Logo
Logo
×
   

Advertisement

ভারত

কেন রাস্তায় নামছে না ভারতের জেন-জি?

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৫, ০৫:৫৬ পিএম

কেন রাস্তায় নামছে না ভারতের জেন-জি?

২০২৪ সালে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আসামের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ছবি: বিবিসি

Advertisement

ভারতের তরুণ প্রজন্ম অর্থাৎ জেনারেশন জেড (জেন-জি) বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ জনগোষ্ঠীর অন্যতম। দেশটির ৩৭ কোটিরও বেশি মানুষ এখন ২৫ বছরের নিচে, যা ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে তারা আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় বেশি সচেতন, সংযুক্ত এবং রাজনৈতিকভাবে অবহিত। তারা জানে দেশে কীভাবে দুর্নীতি চলছে, বৈষম্য কীভাবে বাড়ছে এবং রাজনীতির খেলা কোথায় গড়াচ্ছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই বিশাল, তেজি, সচেতন তরুণ সমাজ কেন রাজপথে নেই?

ভয়ের দেয়াল

তরুণদের সবচেয়ে বড় কারণ, ভয়। ভারতে রাজপথে নামা মানেই ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা জুটে যায়। ২৩ বছরের শিক্ষার্থী ধৈর্য চৌধুরী বলেন, এখনকার প্রজন্ম জানে কী হচ্ছে, কিন্তু প্রতিবাদের চিন্তা করলেই ভয় কাজ করে। কারণ, যেকোনো মতভেদকেই এখন দেশবিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়। মিডিয়া ও রাজনীতিবিদদের একাংশ এই লেবেলটিকে ব্যবহার করছে ভিন্নমত দমন করতে।

একসময় যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল রাজনৈতিক বিতর্ক ও আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র—যেমন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ), জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়—সেগুলোতেও এখন প্রতিবাদ নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। 

২৩ বছর বয়সি গবেষক হাজারা নাজিব বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। এখন সেই স্পিরিট হারিয়ে গেছে।’

ভারতের জেন-জি আজ হয়তো নীরব, কিন্তু উদাসীন নয়। তারা দেখছে, শিখছে, প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সমাজতত্ত্ববিদ দীপঙ্কর গুপ্ত

বিভক্ত তরুণ প্রজন্ম

ভারতের তরুণদের ক্ষোভ একমুখী নয় বরং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা ইস্যুতে। কারও দাবি চাকরির সুযোগ, কারো লড়াই জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে, আবার কেউ লড়ছে ভাষা ও আঞ্চলিক অধিকারের জন্য। ফলে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় আন্দোলন গড়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

‘ভারতে ক্ষমতা যেমন বিকেন্দ্রীভূত, তরুণদের ক্ষোভও তাই’— বলেন বিহারের তরুণ সাংবাদিক বিপুল কুমার। ‘আমাদের মধ্যে কেউ কেন্দ্রীয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়, আবার কেউ শুধু সরকারি চাকরি চায়। তাই এক মঞ্চে সবাইকে পাওয়া যায় না।’

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় গাজার প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ। ছবি: বিবিসি

‘সেন্টার ফর ইয়ুথ পলিসি’র পরিচালক সুধাংশু কৌশিক মনে করেন, ভারতের জেনজি কখনোই নেপাল বা বাংলাদেশের মতো রাস্তায় নামবে না। কারণ এখানে তরুণ সমাজ অঞ্চল, ভাষা ও জাতি—সব দিক থেকেই বিভক্ত। ‘ভারতে যদি তরুণ বিদ্রোহ হয়ও, সেটা কি হবে দলিত জেন-জির, না শহুরে তরুণদের, না তামিল ভাষাভাষীদের?’—প্রশ্ন তোলেন কৌশিক।

প্রতিবেশীদের উদাহরণ

ভারতের এই নীরব তরুণ প্রজন্মের বিপরীতে, এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশেই জেন-জি এখন রাজনীতির কেন্দ্রে। নেপালে গত মাসেই তরুণদের আন্দোলনে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সরকার পতন হয়। মাদাগাস্কারে তরুণদের নেতৃত্বে ক্ষমতা পরিবর্তন ঘটে। ইন্দোনেশিয়ায় চাকরির সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে তরুণদের বিক্ষোভে সরকার বাধ্য হয় ছাড় দিতে। বাংলাদেশেও ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে সরকার পরিবর্তন ঘটে।

এই আন্দোলনগুলো ছিল দ্রুত, বিকেন্দ্রীভূত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত ও অত্যন্ত কার্যকর। অথচ ভারতে সেই আগুনের স্ফুলিঙ্গও দেখা যায় খুব কম।

নেপালে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার জেন-জি আন্দোলনে সরকারের পতন ঘটেছে। ছবি: বিবিসি 

ভারতেও ক্ষোভের ঝলক

যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতেও ক্ষোভের ঝলক দেখা গেছে। লাদাখে রাজ্য মর্যাদার দাবিতে বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়, যা অনেকে ‘জেন-জির দমিত ক্রোধের বিস্ফোরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও বলেছেন, জেন-জি প্রজন্মই সংবিধান রক্ষা করবে এবং ভোট জালিয়াতি ঠেকাবে।

তবে এসব বিক্ষোভ কখনো দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়নি। কারণ, ভারতে তরুণদের ক্ষোভ স্থানিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ। গুজরাট ও হরিয়ানায় উচ্চবর্ণের তরুণেরা চাকরিতে সংরক্ষণের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে, আবার তামিলনাড়ুতে তরুণেরা প্রতিবাদ করেছে ঐতিহ্যবাহী ‘জল্লিকাট্টু’ খেলা নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে।

আমাদের মধ্যে কেউ কেন্দ্রীয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়, আবার কেউ শুধু সরকারি চাকরি চায়। তাই এক মঞ্চে সবাইকে পাওয়া যায় না।

বিপুল কুমার, বিহারের সাংবাদিক

পূর্বের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতা

ভারতের তরুণদের রাজনীতি নতুন নয়। আশির দশকে ইন্দিরা গান্ধীবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০১০ সালের আনা হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০১২ সালের দিল্লি গণধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ—সব জায়গায় তরুণরাই ছিল অগ্রভাগে। 

২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনও মূলত জেন-জির নেতৃত্বে হয়েছিল। কিন্তু এর পরিণাম ছিল ভয়াবহ—পুলিশি দমন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান, এমনকি ছাত্রনেতা উমর খালিদের মতো ব্যক্তির গ্রেফতার, যিনি এখনও কারাগারে।

এসব ঘটনার পর প্রতিবাদের সংস্কৃতিই যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার তরুণ কর্মকর্তা জতিন ঝা বলেন, সরকার প্রতিবাদকে এমনভাবে ‘অপরাধ’ বানিয়ে ফেলেছে যে, এখন কেউ ভাবতেই পারে না রাস্তায় নামবে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নীরবতা

ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও তরুণদের বেকারত্ব ভয়াবহ। অনেকেই ভালো সুযোগের খোঁজে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। মাত্র ৩৮ শতাংশ ১৮ বছর বয়সি তরুণ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলছে।

তবুও ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রতি তরুণদের একটি বড় অংশের সমর্থন অটুট—২০১৯ সালের নির্বাচনে ৪০ শতাংশ তরুণ তাদের ভোট দিয়েছিল, ২০২৪-এও সেই হার খুব একটা কমেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় আজ তরুণদের রাজনৈতিক অবস্থানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

এক নীরব প্রজন্ম

সমাজতত্ত্ববিদ দীপঙ্কর গুপ্তর ভাষায়, ‘তরুণ শক্তি ক্ষণস্থায়ী। প্রতিটি প্রজন্ম নিজস্ব ইস্যু নিয়ে ওঠে, পুরোনো আন্দোলনের উত্তরাধিকার নেয় না।’ তাই ভারতের জেন-জি আজ হয়তো নীরব, কিন্তু উদাসীন নয়। তারা দেখছে, শিখছে, প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই প্রজন্মের প্রতিবাদ এখন হয়তো রাস্তায় নয় বরং অনলাইনে, আলোচনায়, কিংবা ভোটের বাক্সে। তবে তাদের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট—একটি ন্যায্য, দুর্নীতিমুক্ত, সমতার ভারত।

তারা হয়তো এখনো রাস্তায় নামেনি, কিন্তু তাদের নীরবতা কোনো আত্মসমর্পণ নয়—এ এক অপেক্ষা, যথাযথ সময়ের অপেক্ষা।

সূত্র: বিবিসি

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম