ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য টঙ্গী উড়ালসড়ক, আতঙ্কে যাত্রী ও সাধারণ মানুষ
Advertisement
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ১০:৩০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে মোটরসাইকেলে চড়ে বাড়ির পথে ফিরছিলেন রনজু খাঁ। টঙ্গীর উড়ালসড়কের নির্জন অংশে পৌঁছতেই কয়েকজন যুবক তার পথরোধ করে। প্রথমে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, এরপর বাধা দিতেই শুরু হয় ধস্তাধস্তি।
একপর্যায়ে ছিনতাইকারীদের ছুরির আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে উড়ালসড়কের উপর লুটিয়ে পড়েন তিনি। পড়ে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনা গত বছরের ১৭ মে দিবাগত রাতে টঙ্গীর টেশিস কারখানাসংলগ্ন বিআরটি উড়ালসড়কে। নিহত ৩০ বছর বয়সি প্রাইভেটকার চালক রনজু খাঁ। তিনি পাবনার সদর থানার মজিদপুর গ্রামের বাসিন্দা।
সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে বিআরটি প্রকল্পের উড়াল সড়কের টঙ্গীবাজার বাটাগেট এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে সিদ্দিকুর রহমান (৫৭) নামে এক বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তার মৃত্যু হয়। নিহত সিদ্দিকুর রহমান বরিশালের বাবুগঞ্জ থানার বাসিন্দা ইসমাইল ফকিরের ছেলে। চাকরির সুবাদে তিনি পরিবারসহ টঙ্গীর মধুমিতা এলাকার ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় বিআরটি উড়ালসড়ক এবং এর আশপাশের সড়কগুলোতে দিন দিন বেড়েই চলেছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। বিশেষ করে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত সময়ে মোটরসাইকেল আরোহী, পথচারী, শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষ ছিনতাইকারীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। ছিনতাইয়ে বাধা দিলে হামলা, ছুরিকাঘাত এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গাজীপুরের টঙ্গী উড়ালসড়ক, বাটা গেট, স্টেশন রোড, নতুনবাজার, মধুমিতা ও আশপাশের এলাকায় গত ৪-৫ মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ভোররাত ও সকালবেলায় কর্মজীবী মানুষ, যাত্রী ও পথচারীরা ছিনতাইকারীদের শিকার হচ্ছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৪৬ জন ছিনতাইকারী গ্রেফতার হয়। এছাড়া টঙ্গী রেলস্টেশন এলাকায় ট্রেনে সংঘটিত ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেফতার করে রেলওয়ে পুলিশ। উত্তরা-টঙ্গী করিডোরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব। গত মার্চ মাসেও টঙ্গীতে আরও দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া যায়।
টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিম থানা পুলিশ, র্যাব এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ছিনতাই ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৭ মে টঙ্গীর টেশিস কারখানাসংলগ্ন উড়ালসড়কে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে রনজু খাঁ (৩০) নামে এক প্রাইভেটকারচালক নিহত হন। পরিবার নিয়ে টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় বসবাসকারী রনজু রাতের ডিউটি শেষে মোটরসাইকেলে বাসায় ফিরছিলেন। পথে ছিনতাইকারীরা তার গতিরোধ করে। তিনি বাধা দিলে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
একই বছরের ডিসেম্বরে টঙ্গীবাজার বাটা গেট এলাকায় উড়ালসেতুর ওপর ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী ও স্টোর অফিসার সিদ্দিকুর রহমান (৫৮) নিহত হন। সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে তিনি ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন বলে পুলিশ জানিয়েছিল।
এছাড়া আব্দুল্লাহপুর উড়ালসড়ক থেকে সেনাকল্যাণ ভবন সংযোগ সড়কে মাহফুজুর রহমান (২১) নামে এক পোশাক শ্রমিক ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন। টঙ্গীর সাহাজউদ্দিন স্কুল এলাকার পেছনে ছিনতাইকারীদের হামলায় জীবন (২৭) নামে এক বাসের হেলপার নিহত হন। ভোরে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল বলে স্বজনরা জানান।
এছাড়া সম্প্রতি টঙ্গী ফায়ার সার্ভিস কার্যালয়ের সামনে মহাসড়কে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আরও এক পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর স্থানীয় জনতা একজনকে ছিনতাইকারী সন্দেহে আটক করে গণপিটুনি দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উড়ালসড়কের অনেক অংশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। রাতে পুলিশ টহলও খুব কম দেখা যায়। ফলে ছিনতাইকারীরা সহজেই অবস্থান নিয়ে পথচারীদের টার্গেট করে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে কিছু লাইট সংযোগ দেওয়া হলেও এখন আবার সেগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে।
টঙ্গীর সাতাইশ এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, রাতে উড়ালসড়ক দিয়ে চলাচল করা এখন ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে। মোটরসাইকেল বা রিকশায় একা চলতে সাহস পাই না। কয়েকজন মিলে চলাফেরা করতে হয়। প্রায়ই শুনি কারো মোবাইল, টাকা কিংবা মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পোশাক কারখানার শ্রমিক আবু হানিফ বলেন, আমাদের অনেক সময় রাত ১১টা-১২টার দিকে ডিউটি শেষ হয়। বাসায় ফেরার পথে আতঙ্কে থাকতে হয়। ছিনতাইকারীরা দলবদ্ধভাবে থাকে। কেউ বাধা দিলে মারধর করে।
টঙ্গীবাজার এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, বিআরটি উড়ালসড়ক চালুর পর যাতায়াত সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। রাত নামলেই অনেক স্থান নির্জন হয়ে পড়ে। এ সুযোগে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বনানী এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে উড়ালসড়কের ওপর তিন যুবক তার মোটরসাইকেলের গতি রোধ করে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। প্রাণের ভয়ে কোনো প্রতিবাদ করতে পারিনি। ছিনতাইকারীরা হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
তিনি আরও বলেন, উড়ালসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং নিয়মিত পুলিশি টহল নিশ্চিত করা হলে ছিনতাই অনেকাংশে কমে আসবে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান বলেন, জেলা ও মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অশঙ্কাজনকহারে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে গেছে। এগুলো বন্ধ করতে দ্রুত পুলিশকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই সভায় জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, মহানগরীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সম্প্রতি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে, যা উদ্বেগজনক।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুল রহমান বলেন, ছিনতাইয়ের সঙ্গে যারা জড়িত তারা মূলত মাদকসেবনকারী। মাদকের টাকার জন্য তারা ছিনতাই করে। গত কয়েক মাসে ৭শ মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত আছে।
টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মেহেদী হাসান বলেন, উড়ালসড়ক ও আশপাশের এলাকায় ছিনতাই রোধে নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতি রাতেই দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে।

