Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

নিরাপদ রাষ্ট্র, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ: শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্যতা

Advertisement

Icon

মো. মুখলেছুর রহমান

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

নিরাপদ রাষ্ট্র, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ: শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্যতা

Advertisement

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং সার্বভৌমত্বের ভিত্তি হলো তার নিরাপত্তা। যে রাষ্ট্র নিজের ভূখণ্ড, জনগণ, অর্থনীতি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম নয়, সে রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অর্জন যত বড়ই হোক না কেন, তা থাকে অরক্ষিত। 

বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হামলা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা কোনো বিলাসিতা নয়; বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য্য।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী সংঘাত ও যুদ্ধের সংখ্যা বেড়েছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা কিংবা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা প্রমাণ করেছে যে পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক যতই মধুর হোক না কেন, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাষ্ট্রগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। নিজেদের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করেনা; কোনও ছাড়ও দেয়না। 

শুনতে যেমনই লাগুক না কেনো-এটাই চরম বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের প্রস্তাব কিংবা বৈশ্বিক জনমতও অনেক সময় সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী ও আধুনিক রাখতে হয়।

বাংলাদেশ শান্তি ও সহযোগিতার নীতিতে বিশ্বাসী একটি দেশ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কখনো আগ্রাসী সামরিক নীতি অনুসরণ করেনি। বরং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে বিশ্বে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ নীতি গ্রহণের অর্থ এই নয় যে নিরাপত্তা প্রস্তুতি দুর্বল হতে হবে। 

বরং শান্তি বজায় রাখতে এবং শত্রুর সম্ভাব্য হুমকি প্রতিহত করতে একটি আধুনিক কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দুর্বল রাষ্ট্রের প্রতি আগ্রাসনের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে; আর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব কেবল সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক যুগে নিরাপত্তার ধারণা বহুমাত্রিক। এখন রাষ্ট্রকে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিতে হয়। 

একটি সাইবার হামলা যেমন ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে বিপর্যস্ত করতে পারে, তেমনি তথ্যযুদ্ধ একটি দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তিনির্ভর এবং বহুমাত্রিক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকার কারণে দেশটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি সম্ভাবনাময় কেন্দ্র। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশাল সামুদ্রিক সম্পদের অধিকার লাভ করেছে। 

এই সম্পদ রক্ষা, গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ সুরক্ষিত রাখা এবং ভবিষ্যৎ ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শক্তিশালী নৌ সক্ষমতা অপরিহার্য। একইভাবে আকাশসীমা সুরক্ষা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নও জাতীয় নিরাপত্তার অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ। বিশ্বের অনেক দেশ এখন প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। 

বিদেশি সরঞ্জামের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শুধু ব্যয়বহুলই নয়, সংকটকালে সরবরাহ ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং স্থানীয় শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি অংশ দেশীয়ভাবে গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে।

তবে প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধির অর্থ কখনোই যুদ্ধমুখী রাষ্ট্র গঠন নয়। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি, যাতে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করা যায় এবং যুদ্ধের প্রয়োজনই না পড়ে। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো শান্তি রক্ষা, সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতগুলোকে উপেক্ষা করে কেবল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। 

কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল তার অস্ত্রভাণ্ডারে নয়; বরং তার মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং জাতীয় ঐক্যের মধ্যেও নিহিত থাকে। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং মানবিক উন্নয়ন—দুটোকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

একই সঙ্গে নাগরিকদের মধ্যেও জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। দেশপ্রেম, সামাজিক সম্প্রীতি, আইন মেনে চলার সংস্কৃতি এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ আধুনিক নিরাপত্তা ধারণায় নাগরিকরাও নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, নিরাপদ রাষ্ট্র ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা—সবকিছুর পূর্বশর্ত হলো নিরাপত্তা। তাই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচিৎ, যুগোপযোগী, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ এবং আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। 

কারণ শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কেবল সীমান্ত রক্ষা করে না; এটি একটি জাতির আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতা এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যতেরও অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাবেক ক্যাডেট আর্মি উইং, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

উপসাগরীয় নিরাপত্তায় পাকিস্তানের প্রভাব কি বাড়ছে?

কুয়েতের সঙ্গে নতুন চুক্তি উপসাগরীয় নিরাপত্তায় পাকিস্তানের প্রভাব কি বাড়ছে?

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে সারা দেশে র‍্যাবের বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে সারা দেশে র‍্যাবের বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা

হামলার আশঙ্কায় পুলিশের সহায়তা চাইল পল্লী বিদ্যুৎ

দেশজুড়ে লোডশেডিং হামলার আশঙ্কায় পুলিশের সহায়তা চাইল পল্লী বিদ্যুৎ

পার্বত্যাঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তৎপর রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী

পার্বত্যাঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তৎপর রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী

পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ‘ভারত-সমর্থিত’ ৪৩ সশস্ত্র ব্যক্তি নিহত

পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ‘ভারত-সমর্থিত’ ৪৩ সশস্ত্র ব্যক্তি নিহত

সিসি ক্যামেরা কেনার আগে যে বিষয়গুলো অবশ্যই জানা জরুরি

সিসি ক্যামেরা কেনার আগে যে বিষয়গুলো অবশ্যই জানা জরুরি

আরও পড়ুন

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন ও Culinary Tourism-এর প্রভাব!

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন ও Culinary Tourism-এর প্রভাব!

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়?

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়?

একটি বিরলপ্রজ ভাষণে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

একটি বিরলপ্রজ ভাষণে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

বিলুপ্তির পথে উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবসায় শিক্ষা শাখা

বিলুপ্তির পথে উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবসায় শিক্ষা শাখা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম