বিশ্ব সিনেমার হালচাল
বক্স অফিসে কে এগিয়ে
চলতি বছরের দুই তৃতীয়াংশ প্রায় শেষ। বিশ্ব সিনেমার বাজারে এরইমধ্যে শুরু হয়েছে হিসাব নিকাশ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্ব সিনেমার বক্স অফিসে একদিকে হলিউডের বড় বাজেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি ও অ্যানিমেশন, অন্যদিকে স্থানীয় ভাষার সিনেমা-দুই ধারাই সমানভাবে আলোচনায়। বিশেষ করে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, ইন্দোনেশিয়া ও হংকংয়ের বাজারে স্থানীয় সিনেমার শক্তিশালী উপস্থিতি আন্তর্জাতিক বক্স অফিসের চিত্রকে বৈচিত্র্যময় করেছে। আবার চীনে বড় ধস নামলেও জাপানে স্থানীয় অ্যানিমেটেড ও হলিউডের সিনেমা মিলিয়ে বাজার ছিল তুলনামূলক জমজমাট। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
এফ আই দীপু
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চলতি বছরের শুরু থেকে প্রথম ছয় মাসে বিশ্ব সিনেমার বক্স অফিসের হিসাব করলে ধারাবাহিকভাবে প্রথম বিশটি দেশের অবস্থান দাঁড়ায় এভাবে-যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ইতালি, মেক্সিকো, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, পোল্যান্ড, মালয়েশিয়া, হংকং, আর্জেন্টিনা ও ফিলিপাইন।
চলতি বছর প্রথম ছয় মাসে বিশ্বের সিনেমা বাজারে সবচেয়ে বড় বক্স অফিস হিসাবে সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশটির প্রেক্ষাগৃহে আয় হয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। ‘টয় স্টোরি ৫’, ‘সুপার মারিও গ্যালাক্সি’, ‘মাইকেল’ ও ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ ছিল বাজারের উল্লেখযোগ্য চালিকাশক্তি।
এর পরেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ভারত। বছরের প্রথম ছয় মাসে ভারতের বক্স অফিসে মোট আয় হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩৯৮ কোটি রুপি এবং সিনেমা দেখেছেন প্রায় ৩৭ কোটি ৮০ লাখ দর্শক। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আয় বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। ‘ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ’ একাই মোট বাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ দখল করেছে।
বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার চীনে অবশ্য ছিল বিপরীত চিত্র। প্রথম ছয় মাসে দেশটির বক্স অফিস দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ইউয়ান, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কম। তবে স্থানীয় সিনেমাই ছিল বাজারের প্রধান শক্তি। স্থানীয় সিনেমা ‘পেগাসাস ৩’ আয় করেছে প্রায় ৪ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ইউয়ান।
জাপানে অ্যানিমেশন ও পরিচিত ফ্র্যাঞ্চাইজির দাপট অব্যাহত রয়েছে। ‘জোটোপিয়া ২’ প্রায় ১৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইয়েন এবং ‘ডিটেকটিভ কোনান ২৯’ প্রায় ১৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইয়েন আয় করেছে। দেশটির বাজারে স্থানীয় অ্যানিমেশন ও আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশনের মধ্যে শক্ত প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথমার্ধে বক্স অফিসের আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭৯ বিলিয়ন কোরিয়ান ওন। প্রেক্ষাগৃহে দর্শকসংখ্যা ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি। বছরের প্রথম ছয় মাসে স্থানীয় সিনেমার আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ‘দ্য কিংস ওয়ার্ডেন’ একাই আয় করেছে প্রায় ১৬৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ওন।
ইউরোপে ফ্রান্স ছিল উল্লেখযোগ্য বাজার। প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৯ কোটি ১১ লাখ দর্শক সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে গেছেন। স্থানীয় সিনেমা ‘মারসুপিলামি’ ছয় মিলিয়নের বেশি দর্শক টেনে নেয়।
যুক্তরাজ্যে প্রথমার্ধে বক্স অফিস আয় হয়েছে প্রায় ৫৫২ মিলিয়ন পাউন্ড এবং দর্শকসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ। ‘মাইকেল’ প্রায় ৫২ দশমিক ৯ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করে শীর্ষস্থানীয় সিনেমাগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
জার্মানিতে বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৪ কোটি ৭৫ লাখ টিকিট বিক্রি হয়েছে এবং বক্স অফিসে আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০২ দশমিক ২ মিলিয়ন ইউরো। ‘সুপার মারিও গ্যালাক্সি’, ‘মাইকেল’ ও ‘এক্সট্রারাস্ট’ ছিল আলোচিত সিনেমাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
চলতি বছরে প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ায় সিনেমার দর্শকসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। এপ্রিল, মে ও জুন-টানা তিন মাস দেশটির মাসিক বক্স অফিস ১০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের ওপরে ছিল। ‘মাইকেল’, ‘উইদারিং হাইটস’, ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ ও ‘সুপার মারিও গ্যালাক্সি’ ছিল বাজারের উল্লেখযোগ্য সিনেমা।
স্পেনে স্থানীয় সিনেমার সাফল্য বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। বছরের প্রথমার্ধে স্প্যানিশ সিনেমার আয় হয়েছে প্রায় ৫৯ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের প্রায় দ্বিগুণ। এ সময় ‘টরেন্টি’, ‘প্রেসিডেন্টি ’ একাই ২৮ মিলিয়ন ইউরোর বেশি আয় করেছে।
ইতালিতেও বছরের প্রথমার্ধে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক বেড়েছে। প্রথম পাঁচ মাসেই দর্শকসংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি ছিল। ‘দ্য ডেভিল উইয়াস প্রাডা ২’ ও ‘মাইকেল’ ছিল আলোচিত আন্তর্জাতিক সিনেমা।
মেক্সিকো লাতিন আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা বাজার হিসাবে এগিয়ে রয়েছে। জুনে ‘টয় স্টোরি ৫’ একাই প্রায় ৭৯ মিলিয়ন ডলারের মোট ব্যবসা করেছে।
ব্রাজিলে প্রথমার্ধের আলোচিত সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘মাইকেল’ শীর্ষে ছিল। সিনেমাটি দেশটিতে প্রায় ১৬৮ দশমিক ৪ মিলিয়ন ব্রাজিলিয়ান রিয়েল আয় করেছে।
ইন্দোনেশিয়ায় বছরের প্রথমার্ধে মোট দর্শকসংখ্যা ছিল প্রায় ৫ কোটি ৩৮ লাখ। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো-প্রথম পাঁচটি সর্বাধিক দেখা সিনেমাই ছিল স্থানীয়। এরমধ্যে ‘দানুর : দ্য লাস্ট চ্যাপটার’ প্রায় ৩৬ লাখ দর্শক নিয়ে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে।
তুরস্কে প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ দর্শক সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে গেছেন। বক্স অফিস আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন তুর্কি লিরা।
পোল্যান্ডে প্রথমার্ধে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ দর্শক সিনেমা দেখেছেন। ‘দ্য ওডিসি’, ‘মিনিয়নস অ্যান্ড মনস্টারস’ এবং ‘টয় স্টোরি ৫’ ছিল আলোচিত সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে মালয়েশিয়ায় স্থানীয় সিনেমার উপস্থিতি শক্তিশালী ছিল। দেশটির স্থানীয় সিনেমা ‘তারাং : আনফরগিভেন’ প্রায় ২৩ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন রিঙ্গিত, ‘পোলং’ প্রায় ১৪ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন এবং ‘লিবাং লিবু’ প্রায় ১৪ দশমিক ১৬ মিলিয়ন রিঙ্গিত আয় করেছে।
হংকংয়ের বক্স অফিসে প্রথম ছয় মাসে আয় হয়েছে প্রায় ৬৬৪ মিলিয়ন হংকং ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। স্থানীয় সিনেমা ‘নাইট কিং’ একাই ১১৮ দশমিক ১ মিলিয়ন হংকং ডলার আয় করেছে।
আর্জেন্টিনায় প্রথম ছয় মাসে সিনেমা দেখেছেন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ দর্শক। বাজারের শীর্ষ সিনেমাগুলোর মধ্যে ছিল ‘টয় স্টোরি ৫’। তবে এ দেশে স্থানীয় সিনেমার বাজার-অংশ ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট।
সবশেষে ফিলিপাইনে আন্তর্জাতিক সিনেমার মধ্যে ‘টয় স্টোরি ৫’ ছিল অন্যতম আলোচিত। জুন মাসেই সিনেমাটি প্রায় ৫ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার আয় করে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের হিসাব দেখাচ্ছে, বিশ্ব বক্স অফিসে একক কোনো ধারার আধিপত্য নেই। হলিউডের বড় বাজেটের সিনেমার পাশাপাশি স্থানীয় ভাষার সিনেমা, অ্যানিমেশন, জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং নিজস্ব সংস্কৃতিনির্ভর গল্প-সবই বিভিন্ন দেশের দর্শক টানছে।
