নুসরাত হত্যা মামলায় খালাস, মায়ের সঙ্গে মুক্ত আকাশে সাত বছরের রাথি
Advertisement
সোনাগাজী (ফেনী) দক্ষিণ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাথির জগতের সীমানা ছিল চারটে ধূসর শক্ত দেয়াল আর লোহার ভারি গারদ। বাইরের দুনিয়ায় আকাশ কত বড় হয়, ঘাস কতটা সবুজ হয় কিংবা বৃষ্টির শব্দ কেমন শোনায়—এসবের কিছুই রাথি জানত না। কারণ জন্ম থেকেই তার ঠিকানা ছিল জেলখানা!
কামরুন নাহার মণির কোল আলো করে কারাগারের হাসপাতালেই রাথির জন্ম হয়েছে। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ সাতটি বছর। বন্দিশালার প্রহরীদের বুটের শব্দ, লোহার তালার ঝনঝনানি আর বাকি কয়েদিদের দীর্ঘশ্বাস—এ নিয়েই গড়ে উঠেছিল রাথির শৈশব।
সাত বছরের এই ছোট্ট মেয়েটির কাছে কারারক্ষীরাই ছিল ঘরের চেনা মানুষ। যখন অন্য শিশুরা খাতা-কলম আর খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, রাথি তখন জেলের মেঝেতে কুড়িয়ে পাওয়া খড়কুটো আর ছোট্ট চকের টুকরো দিয়ে দেয়ালের কোণে আঁকিবুঁকি কাটত।
জেলের উঠোনের এক চিলতে আকাশে উঁকি দেওয়া নীল আর মাঝে মাঝে উড়ে যাওয়া পাখির দলই ছিল তার একমাত্র স্বপ্নের জানালা। সে প্রতিদিন মাকে জিজ্ঞেস করত- ‘মা, ওই পাখিগুলো কোথায় যায়? জেলের বাইরেও কি একটা বড় ঘর আছে?’ মা চোখের জল লুকিয়ে মুচকি হেসে বলতেন, ‘আছে রে রাথি, সেখানে তোকে একদিন নিয়ে যাব।’
অবশেষে এলো সেই বহু কাঙ্ক্ষিত দিন। মায়ের সাজা শেষ হওয়ার পর যখন জেলের ওই ভারি লোহার দরজাটা প্রথমবার রাথির জন্য সম্পূর্ণ খুলে গেল, তখন তার বয়স ঠিক সাত বছর।
বাইরে পা রাখতেই চোখে পড়ল দিগন্তজোড়া খোলা আকাশ আর গায়ে লাগল মুক্ত বাতাস। এত আলো আর এত খোলা জায়গা দেখে থমকে দাঁড়াল ছোট্ট রাথি। কাঁচা ঘাসের উপর খালি পায়ে প্রথম হাঁটার স্পর্শে তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। জেলের অন্ধকার পেরিয়ে জীবনের নতুন আলোয় পা বাড়াল রাথি—তার সাত বছরের বন্দি শৈশবকে পেছনে ফেলে এক মুক্ত নীল আকাশের নিচে।
মঙ্গলবার সকালে মায়ের সঙ্গে গাজীপুর হাইসিকিউরিটি মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মায়ের সঙ্গে মুক্ত হন রাথি।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে ৭ জন ও মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ১ জন মুক্তি পেয়েছেন।
আটজনের মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-মামুন।
গাজীপুর কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্তরা হলেন- মো. শামীম, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, আফসার উদ্দিন, ইমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার উদ্দিন রানা, আব্দুর রহিম শরীফ এবং কামরুন নাহার মনি।
গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, জামিনের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে দুপুর পৌনে ১টার দিকে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন নিহত নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনী জেলা ও দায়রা জজ মামুনুর রশিদের আদালত ১৬ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছিলেন। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে গত ২৪ আগস্ট অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড ও চারজন আসামি নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ও উম্মে সুলতানা পপির যাবজ্জীবন এবং ১০ জন আসামিকে খালাস প্রদান করা হয়।
