Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন উত্তেজনা

যুদ্ধ নয়, কূটনীতির পথই হোক শেষ ভরসা

Advertisement

Icon

মো. মুখলেছুর রহমান

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৫:০২ এএম

যুদ্ধ নয়, কূটনীতির পথই হোক শেষ ভরসা

Advertisement

মধ্যপ্রাচ্য আবারও এমন এক অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে। যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি অতিরিক্ত সামরিক পদক্ষেপ কিংবা একটি ভুল হিসাব পুরো অঞ্চলকে নতুন করে বৃহত্তর এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধের ইতিহাস বলছে, সংঘাতের শুরু সাধারণত দৃশ্যমান হয়; কিন্তু তার পরিণতি প্রায়ই ধারণার বাইরে চলে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিও যেন সেই পুরোনো বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি। 

সামরিক হামলা, পাল্টা হামলা, কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া ও প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন তো বটেই ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আধুনিক বিশ্বের যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের নয়; তথ্যেরও। যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পাশাপাশি চলছে তথ্যযুদ্ধ, প্রচারণা যুদ্ধ এবং জনমত গঠনের যুদ্ধ। এক পক্ষ কোনো হামলাকে সামরিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করছে, অন্য পক্ষ সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কোনো ঘটনা ঘটার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা সামনে আসছে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ক্রমশ আঞ্চলিক চরিত্র ধারণ করছে। একটি দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক পদক্ষেপ অন্য দেশের ভূখণ্ড, অবকাঠামো বা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে যুদ্ধের ভৌগোলিক সীমা বিস্তৃত হচ্ছে এবং ঝুঁকির পরিধিও ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা। বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, তেল স্থাপনা কিংবা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আক্রান্ত হলে তার প্রভাব কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি যেমন বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তেমনি এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান উত্তেজনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা। ইরানকে ঘিরে বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক পরিসরে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সেই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। 

তবে এ ধরনের বিষয়ে যাচাইহীন তথ্য, গুজব কিংবা অনুমানভিত্তিক বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রের বাস্তব অস্তিত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর সম্ভাবনা সম্পর্কিত ধারণাও কৌশলগত ভারসাম্যে গভীর প্রভাব ফেলে।

একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতির সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে এসেছে। যখন এক পক্ষ আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলে এবং অন্য পক্ষ তা অস্বীকার করে, তখন বোঝা যায় যে আস্থার সংকট কতটা গভীর। অথচ দীর্ঘমেয়াদে কোনো সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সামরিক শক্তি দিয়ে সম্ভব হয় না। ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব কমই রয়েছে, যেখানে কেবল সামরিক বিজয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পেরেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই ফিরে আসতে হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ বহু দশক ধরে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল্য দিয়ে আসছে। নতুন প্রজন্মের জন্যও যদি একই বাস্তবতা অপেক্ষা করে, তবে তা হবে গোটা অঞ্চলের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি। রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ বাস্তব হতে পারে, জাতীয় স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু সেই স্বার্থ রক্ষার পথ যদি ক্রমাগত সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সংযম। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। উত্তেজনা প্রশমনের জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ একটি পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই নতুন সংকট ডেকে আনতে পারে।

বিশ্ব ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতের চাপে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বৃহত্তর যুদ্ধের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সুখকর কোনো বার্তা নয়।

সামরিক শক্তি কোনো দেশের ক্ষমতার পরিচয় হতে পারে, কিন্তু দূরদর্শী কূটনীতিই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে। তাই বর্তমান সংকটের সময়ে প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, শান্তিপূর্ণ সমাধানের রাজনীতিই হওয়া উচিত সকল পক্ষের অগ্রাধিকার। যুদ্ধের আগুন জ্বালানো সহজ; কিন্তু সেই আগুন নেভানোর দায় শেষ পর্যন্ত সবাইকেই বহন করতে হয়। সকলে দায়িত্ব নিয়েও সে আগুন নেভাতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সক্ষম হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নেভানো সম্ভব হয়ে উঠেনা। এটাই মানব সভ্যতার জন্য বড় সুসংবাদ।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গবেষক, অর্থনীতিবিদ, মানবাধিকার কর্মী ও সমাজচিন্তক

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

তেহরানে হামলায় মোজতবা খামেনির আহত হওয়ার দাবি, অবস্থান নিয়ে রহস্য

তেহরানে হামলায় মোজতবা খামেনির আহত হওয়ার দাবি, অবস্থান নিয়ে রহস্য

মার্কিন হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ ইরান: আরাগচি

মার্কিন হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ ইরান: আরাগচি

হামলা হলে নতুন অস্ত্রে পালটা জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের

হামলা হলে নতুন অস্ত্রে পালটা জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের

যুদ্ধবিরতির আশায় কমল তেলের দাম

যুদ্ধবিরতির আশায় কমল তেলের দাম

যুদ্ধের চাপে বিপর্যস্ত মার্কিন সেনারা, ৮ জনের  আত্মহত্যার চেষ্টা

যুদ্ধের চাপে বিপর্যস্ত মার্কিন সেনারা, ৮ জনের আত্মহত্যার চেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রকে ৫ দিনের আলটিমেটাম দিল ইরান

যুক্তরাষ্ট্রকে ৫ দিনের আলটিমেটাম দিল ইরান

আরও পড়ুন

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন ও Culinary Tourism-এর প্রভাব!

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন ও Culinary Tourism-এর প্রভাব!

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়?

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়?

একটি বিরলপ্রজ ভাষণে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

একটি বিরলপ্রজ ভাষণে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

বিলুপ্তির পথে উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবসায় শিক্ষা শাখা

বিলুপ্তির পথে উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবসায় শিক্ষা শাখা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম