Logo
Logo
×

Advertisement

পরবাস

আল-আজহারে বহুজাতিক শিক্ষার্থীদের ঈদ উদযাপন

Advertisement

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

আল-আজহারে বহুজাতিক শিক্ষার্থীদের ঈদ উদযাপন

Advertisement

হাজার বছরের ইতিহাস, জ্ঞান, সভ্যতা ও ইসলামী ঐতিহ্যের অনন্য ধারক আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। ফাতেমীয় আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠ শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং এটি ইসলামী জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও বৈশ্বিক মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। 

আর সেই ঐতিহাসিক আল-আজহারের প্রাঙ্গণেই এবার পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে এক ভিন্নমাত্রিক আবহে যেখানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, তাকবিরের ধ্বনি, কুরবানির চেতনা এবং বহুজাতিক ভ্রাতৃত্ব মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অপার্থিব অনুভূতি। 

বিশ্বের প্রায় ১২০টিরও বেশি দেশের শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় যেন ঈদের দিন রূপ নেয় ক্ষুদ্র এক বৈশ্বিক মুসলিম সমাজে। 

এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিক্ষার্থীরা ভাষা, সংস্কৃতি ও বর্ণের ভিন্নতা ভুলে একই কাতারে দাঁড়িয়ে উদযাপন করেন মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। সেই বহুজাতিক মিলনমেলায় প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও ছিলেন প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে উজ্জ্বল। 

বুধবার (২৭ মে) ভোর হতেই কায়রোর আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে ওঠে তাকবির ধ্বনিতে। ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ এই সুমধুর ধ্বনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, করিডোর, গলি ও প্রাঙ্গণে সৃষ্টি করে এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ। 

মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের বহু শতাব্দী পেরিয়ে আসা প্রাচীন এই জ্ঞাননগরী যেন আবারও ফিরে গেছে ইসলামের সোনালি দিনগুলোর আবহে। 

ফজরের নামাজের পর থেকেই শিক্ষার্থীরা নতুন পোশাক পরে দলে দলে ছুটে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলসংলগ্ন মসজিদে। 

মিশরের রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয়ের প্রায় ২০ মিনিট পর সারাদেশে একযোগে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মিশরের প্রচলিত শাফেয়ি মাযহাব অনুসারে প্রথম রাকাতে অতিরিক্ত সাত তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচ তাকবিরের মাধ্যমে ঈদের নামাজ আদায় করেন। 

নামাজে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে উচ্চারিত তাকবির যেন ভাষা ও ভূগোলের সব বিভাজন ভেঙে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক মহিমান্বিত প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়। 

নামাজ শেষে অনুষ্ঠিত খুতবায় রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা, হযরত ইবরাহিম (সা.) এর আত্মত্যাগ, কুরবানির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। 

খুতবায় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয় কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি মানুষের অহংকার, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতা বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শিক্ষা। 

বাংলাদেশের মতো দীর্ঘ সময় ধরে সম্মিলিত মোনাজাতের প্রচলন মিশরে খুব বেশি দেখা না গেলেও দ্বিতীয় খুতবার শেষে ইমাম মুসলিম উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির জন্য বিশেষ দোয়া করেন। 

নামাজ শেষে শুরু হয় ঈদের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অধ্যায় ভ্রাতৃত্ব ও আন্তরিকতার মিলনমেলা। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করেন। 

ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, চেহারা আলাদা কিন্তু ঈদের আনন্দ ও মুসলিম পরিচয়ের বন্ধন যেন সবাইকে এক অদৃশ্য সুতায় আবদ্ধ করে রেখেছে। 

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল আলাদা উচ্ছ্বাস। অনেকেই দেশের ঐতিহ্য অনুযায়ী বন্ধুদের সঙ্গে কোলাকুলি করেন, একসঙ্গে ছবি তোলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের উদ্দেশে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। প্রবাসের নিঃসঙ্গতার মাঝেও এই সামষ্টিক আনন্দ যেন কিছু সময়ের জন্য ভুলিয়ে দেয় পরিবার থেকে হাজার মাইল দূরে থাকার বেদনাকে। 

শিক্ষার্থীদের আনন্দ আরও গভীর করতে উপস্থিত হন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের প্রধান অধ্যাপক ড. হিসাব আল-কাজী। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোলাকুলি করেন, ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং তাদের মাঝে চকলেট বিতরণ করেন। পরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছবি তুলতেও দেখা যায় তাকে। একজন প্রশাসনিক প্রধানের এমন আন্তরিকতা বিদেশি শিক্ষার্থীদের মনে গভীর ভালোবাসা ও আপনত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করে। 

ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের ক্ষেত্রেও মিশরীয় সংস্কৃতির রয়েছে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য। পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হলে তারা সাধারণত বলেন, ‘কুল্লু সানা ওয়া আনতুম তাইয়িব’ অথবা ‘কুল্লু সানা ওয়া আনতুম বিখাইর’ যার অর্থ, ‘আপনাদের প্রতিটি বছর আনন্দ, শান্তি ও কল্যাণে ভরে উঠুক।’ 

এই শুভেচ্ছাবাক্যের মধ্যেও যেন ফুটে ওঠে মিশরীয় সংস্কৃতির আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্য। 

প্রবাসের মাটিতে পরিবার-স্বজন থেকে দূরে থেকেও শিক্ষার্থীদের মাঝে ঈদের আবেগ ছিল গভীর। অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জানান, ঈদের দিন মায়ের হাতের রান্না, গ্রামের বাড়ির ঈদগাহ, ছোটবেলার বন্ধু কিংবা পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো খুব বেশি মনে পড়ে। 

তবে আল-আজহারের ইসলামী পরিবেশ, তাকবিরের ধ্বনি এবং বিশ্বের নানা দেশের মুসলিম ভাইদের সঙ্গে একসঙ্গে ঈদ উদযাপন করার অভিজ্ঞতা সেই শূন্যতাকে অনেকটাই প্রশমিত করে। 

ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা, জ্ঞানচর্চা ও বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের অনন্য সংমিশ্রণে আল-আজহারের এবারের ঈদ উদযাপন যেন আবারও স্মরণ করিয়ে দিল ইসলাম কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয়ের নাম নয়, বরং এটি মানবতা, সহমর্মিতা, আত্মত্যাগ ও বৈশ্বিক ঐক্যের এক চিরন্তন সভ্যতা। আর সেই সভ্যতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে ঈদের দিন আবারও জেগে উঠেছিল হাজার বছরের প্রাচীন এই ইসলামী জ্ঞাননগরী। 

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

এক বছরেই ৩ ঈদ আর ২ হজ, বিরল নজির দেখবে মুসলিম বিশ্ব

এক বছরেই ৩ ঈদ আর ২ হজ, বিরল নজির দেখবে মুসলিম বিশ্ব

শাকিবের সিনেমায় এবার পাকিস্তানি নায়িকা

শাকিবের সিনেমায় এবার পাকিস্তানি নায়িকা

২০২৭ সালের রমজান ও ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা

২০২৭ সালের রমজান ও ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা

কায়রোতে প্রতিবাদ করেছিল আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

রক্তের অক্ষরে লেখা জুলাই কায়রোতে প্রতিবাদ করেছিল আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দ্বিগুণ করল আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দ্বিগুণ করল আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা ১০ গ্রাজুয়েটের তালিকায় ৭ জনই বাংলাদেশি

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা ১০ গ্রাজুয়েটের তালিকায় ৭ জনই বাংলাদেশি

আরও পড়ুন

মালয়েশিয়ায় নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান, ১৯৯ বাংলাদেশিসহ আটক ৬৩০

মালয়েশিয়ায় নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান, ১৯৯ বাংলাদেশিসহ আটক ৬৩০

ফ্রান্সে গণদাবি পরিষদের আহ্বায়ক কমিটি গঠন

ফ্রান্সে গণদাবি পরিষদের আহ্বায়ক কমিটি গঠন

সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাসের জরুরি সতর্কবার্তা

সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাসের জরুরি সতর্কবার্তা

সৌদিতে হামলায় হতাহত বাংলাদেশিদের পরিচয় জানা গেছে

সৌদিতে হামলায় হতাহত বাংলাদেশিদের পরিচয় জানা গেছে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম