনেও তাকে অনেক সময় স্পষ্টভাষী ও তেজস্বী মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু নিজের রাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন কৈশোরের সেই দিনগুলোতে।
নানা বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, সেই সময় যে অপমান সহ্য করতে হয়েছিল, তার কারণেই এমন হয়েছে। মানুষ আমার সঙ্গে যেভাবে আচরণ করত, সেসব মনে পড়লে আজও আমার চোখে পানি চলে আসে।’
অভিনয়জীবনে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার করার পরও সেই স্মৃতি তার মন থেকে মুছে যায়নি। তবে সময়ের সঙ্গে কাজের অর্থ বদলে গেছে বলে মনে করতেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘১৩ বছর বয়স থেকে আজ পর্যন্ত ৫১ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছি। সৌভাগ্যবশত, আজ আমার শখ আর পেশা একই। কিন্তু তখন কাজ করতে হতো বাধ্য হয়ে।’
কৈশোরের সেই অসহায়ত্ব ও নিজেকে অন্যদের চেয়ে ছোট মনে করার অনুভূতিই একসময় রাগ হয়ে প্রকাশ পেয়েছিল বলে জানান নানা।
তিনি বলেন, ‘আসলে আমি অসহায় ছিলাম, নিজেকে হীন মনে করতাম। শেষ পর্যন্ত সেই অনুভূতিই রাগ হয়ে বেরিয়ে এসেছে।’
তবে রাগী ভাবমূর্তি থাকলেও তিনি সহিংসতা পছন্দ করতেন না। রাগ হলেও সাধারণত কাউকে মারধর করতেন না বলে জানিয়েছিলেন। নিজের ৩০ বছর বয়সি ছেলে মালহারকে জীবনে মাত্র একবার মেরেছিলেন বলেও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন তিনি।
নানা বলেছিলেন, ‘আমি হাত তুলতে পছন্দ করি না। মানুষকে মারতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু মারি না।’
তারকা হয়েও ৭৫০ বর্গফুটের বাড়িতেই স্বস্তি
চলচ্চিত্রজগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর অনেক তারকার জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ—সবকিছুতেই বাড়ে বিলাসিতা। কিন্তু নানা পাটেকরের মতে, তার প্রয়োজন খুব একটা বাড়েনি।
মুম্বাইয়ে তাদের ৭৫০ বর্গফুটের একটি বাড়ি ছিল। বাড়িটি কেনা হয়েছিল ১ লাখ ১০ হাজার রুপিতে। বিপুল জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পরও সেই বাড়িতেই বসবাস করতেন তিনি।
নিজের জীবনযাপন সম্পর্কে নানা বলেছিলেন, ‘আমি আমার চাহিদা একটুও বাড়াইনি। আমার প্রয়োজন এখনো আগের মতোই। আমার বাড়িতে এলে আপনারা অবাক হবেন। বাড়িটি ৭৫০ বর্গফুটের। আমরা এটি ১ লাখ ১০ হাজার রুপিতে কিনেছিলাম। আজও আমি সেখানেই থাকি।’
তার সম্পদের তালিকায় গোয়ার বাড়ি, মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাট এবং পুনের প্রায় ২৭ একর জমির খামারবাড়ির কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবু নিজের পুরোনো বাড়িতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার সাধারণ জীবনযাপনের প্রতি অনুরাগেরই পরিচয় দেয়।
‘মৃত্যুকে আমি কখনো ভয় পাইনি’
নানা পাটেকরের পুরোনো সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি ছিল মৃত্যু নিয়ে তার বক্তব্য।
এখন তার মৃত্যুর খবরের পর সেই কথাগুলো নতুন করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
২০১৫ সালের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘শুরু থেকেই আমার মৃত্যুভয় নেই।’
কঠিন পরিস্থিতি কিংবা অন্যায়ের মুখোমুখি হতেও ভয় পান না বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তার বক্তব্য ছিল, সামনে অন্যায় হতে দেখলে তিনি প্রতিবাদ করতে পিছপা হবেন না—অন্য ব্যক্তির হাতে বন্দুক থাকলেও নয়। পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়েও খুব বেশি চিন্তা করেন না বলে জানিয়েছিলেন।
নানা বলেছিলেন, ‘আমার সামনে যা-ই আসুক, আমি তার মুখোমুখি হতে ভয় পাই না। কেউ অন্যায় করলে, তার হাতে বন্দুক থাকুক কিংবা অন্য কিছু, আমি তার কাছে গিয়ে দাঁড়াব। পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে আমি ভাবি না।’
যে অভিনেতা পর্দায় বারবার রাগ, অসহায়ত্ব, সাহস ও প্রতিবাদের মিশ্র চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও যেন সেই চরিত্রগুলোর পেছনের গল্প তুলে ধরে।
কৈশোরে ক্ষুধা, অপমান ও অসহায়ত্বের মুখোমুখি হওয়া মানুষটি পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ের অংশ করে তুলেছিলেন। তার কঠোরতা ও আপসহীনতার পেছনে যে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস ছিল, তা তার নিজের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে, ধীরে ধীরে তারকাখ্যাতি
নানা পাটেকরের চলচ্চিত্রে পেশাদার অভিনয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে। এরপর বিশেষ করে মারাঠি চলচ্চিত্রে বিভিন্ন ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
তার তারকাখ্যাতি এক রাতেই আসেনি। ১৯৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অঙ্কুশ’ ছবিতে অভিনয়ের পর তিনি দর্শকের নজরে আসেন। ১৯৮৮ সালের ‘সালাম বম্বে’ তাকে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে আরও পরিচিত করে তোলে।
এরপর একের পর এক ছবিতে নিজের অভিনয়দক্ষতার পরিচয় দেন নানা। ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’, ‘ওয়েলকাম’ ও ‘নাটসম্রাট’ তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে।
তার অভিনয়ের পরিসর ছিল বিস্তৃত। কখনো তীব্র আবেগ ও ক্ষোভে ভরা চরিত্র, কখনো ভয়ংকর খলনায়ক, আবার কখনো হাস্যরসাত্মক ভূমিকায়ও দর্শককে মুগ্ধ করেছেন তিনি।
বিশেষ করে তার সংলাপ বলার ধরন, চোখেমুখে আবেগের প্রকাশ এবং চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাকে অন্য অনেক অভিনেতার থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পেয়েছেন পদ্মশ্রীও
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তিনি তিনবার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।
১৯৮৯ সালে ‘পরিন্দা’ ছবির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান তিনি। ১৯৯৪ সালে ‘ক্রান্তিবীর’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। পরে ১৯৯৬ সালে ‘অগ্নিসাক্ষী’ ছবির জন্য আবারও সেরা পার্শ্ব অভিনেতার সম্মান পান।
শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে তাকে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মশ্রীতে ভূষিত করা হয়।
তার অর্জনের তালিকা দীর্ঘ হলেও নিজের জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে নানা বারবার ফিরে গেছেন সেই ১৩ বছর বয়সের ছেলেটির কাছে, যে স্কুল শেষে আট কিলোমিটার হেঁটে সিনেমার পোস্টার আঁকতে যেত। মাসে ৩৫ রুপি আয় করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সেই কিশোরের অভিজ্ঞতাই তার কাছে ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস



