Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

ভারতের ২৫০ টাকার ইলিশ দেশের বাজারে কেন ২০০০ টাকা?

Advertisement

Icon

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম

ভারতের ২৫০ টাকার ইলিশ দেশের বাজারে কেন ২০০০ টাকা?

Advertisement

শরতের হালকা কুয়াশাচ্ছন্ন সাঁঝবেলায় কাঁচাবাজারের এক কোণে ভেজা কাঠের তক্তার ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন ফয়েজ সাহেব। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। পেশায় একজন সাধারণ বেসরকারি চাকরিজীবী। মাস শেষে পাওয়া সীমিত বেতন দিয়ে কষে কষে সংসার চালানোই তার জীবনসংগ্রামের নিত্যদিনের ব্যাকরণ। হাতে ঈষৎ পুরোনো, সুতো উঠে যাওয়া একটি বাজারের থলে। কিন্তু আজ তার হাঁটার গতিতে ছিল এক অদ্ভুত চঞ্চলতা, চোখে ছিল এক অব্যক্ত উচ্ছ্বাস। কারণ একটাই—তার আট বছরের ছেলে সাব্বির। 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিরাতে ভাতের টেবিলে মুখ ভার করে বসে থাকে ছেলেটি। পড়ার টেবিল থেকে শুরু করে ঘুমানোর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তার একটাই আবদার—‌বাবা, আমার ক্লাশের বন্ধু অনিকদের বাসায় নাকি বিশাল বড় রুপালি ইলিশ রান্না হয়েছে। মচমচে ভাজা ইলিশের গন্ধে নাকি ওদের পুরো গলি ভরে যায়! তুমি কবে একটা বড় ইলিশ কিনে আনবে? 

প্রাণাধিক প্রিয় পুঁচকে ছেলেটার এই ছোট্ট ইচ্ছাটা পূরণ করতে আজ বেতন পাওয়ার পরপরই বাজারের অন্য সব খরচে কাটছাঁট করে সরাসরি ইলিশের গলিতে হাজির হয়েছেন ফয়েজ সাহেব। বরফের সাদা বিছানায় শুয়ে থাকা রুপালি শস্যগুলোর গায়ে লালচে আলোর প্রতিফলন যেন তার মধ্যবিত্ত স্বপ্নগুলোকেই উসকে দিচ্ছিল। কাঙ্ক্ষিত একটি মাঝারি আকারের ইলিশ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বিনীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই, এটার দাম কত রাখবেন?

মাছ বিক্রেতা হাতের বঁটিটা একপাশে সরিয়ে মাছটি দাঁড়িপাল্লায় তুলে কর্কশ কণ্ঠে হাঁকলেন, এক কেজির চেয়ে সামান্য বেশি আছে। মাত্র দুই হাজার ৮০০ টাকা! নেবেন, নাকি বরফে ফেরত দেব?

‘দুই হাজার ৮০০ টাকা!’—শব্দ তিনটি ফয়েজ সাহেবের কানে যেন তীব্র বিস্ফোরণের মতো বাজল। তার হাতের মুঠোয় থাকা থলেটা যেন এক নিমিষে ভারি হয়ে গেল। যে টাকা দিয়ে তার চার সদস্যের পরিবারের পুরো এক মাসের চাল-ডাল আর দুই সপ্তাহের সবজি কেনা হয়ে যায়, সেই সমপরিমাণ অর্থ ঢেলে দিতে হবে মাত্র একটি মাছের পেটে?

বুকের ভেতরের অলক্ষিত কোনো এক গভীরে তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। পকেটের মানিব্যাগটা বাইরে থেকেই একবার স্পর্শ করলেন তিনি। সেখানে গোনা কয়েকটি হাজার টাকার নোট যেন মাসের বাকি দিনগুলোর নির্মম হিসাবই জানান দিচ্ছে। মাছ বিক্রেতার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর আশপাশের ক্রেতাদের ভিড়ের মাঝে এক তীব্র অপরাধবোধ, চরম অপমান আর সীমাহীন অসহায়ত্ব তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মুখে একরাশ গ্লানি নিয়ে কোনো কথা না বলে আস্তে আস্তে ভিড় ঠেলে এক পা-দুই পা করে পেছনে হেঁটে বেরিয়ে এলেন সেই মাছের গলি থেকে।

ঐ রাতে খাবার টেবিলে সাধারণ, কম দামি তেলাপিয়া মাছের পাতলা ঝোল আর ভাজি প্লেটে তুলে দিয়ে আট বছরের নিষ্পাপ ছেলেটার সামনে এক মহাকরুণ অভিনয়ে নামতে হলো এক পরাজিত পিতাকে। কৃত্রিম হাসির মুখোশ এঁটে অত্যন্ত স্নেহের সুরে বললেন, জানো সাব্বির, আজ বাজারে গিয়ে দেখি ইলিশ মাছগুলো একদম পচা! নদী দূষিত হয়ে গেছে তো। তাই আজকাল ইলিশে তীব্র গন্ধ আর ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকছে। খেলে পেটে ভীষণ অসুখ করবে। তার চেয়ে এই যে তাজা তেলাপিয়া এনেছি, এটা দারুণ সুস্বাদু! বড় হও, তখন তোমায় কত ইলিশ কিনে দেব!

ছোট্ট সাব্বির হয়তো বাবার বানিয়ে বলা সেই গল্পে সরল বিশ্বাসে মাথা নেড়ে তেলাপিয়াতেই কামড় বসাল। কিন্তু ফয়েজ সাহেবের গলার কাছে এক দলা কান্না আটকে রইল। ফয়েজ সাহেবের মতো কোটি বাবার এই নীরব কান্না, বানিয়ে বলা মিথ্যা আর সন্তানের সামনে করা অভিনয় আজ আর কোনো একক ব্যক্তির গল্প নয়—এটাই আধুনিক বাংলাদেশের কোটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এক নিদারুণ, নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

বাঙালির প্রাণের মাছ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক ইলিশ আজ সাধারণ মানুষের কাছে এক অলৌকিক স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যে মাছ একসময় দরিদ্রের পেটের ভাত জুগিয়েছে, তা আজ কেবলই ধনাঢ্য শ্রেণির বিলাসী ভোজের সামগ্রী। কিন্তু এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় ও রূপকথার মতো অবিশ্বাস্য অধ্যায়টি লুকিয়ে আছে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সীমান্ত বন্দরের চালানের নথিপত্রে।

যেখানে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এক কেজি ইলিশের জন্য আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা গুনতে গিয়ে দিশেহারা, ঠিক সেই মুহূর্তেই দেশের অন্যতম প্রধান বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিবেশী ভারত থেকে মাত্র দুই ডলারে—বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪৬ টাকা—কেজি দরে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি করছেন এ দেশেরই একদল মৎস্য ব্যবসায়ী।

সীমান্ত পেরিয়ে ২৫০ টাকারও কম দামে দেশে প্রবেশ করা এই ইলিশ ঢাকার কাঁচাবাজারে পৌঁছাতেই কোন জাদুমন্ত্রে ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা কেজিতে পরিণত হয়? পৃথিবীর কোন অর্থনীতি, কোন বাজারব্যবস্থা আর কোন নীতিশাস্ত্রের অধীনে এই আট থেকে ১০ গুণ মূল্যবৃদ্ধি বৈধতা পায়? এটি কি মুক্তবাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি, নাকি রাষ্ট্রের নীরব সম্মতিতে একশ্রেণির সুবিধাবাদী সিন্ডিকেটের অবাধ লুণ্ঠন?

মানুষের পকেট কেটে ব্যবসার নামে এই যে প্রকাশ্য ডাকাতি ও চরম অরাজকতা চলছে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় তা চরম অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য। 

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ইলিশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদপ্রাপ্ত এবং বিশ্বের বৃহত্তম ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ। পৃথিবীর প্রাকৃতিক জলাশয়ে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই একসময় বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে উৎপাদিত হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এমন এক চিত্র সামনে আসে, যা যে কোনো সচেতন নাগরিকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট।

বাংলাদেশ কাস্টমস, বেনাপোল স্থলবন্দর ও মৎস্য অধিদপ্তরের নথিপত্র অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অর্থবছরের কেবল প্রথম দুই মাসেই ১৯টি নিবন্ধিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারতের পেট্রাপোল সীমান্ত থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মেট্রিক টন বা সাড়ে তিন লাখ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। দেশীয় বাজারে মাছের মারাত্মক ঘাটতি এবং চড়া দামের সুযোগ নিয়ে আমদানিকারকরা বিপুল লাভের আশায় প্রতিবেশী দেশ থেকে মাছ আনার দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়েছেন।

কিন্তু প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ যে ইলিশের গ্লোবাল হাব, সেই দেশে কেন হঠাৎ ভারত থেকে ইলিশ আমদানির এত ধুম পড়ল?

এর নেপথ্যে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগর এবং বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদীগুলোতে ইলিশের মাইগ্রেটরি রুট বা প্রজনন ও চলাচলের স্বাভাবিক পথ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবিরাম নদীদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, নাব্যতা-সংকট, অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিং বা বালু উত্তোলন, কারেন্ট জাল ও নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালের অবাধ ব্যবহার এবং মা-ইলিশ ও জাটকা নিধনের ফলে দেশের প্রজননব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ফলে জলসীমায় পদ্মা-মেঘনার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু ইলিশের জোগান আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।

এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে প্রতিবেশী ভারতের গুজরাট রাজ্যের ভারুচ ও নর্মদা নদীর মোহনা অঞ্চলে। ভারত থেকে আসা তথ্যানুযায়ী, সেখানে এ বছর আবহাওয়া ও পরিবেশগত অনুকূল পরিস্থিতির কারণে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রদত্ত তথ্য মতে, গুজরাটের ভারুচ থেকে সংগ্রহ করা হাজার হাজার টন ইলিশ হাওড়ার কালীবাবুর বাজারসহ বড় বড় পাইকারি বাজার হয়ে ট্রাক ও ট্রেনে রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে করে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। গুজরাটের মাছ ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের মতে, সেখানে ইলিশের উৎপাদন এত বেশি যে তারা প্রতিদিন গড়ে আড়াইশো বাক্সের তিন-তিনটি বড় ট্রাক ভর্তি করে মাছ পাঠাচ্ছেন। এই মাছগুলো আকৃতিতে যেমন বড়, তেমনি সুস্বাদু ডিমের সমৃদ্ধিতে ভরপুর।

বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে পানির দরে—মাত্র দুই ডলারে বা প্রায় ২৪৬ টাকায় প্রতি কেজি—ইলিশ কিনে আনছেন। কাস্টমস ডিউটি বা শুল্ক, পরিবহণ খরচ এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয় যোগ করলেও এই মাছের আমদানি খরচ কোনোভাবেই কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকার বেশি পড়ার কথা নয়।

কিন্তু যখনই এই মাছ ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী বা নিউমার্কেটের মতো খুচরা বাজারে এসে পৌঁছায়, তখনই দামের ওপর ভর করে যেন এক অদৃশ্য মহাকাশযান! যে মাছ কাস্টমস পার হলো ২৪৬ টাকায়, তা খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে সাধারণ ভোক্তার থলেতে নামার সময় হয়ে যায় ১৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা! 

বাঙালির করের টাকায় গড়ে ওঠা সরকারি আমলাতন্ত্র ও গবেষণা সংস্থাগুলো যখন বছরের পর বছর ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির গল্প শোনায়, তখন বাস্তবতার এই করুণ চিত্র পুরো ব্যবস্থাকে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

মৎস্য দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশের মোট উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে। আর পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই উৎপাদন আরও হ্রাস পেয়ে পৌঁছায় মাত্র পাঁচ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টনে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ের অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক তথ্যও সংকেত দিচ্ছে যে, চলতি প্রাক্কলনে ইলিশের উৎপাদন পাঁচ লাখ মেট্রিক টনেরও নিচে নেমে গেছে।

অথচ এই উৎপাদন বৃদ্ধি, জাটকা রক্ষা এবং প্রজননক্ষেত্রের অভয়াশ্রম গড়ে তোলার নামে বিগত সরকার ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি প্রায় ৪০০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলো, কায়িক শ্রমে নিয়োজিত জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের নামে কার্ড বিতরণ ও প্রণোদনা দেওয়া হলো—কিন্তু ফল দাঁড়াল শূন্য।

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া তো দূরের কথা, উৎপাদনের গ্রাফ ধারাবাহিকভাবে নিচের দিকে নামতে নামতে আজ এ দেশকে ভারতের আমদানিকৃত মাছের ওপর নির্ভরশীল করে তুলল। খোদ মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক এই বিশাল অর্থের অপচয় ও প্রকল্পের ব্যর্থতা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে স্বীকার করেছেন যে, বিগত সময়ে নেওয়া ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প কতটুকু বাস্তবমুখী ছিল কিংবা এতে কোনো প্রশাসনিক গাফিলতি ও চরম দুর্নীতি জড়িত ছিল কিনা, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।

যখন ৪০০ কোটি টাকা খরচের পর একটি দেশের জাতীয় মাছের উৎপাদন তলানিতে গিয়ে ঠেকে, তখন বুঝতে হবে, সে উন্নয়ন প্রকল্প ছিল কেবলই কিছু আমলা ও কর্মকর্তার পকেট ভরার হরিলুট উৎসব।

অপরদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ তার ঐতিহাসিক রপ্তানি বজায় রাখতেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। গত অর্থবছরে যেখানে সরকারের পক্ষ থেকে ১,২০০ টন ইলিশ রপ্তানির প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে প্রকৃত রপ্তানি হয়েছে ১১০ টনেরও কম! বিশ্ববাজারে দেশের এই ব্যর্থতা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ভারতের কম দামি মাছের অরাজকতা প্রমাণ করে যে, দেশের মৎস্য খাত পরিচালনা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র একপ্রকার পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছে।

আজকের বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যাধি ও অভিশাপের নাম হলো আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট। চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, বরিশাল কিংবা ঢাকার পাইকারি আড়তগুলোতে বসে থাকা গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পুরো দেশের খাদ্যপণ্য ও প্রোটিনের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।

আমদানিকৃত ভারতের ২৫০ টাকার ইলিশের ক্ষেত্রে যে বিশাল মূল্যের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, তার মূল চালিকাশক্তি হলো এই অসাধু সিন্ডিকেটের অতিলোভ। তারা খুব ভালো করেই জানে যে, ইলিশ মাছের প্রতি বাঙালির এক গভীর আত্মিক ও মানসিক দুর্বলতা রয়েছে। উৎসব-পার্বণ কিংবা পারিবারিক কোনো বিশেষ আয়োজনে বাঙালি ইলিশ না হলেই নয়—মানুষের এই আবেগকেই জিম্মি করেছে বাজার-মাফিয়ারা।

ভারতের সীমান্ত থেকে অতি অল্প মূল্যে কেনা ইলিশ যখন দেশে প্রবেশ করে, তখন পাইকারি আড়তেই তার দাম কৃত্রিমভাবে চার থেকে পাঁচগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কোল্ড স্টোরেজে মাছ মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, হাতবদলের ধাপে ধাপে কাল্পনিক পরিবহণ ও ঘাটের খরচের অজুহাত দেখানো এবং সর্বশেষে খুচরা বাজারে এক অবিশ্বাস্য মূল্যে তা বিক্রি করা—এ যেন এক পরিকল্পিত চক্র।

একদিকে আমাদের দেশীয় জেলেরা জীবন বাজি রেখে উত্তাল সাগরে গিয়ে মাছ ধরেও দেনার দায়ে জর্জরিত হচ্ছেন, মহাজনের সুদের জালে পিষ্ট হচ্ছেন; অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তা তার শেষ সঞ্চয়টুকু সম্বল করেও সন্তানের পাতে এক টুকরো ইলিশ তুলে দিতে পারছেন না। মাঝখান থেকে সমস্ত রক্ত চুষে ফায়দা লুটছে ওই মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট।

আন্তর্জাতিক বাজারে বা অন্য যে কোনো সভ্য দেশে যদি কোনো পণ্য কম দামে আমদানি করা হয়, তবে তার সরাসরি সুবিধা পান সেই দেশের সাধারণ নাগরিকেরা। বাজার প্রতিযোগিতার সাধারণ নিয়মেই পণ্যের দাম কমে আসে। কিন্তু বাংলাদেশে আমদানিকৃত ২৪৬ টাকার ইলিশ বাজারকে শান্ত করার বদলে উলটো সিন্ডিকেটের পকেট ভারি করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই চরম অরাজকতা ও লুণ্ঠন কোনোভাবেই মুক্তবাজার অর্থনীতির অংশ হতে পারে না; এটি হলো স্রেফ একপ্রকার অর্থনৈতিক সন্ত্রাস।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো জনগণের কল্যাণ সাধন করা এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোকে সহজলভ্য করা। কোনো সরকারই বাজারে চলা এমন বেপরোয়া মাফিয়াতন্ত্রকে চোখ বন্ধ করে সহ্য করতে পারে না। মানুষের পকেট কেটে ব্যবসার নামে অন্যায্য লাভ করা বন্ধ করা এখন কেবল কোনো অর্থনৈতিক দাবি নয়, এটি সামাজিক সুবিচারের মৌলিক প্রশ্ন।

এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকে অবিলম্বে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে কাজ করে ভারত থেকে কত মূল্যে এলসি খুলে মাছ আনা হচ্ছে, তা কাস্টমস থেকে সরাসরি ট্র্যাক করতে হবে এবং খুচরা বাজারে সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য বেঁধে দিতে হবে। ২৫০ টাকার ইলিশ শুল্কসহ কোনোভাবেই খুচরা বাজারে ৫০০ টাকার বেশি হতে দেওয়া যাবে না।

একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পাইকারি আড়তগুলোতে প্রতিদিন বিশেষ টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্টের অভিযান পরিচালনা করতে হবে। সেখানে আড়তদারদের ক্রয়-বিক্রয়ের মেমো প্রদর্শন বাধ্যতামূলক থাকবে এবং অবৈধ মজুতদারদের তাৎক্ষণিক শাস্তির আওতায় আনা হবে।

সাময়িক আমদানির ওপর দীর্ঘমেয়াদে নির্ভর না করে নদীদূষণ বন্ধ করা, পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং প্রজনন মৌসুমে মা-ইলিশ ও জাটকা নিধন পুরোপুরি বন্ধে কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশকে কঠোর হতে হবে। কাগজ-কলমে প্রজনন সুরক্ষার নামে বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায় যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে চারশ কোটি টাকার প্রকল্পের নিরপেক্ষ অডিট করা অত্যন্ত জরুরি।

উপরন্তু, মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের যে ভিজিএফ চাল ও সহায়তা দেওয়া হয়, তা যেন অজেলে বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাতে না গিয়ে প্রকৃত জেলেদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। যেন জেলেরা বাধ্য হয়ে নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে জাল না ফেলেন।

ইলিশ স্রেফ এক প্রজাতির মৎস্য নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, হাজার বছরের সংস্কৃতি এবং বঙ্গীয় নদীমাতৃক সভ্যতার এক রূপালি প্রতীক। পদ্মার ঢেউয়ে ইলিশের রূপালি ঝিলিক কিংবা সর্ষে ইলিশের সুবাস বাঙালির ইতিহাস ও কাব্যের সঙ্গে মিশে আছে।

কিন্তু আজ সেই ইলিশ যখন ২৫০ টাকা থেকে রূপ বদলে আড়াই-তিন হাজার টাকায় গিয়ে থামে, যখন ফয়েজ সাহেবের মতো মধ্যবিত্ত পিতাকে বাজার থেকে শূন্য হাতে ফিরে এসে সন্তানের কাছে মিথ্যা অভিনয় করতে হয়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক সংকট থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি সমাজের নৈতিক ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রতিচ্ছবি।

ব্যবসায়ের নামে এই যে জঘন্য জুলুম ও পকেট কাটার মহোৎসব চলছে, তা দ্রুত বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। যে গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আজ দেশের মানুষ দেখছে, সেই বাংলাদেশে এমন অন্যায্য সিন্ডিকেট ও মাফিয়াতন্ত্রের কোনো স্থান থাকতে পারে না।

পরিশেষে বলতে চাই, ভারতের কম দামি ইলিশের বাজার সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নদীতে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র পুনরুদ্ধার করা সরকারের জন্য এখন সময়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। রূপালি শস্য যেন আবার সাধারণ মানুষের থালায় ফিরে আসে, পিতার ভুয়া হাসির পেছনে যেন আর কোনো শিশুর অমলিন স্বপ্ন ভেস্তে না যায়—রাষ্ট্রকে আজ সেই দায়ভার কাঁধে নিতেই হবে। না হলে ইতিহাস আমাদের কাউকে ক্ষমা করবে না। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের হেদায়েত ও সহীহ বুঝ নসিব করুন। 

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

ই-মেইল: [email protected]

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

মুকেশ আম্বানির ছেলেকে অধ্যাপক নিয়োগ,সমালোচনায় নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়

মুকেশ আম্বানির ছেলেকে অধ্যাপক নিয়োগ,সমালোচনায় নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়

বেলুচিস্তানে সেনা অভিযানে ভারতীয় মদতপুষ্ট ৭১ জন নিহত

বেলুচিস্তানে সেনা অভিযানে ভারতীয় মদতপুষ্ট ৭১ জন নিহত

লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে ওয়াংচুকের আলটিমেটাম

লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে ওয়াংচুকের আলটিমেটাম

ভারতের হাসপাতালে বাংলাদেশির লাশ ৮ দিন আটকে রাখার অভিযোগ

ভারতের হাসপাতালে বাংলাদেশির লাশ ৮ দিন আটকে রাখার অভিযোগ

প্রতিবেশী কোনো দেশের জমি দখল করতে চায় না ভারত: রাজনাথ সিং

প্রতিবেশী কোনো দেশের জমি দখল করতে চায় না ভারত: রাজনাথ সিং

‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে মা’ বলে রাতে ফোন, ভোরেই তরুণীর লাশ উদ্ধার

‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে মা’ বলে রাতে ফোন, ভোরেই তরুণীর লাশ উদ্ধার

আরও পড়ুন

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন ও Culinary Tourism-এর প্রভাব!

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন ও Culinary Tourism-এর প্রভাব!

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়?

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর জীবনের হিসাব কোথায়?

একটি বিরলপ্রজ ভাষণে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

একটি বিরলপ্রজ ভাষণে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

বিলুপ্তির পথে উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবসায় শিক্ষা শাখা

বিলুপ্তির পথে উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবসায় শিক্ষা শাখা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম