১৯ বছর ধরে ইসরাইলে বন্দি কে এই ‘দ্বিতীয় ইয়াহিয়া সিনওয়ার’?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫, ০১:১০ পিএম
ইসরাইলের কাছে ‘দ্বিতীয় ইয়াহিয়া সিনওয়ার’ খ্যাত ইব্রাহিম হামেদ।ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবের ভিত্তিতে অবশেষে গাজা উপত্যকায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা গণহত্যা-আগ্রাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে দখলদার ইসরাইলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় হামাস একটি সমঝোতা বা চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছে।
শুক্রবার ভোররাতে এ ঘোষণা দিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সংগঠনটি বলেছে, এই সমঝোতা বা চুক্তিতে ‘গাজা যুদ্ধের অবসান, সেখান থেকে দখলদারিত্ব (ও দখলদার সেনা) প্রত্যাহার এবং সাহায্য প্রবেশের’ পাশাপাশি গাজায় অবশিষ্ট ইসরাইলি বন্দিদের সঙ্গে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে।
হামাস উল্লেখ করেছে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে প্রস্তাবটি সম্পর্কে বিভিন্ন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীর সঙ্গে ‘দায়িত্বপূর্ণ এবং গুরুতর’ আলোচনা করেছে।
এদিকে আরব ও ইসরাইলি গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বন্দি বিনিময় আলোচনায় ইব্রাহিম হামেদের নাম আবারও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি একজন হামাস কমান্ডার, যাকে ইসরাইলি গোয়েন্দা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা (শাবাক) ‘ইয়াহিয়া সিনওয়ারেরও উপরের লোক’ বা ‘দ্বিতীয় ইয়াহিয়া সিনওয়ার’ বলে মনে করে। যিনি দীর্ঘ ৫৪ বছরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ভোগ করছেন এবং শাসকগোষ্ঠীর কারাগারে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছেন।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানিয়েছে, হামাস মিশরের শারম আল-শেখ আলোচনার সময় পশ্চিম তীরে আন্দোলনের সামরিক শাখার প্রাক্তন কমান্ডার ইব্রাহিম হামেদের মুক্তি দাবি করেছিল। এ সময় ইসরাইলি নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, হামেদের ‘ইয়াহিয়া সিনওয়ারের সমান এবং তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা’ রয়েছে।
ইব্রাহিম হামেদ দ্বিতীয় ইন্তিফাদা, যা ছিল ২০০০ সালে শুরু হওয়া ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিদের একটি বড় বিদ্রোহ, যা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরাইলে সংঘটিত হয়। এর তীব্র সহিংসতার সময়কাল ২০০৫ সালের শারম আল-শেখ শীর্ষ সম্মেলন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এরপর থেকে এর তীব্রতা কমে আসে। তিনি ওই সময়ে হামাসের শহীদ অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত এবং বছরের পর বছর ধরে শাবাক তাকে অনুসরণ করতে থাকে। অবশেষে ২০০৬ সালে ইসরাইলি বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং ২০১২ সালে তাকে ৫৪ বছরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
হিব্রু ভাষার এই সংবাদমাধ্যমটি বলছে, হামাসের সঙ্গে আলোচনার সময় মারওয়ান আল-বারগুথি এবং আহমেদ সাদাতসহ ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মুক্তির বিরোধিতা করে আসছে ইসরাইল এবং ইব্রাহিম হামেদসহ অন্যান্য বিশিষ্ট বন্দিদের মুক্তিতে সম্মত হয়েছে কিনা- তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বন্দি বিনিময় চুক্তির আলোচনার কাঠামোর মধ্যে এই অনুরোধ করা হয়েছিল, যা হামাস আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আংশিকভাবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
১৯৬৫ সালে পশ্চিম তীরের রামাল্লাহর পূর্বে সিলওয়াদ শহরে জন্মগ্রহণকারী ইব্রাহিম হামেদ পশ্চিম তীরে হামাসের অন্যতম বিশিষ্ট সামরিক কমান্ডার।
তিনি বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন এবং ১৯৯০ সাল থেকে হামাসের সামরিক কাঠামোতে সক্রিয়ভাবে জড়িত। ১৯৯৮ সালে দুই জ্যেষ্ঠ হামাস কমান্ডার ইমাদ ও আদেল আওয়াদাল্লাহ শহীদ হওয়ার পর ইব্রাহিম হামেদ পশ্চিম তীরে হামাসের সামরিক শাখার নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন।
শিন বেত তাকে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় কয়েক ডজন সামরিক ও আত্মঘাতী অভিযানের প্রধান পরিকল্পনাকারী বলে মনে করে; যার মধ্যে রয়েছে গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরণ, সামরিক স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ এবং শহীদ অভিযান।
ইসরাইলি সূত্র অনুসারে- ওই সময় কয়েক ডজন সৈন্য এবং বসতি স্থাপনকারীদের হত্যা করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর থেকে হামেদকে ইসরাইলি কারাগারের নির্জন কক্ষে রাখা হয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাকে।
তবুও ইসরাইলি মিডিয়া অনুসারে, জিজ্ঞাসাবাদের কোনো পদ্ধতিই তাকে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করতে পারেনি। শিন বেত তাকে ‘অটুট পাথর’ হিসাবে বর্ণনা করেছে এবং স্বীকার করেছে যে, হামেদের চেয়ে কোনো বন্দির বিরুদ্ধে তারা কখনো এতোটা অসহায় ছিল না।
ইব্রাহিম হামেদকে কখনোই তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।উলটো তিনি কারাগারের কঠোর অবস্থার কারণে গুরুতর শারীরিক আঘাত পেয়েছেন, যার মধ্যে একটি হলো- ছিঁড়ে যাওয়া ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট এবং অন্যটি হার্নিয়েটেড ডিস্কও রয়েছে।
অন্যদিকে তার স্ত্রীকে মুক্তি দেওয়া হলেও তাকে ও তার সন্তানদেরও জর্ডানে নির্বাসিত করা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দি বিনিময় আলোচনায় হামাস ইব্রাহিম হামেদের নাম বারবার উল্লেখ করলেও ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীকী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে তিনি এখনো রয়ে গেছেন।
সর্বশেষ গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুসারে, প্রথম পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার ৭২ ঘণ্টা পর হামাস এক সঙ্গে ২০ জন জীবিত ইসরাইলি বন্দিকে হস্তান্তর করবে এবং ইসরাইল ২০০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যার মধ্যে ২৫০ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন এবং ১,৭০০ জন গত দুই বছর ধরে আটক রয়েছেন।




