মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ এত জনপ্রিয় কেন?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম
মাহাথির মোহাম্মদ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মালয়েশিয়ার আধুনিক ইতিহাসে মাহাথির মোহাম্মদ এমন এক নাম, যিনি কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক সীমানাই বদলাননি, বরং বিশ্বমঞ্চে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
মাহাথিরের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা খুব সাধারণ কোনো অভিজাত পরিবার থেকে হয়নি। পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও তরুণ বয়স থেকেই তিনি লেখালেখির মাধ্যমে সমাজের অসংগতি ও মালয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে সোচ্চার হন।
ব্রিটিশ ও পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। প্রভাবশালী দল ইউএমএনও-র ভেতর নিজের অবস্থান শক্ত করে ১৯৭৬ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৮১ সালে দেশের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনিই প্রথম কোনো সাধারণ পরিবারের সন্তান যিনি মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতাধিকারী হন।
তার দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতিতে টিকে থাকা এবং বিপুল জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এক সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপরেখার গল্প। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তার প্রথম দীর্ঘ আড়াই দশকের শাসনামলে মালয়েশিয়া একটি অনুন্নত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পনির্ভর রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।
কুয়ালালামপুরের আইকনিক পেত্রোনাস টুইন টাওয়ার নির্মাণ, বিশাল মহাসড়ক এবং প্রোতোন কার প্রকল্পের মতো মেগা প্রজেক্টগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে এক অভাবনীয় জাতীয় গৌরব তৈরি করেছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তার সাহসী পদক্ষেপ এবং দূরদর্শিতা সাধারণ মালয়েশীয় নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান বদলে দেয়, যা তাকে ‘আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি’ হিসেবে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে দেয়।
তবে মাহাথিরের রাজনৈতিক টিকে থাকার সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায রচিত হয় তার বয়োবৃদ্ধ বয়সে এসে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়ে তিনি ২০১৮ সালে অবসরের দীর্ঘ বিরতি ভেঙে ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে ওঠা বিশাল দুর্নীতি এবং ১এমডিবি কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে তিনি বিরোধী জোটকে ঐক্যবদ্ধ করেন।
৯২ বছর বয়সে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে তিনি নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেন এবং বিশ্বের প্রবীণতম নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে পুনরায় ক্ষমতা দখল করেন। বিবিসি ও সিএনএন-এর প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে বলা হয়েছিল মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পালাবদল, যেখানে দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং সাধারণ ভোটাররা দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে তার ওপরই ভরসা রেখেছিল।
রাজনৈতিক কৌশল, সংকটে আপসহীন মনোভাব এবং জনগণের পালস বোঝার অদ্ভুত ক্ষমতার কারণেই মাহাথির মোহাম্মদ দশকের পর দশক ধরে প্রাসঙ্গিক ও জনপ্রিয় হয়ে আছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তাকে এমন একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে চিত্রিত করে আসছে, যিনি প্রয়োজনে নিজের রাজনৈতিক মিত্রের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যেতে দ্বিধা করেন না।
দশকের পর দশক ক্ষমতার কেন্দ্রে বা বাইরে থাকা সত্ত্বেও মালয়েশিয়ার সাধারণ মানুষের মণিকোঠায় তার এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানের মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে তার আপসহীন দেশপ্রেম এবং দৃশ্যমান উন্নয়নমূলক দূরদর্শিতায়।
সূত্র: বিবিসি, সিএনএন ও রয়টার্স।


