Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

নবম শ্রেণিতে ফেল করে স্কুলছাড়া সেই ছেলেটি এখন নাসার গবেষক

Advertisement

Icon

বিশ্বজিৎ সাহা, নরসিংদী

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

নবম শ্রেণিতে ফেল করে স্কুলছাড়া সেই ছেলেটি এখন নাসার গবেষক

আল ইমরান

Advertisement

নবম শ্রেণির পরীক্ষায় ফেল করে একদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন যে ছেলেটি, সেই ছেলেই আজ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নাসা) জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে (জেপিএল) মঙ্গলগ্রহ নিয়ে গবেষণা করছেন।

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার পশ্চিম রামপুর গ্রামের সন্তান আল ইমরানের এই যাত্রা যেন এক রূপকথার মতোই—তবে বাস্তব। আর তাতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ব্যর্থতা, ফিরে দাঁড়ানো আর একগুঁয়ে অধ্যবসায়ের গল্প।

সবুজ প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা ইমরানের ছোটবেলা থেকেই ছিল নতুন কিছু জানার নেশা। হাতের কাছে যা পেতেন, তা নিয়েই লেগে যেতেন খুঁটিনাটি অনুসন্ধানে। বাবা মো. নুরুল ইসলাম বীর আহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মা মাহমুদা খাতুন গৃহিণী। চার ভাই-বোনের মধ্যে ইমরান তৃতীয়।

কিন্তু এই কৌতূহলী ছেলেটির শিক্ষাজীবনের শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। নবম শ্রেণিতে ফেল করে উপজেলার রামনগর উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়তে হয়েছিল তাকে। পরে তিনি ভর্তি হন খিদিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এসএসসি ও খিদিরপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেন। তবে ফল ছিল একেবারেই সাদামাটা। ২০০৪ সালে খিদিরপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পান জিপিএ-৩.৫৭, আর ২০০৬ সালে খিদিরপুর কলেজ থেকে ৪.৪ পান।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়ার স্বপ্ন ছিল ইমরানের, কিন্তু ফল কম থাকায় ভর্তি পরীক্ষাতেই বসতে পারেননি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিভাগে ভর্তি হলেও কোনো ক্লাশই করেননি তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পেলেও অবস্থান ছিল বেশ পেছনের দিকে। শেষমেশ ঠাঁই হয় ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে—যে বিভাগ থেকেই একদিন তার মহাকাশচর্চার সূত্রপাত হবে, তা তখন কেউ ভাবেননি।

পড়াশোনার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ারও চেষ্টা চালিয়ে গেছেন ইমরান। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে দশবারের বেশি চেষ্টা করেও সফল হননি। আইএসএসবি পরীক্ষায় দুইবার অংশ নিয়ে দুইবারই পেয়েছেন ‘রেড কার্ড’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান পড়তে গিয়েই মহাকাশ নিয়ে কৌতূহল জন্মায় ইমরানের মনে। অনার্স ও মাস্টার্স— দুই পরীক্ষাতেই বিভাগে প্রথম হন তিনি, সিজিপিএ যথাক্রমে ৩.৬৯ ও ৩.৯৭। স্বপ্ন ছিল নিজের বিভাগেই শিক্ষক হওয়ার। একাধিকবার আবেদন করলেও কখনই নিয়োগের জন্য বিবেচিত হননি। পরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক বছর শিক্ষকতা করেন তিনি।

ইমরানের বড় ভাই মাহবুবুল আলম বলেন, ইমরান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছিল। এর জন্য সে বিসিএস পরীক্ষাও দেয়নি; কিন্তু বিভাগে প্রথম হয়েও সে শিক্ষক হতে পারেনি। অনেকটা অভিমান নিয়ে সে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমায়।

উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রস্তুতিতেও ভোগান্তির শেষ ছিল না। আইইএলটিএস, জিআরই ও টোফেল—প্রতিটি পরীক্ষায় দুইবার করে ব্যর্থ হন তিনি। এরপর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে টানা ১৫টি প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হন। অবশেষে ২০১৭ সালে আলাবামার অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে প্ল্যানেটারি জিওসায়েন্সে মাস্টার্স করার সুযোগ পান, যেখানে অর্জন করেন পূর্ণ সিজিপিএ-৪।

এরপর ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাস থেকে স্পেস অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন ইমরান। পিএইচডির শেষপর্যায়ে চোখে পড়ে জেপিএলের পোস্ট ডক্টরাল ফেলো নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি। আবেদনের পর কয়েক ধাপের যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার শেষে মেলে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ। ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি নাসার জেপিএলে যোগ দেন তিনি, নাম ওঠে সংস্থাটির ওয়েবসাইটের পোস্ট ডক্টরাল ফেলোদের তালিকায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় অবস্থিত জেপিএল নাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন গবেষণা কেন্দ্রগুলোর একটি, যার ব্যবস্থাপনায় আছে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক) এবং অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার। এখানে ইমরানের কাজের মূল ক্ষেত্র মঙ্গলগ্রহ—গ্রহটিতে প্রাণের সম্ভাব্য বসবাসযোগ্য পরিবেশ অনুসন্ধান নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন তিনি, যার তত্ত্বাবধানে আছেন জেপিএলের গবেষণা বিজ্ঞানী ক্যাথরিন স্ট্যাক মরগান।

ইমরানের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তার স্বজন, বন্ধু ও এলাকাবাসী। চাচাতো ভাই ও মনোহরদী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান মাসুদ পারভেজ বলেন, ইমরানের এই সাফল্য আমাদের গর্বের। ছোটবেলা থেকেই সে কঠোর পরিশ্রম করেছে। আজ তার ফল সে পেয়েছে। নাসা সবার স্বপ্নের ঠিকানা, আর ইমরান সেখানে কাজ করবে—এটা সত্যিই আমাদের কাছে খুব আনন্দের ও গর্বের।

ইমরানের মা মাহমুদা খাতুন বলেন, ছোটবেলা থেকেই ইমরানের নতুন জিনিসের প্রতি নেশা ছিল। পড়ালেখার পাশাপাশি নানা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকত। আজ সে নাসায় কাজ করছে। তার গবেষণার ধারা যেন দেশ ও মানবজাতির কল্যাণে আসে—মা হিসেবে ওর সাফল্যে আমি অনেক খুশি ও গর্বিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে না পারা নিয়ে ইমরান নিজেই সাংবাদিকদের বলেন, আমাকে কেন নেওয়া হয়নি, তা জানি না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না হওয়াটা আমার জন্য ভালোই হয়েছে। একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেলে অনেক দরজা খুলে যায়।

গবেষণার পাশাপাশি ইমরানের লক্ষ্য বাংলাদেশের তরুণদের মহাকাশ গবেষণায় আগ্রহী করে তোলা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মহাকাশ ও গ্রহবিজ্ঞান নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে উৎসাহিত করতে চান তিনি।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

জনরোষের মুখে মদের দোকানে তালা দিল যুবদল-ছাত্রদল

পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা জনরোষের মুখে মদের দোকানে তালা দিল যুবদল-ছাত্রদল

নরসিংদীতে অটোরিকশা-কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে নিহত ২

নরসিংদীতে অটোরিকশা-কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে নিহত ২

ষড়যন্ত্র করে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করা যাবে না

খায়রুল কবির খোকন ষড়যন্ত্র করে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করা যাবে না

নৌকাবাইচে হারানো আনন্দ-সম্প্রীতি ফিরে আসবে: এলজিআরডি মন্ত্রী

নৌকাবাইচে হারানো আনন্দ-সম্প্রীতি ফিরে আসবে: এলজিআরডি মন্ত্রী

স্বর্ণের চেইনের লোভে নামাজরত বৃদ্ধাকে হত্যা

স্বর্ণের চেইনের লোভে নামাজরত বৃদ্ধাকে হত্যা

এক কেসেই ধরা পড়ল ১১০ কোটি জালিয়াতির নীলনকশা, বাকি ৭টিতে কত?

এক কেসেই ধরা পড়ল ১১০ কোটি জালিয়াতির নীলনকশা, বাকি ৭টিতে কত?

আরও পড়ুন

কিশোর গ্যাং বিরোধী যৌথ অভিযানে আটক ১০০

কিশোর গ্যাং বিরোধী যৌথ অভিযানে আটক ১০০

রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি ঐতিহ্য হারিয়ে ধুঁকছে পাঠকখরায়

ঐতিহ্য হারিয়ে ধুঁকছে পাঠকখরায়

স্কুলছাত্রীর লাশ ঘিরে মিলছে নানা তথ্য যশোরে মন্দির দখলে নিতে ইসকনের অপতৎপরতা

যশোরে মন্দির দখলে নিতে ইসকনের অপতৎপরতা

খুলনা সিটি নির্বাচন বিএনপির বাধা কোন্দল গ্রুপিং জামায়াতের টার্গেট ‘মেয়র’

বিএনপির বাধা কোন্দল গ্রুপিং জামায়াতের টার্গেট ‘মেয়র’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম