গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা
পলাতক আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকরা
নতুন সরকার গঠন ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কেউ কেউ * সংস্থার প্রধানরা অফিসে না আসায় গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাত দেওয়া যাচ্ছে না
Advertisement
মনির হোসেন
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা চলছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিনির্ধারকরা হয় পলাতক, না হয় কর্মকর্তাদের তোপের মুখে। ফলে প্রতিষ্ঠান নিষ্ক্রিয় ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে-বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ) অন্যতম। এমনিতেই সরকারি ছুটি ও কোটাবিরোধী আন্দোলনের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। এরপর অফিস চালু হলে শীর্ষ কর্মকর্তারা অনুপস্থিত থাকায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রধানরা অপেক্ষায় আছেন নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের জন্য। তারা মনে করছেন, নতুন সরকার যদি তাদের দায়িত্ব অব্যাহত রাখতে নির্দেশনা দেয়, তাহলে দায়িত্বে ফিরবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সংস্থার প্রধান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আমাদের নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক। কেউ কেউ বলেছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কাউকে রাখা হবে না। আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে অফিসে না আসার জন্য বলা হয়েছে। ফলে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছেন। সবুজ সংকেত পেলে তিনি আসবেন।
ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারক বাংলাদেশ ব্যাংক। ছুটি শেষ হওয়ার পর ২ দিনেও অফিসে যাননি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। চুক্তির মেয়াদ অনুসারে আরও ২ বছর তার চাকরির মেয়াদ রয়েছে। তিনি কোথায় আছেন তা কেউ জানেন না।
এ ব্যাপারে বুধবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ইতোমধ্যে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ব্যাংক সেক্টরকে ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অপরদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন ৪ জন ডেপুটি গভর্নর। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিভাবক এই প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন কাজের সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ থাকল না।
শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন কিছু কাজ রয়েছে। কিন্তু ২ দিনে অফিস করেননি বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। চলতি বছরের মে মাসে তাকে ৪ বছরের জন্য পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয়। এ হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর মাত্র ২ মাস পার হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির চারজন কমিশনের মধ্যে এটিএম তারিকুজ্জামান ছাড়া সবাই অনুপস্থিত। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকেই কিছু জানানো হয়নি।
এ ব্যাপারে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম যুগান্তরকে বলেন তিনি দেশেই আছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছুটি ছাড়া নিজের ইচ্ছায় অফিসে না আসা শৃঙ্খলা ভঙ্গ। দেশের রাজস্ব আদায়ের প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। তিনি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।
তার পদত্যাগের দাবিতে বুধবার দিনভর বিক্ষোভ করেছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাবেক জয়নুল বারী। ৩ বছর আগে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার চুক্তির মেয়াদ আরও ১ বছর রয়েছে। কিন্তু গত ২ দিন পর্যন্ত তিনি অফিস করছেন না। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি।
ফলে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শীর্ষ কর্তা না আসায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংস্থার প্রধানরা অফিসে না আসায় কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় থাকা ফাইলগুলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে ফেরত পাঠানো হয়। এছাড়াও অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন অফিসে আসেননি। আরও কয়েকটি ব্যাংক ও সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবিতেও অচলাবস্থা চলছে।
আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণী এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে একমাত্র যোগ্যতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে রোববার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্য মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেছেন বলে গণ্য হয়। অর্থাৎ রোববারই মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত হয়েছে।
এরপর মঙ্গলবার সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ফলে রাজনৈতিক সরকার বলতে দেশে আর কিছু থাকল না। এ কারণে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া লোকজন বর্তমানে আতঙ্ক আছেন। অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের কারণে কেউ কেউ দেশ ত্যাগ করার চেষ্টা করছেন। তবে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আজ শপথ নিতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অনেকেই সরকারের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছেন।
