‘ইয়ারসাগুম্বা’ বা ‘হিমালয়ান ভায়াগ্রা’ কেন সবচেয়ে দামি ছত্রাক?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫, ০১:৫৫ পিএম
হিমালয়ান ভায়াগ্রা নামে পরিচিত ইয়ারসাগুম্বা বা ক্যাটারপিলার ছত্রাক। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হিট টিভি সিরিজ দ্য লাস্ট অব আস-এ কর্ডিসেপস মানুষকে রূপান্তরিত করে ভয়ঙ্কর প্রাণীতে। কিন্তু বাস্তবে এই লঙ্কা-আকৃতির ছত্রাক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিচিত শক্তিবর্ধক, ফুসফুস ও কিডনি শক্তিশালী করার টনিক এবং কর্মোদ্দীপক হিসাবে। হিমালয়ের বিভিন্ন উচ্চভূমিতে পাওয়া কর্ডিসেপস সিনেনসিস তাই পেয়েছে ‘হিমালয়ান ভায়াগ্রা’ খ্যাতি—যার মূল্য সোনার চেয়েও চার গুণ বেশি।
আধুনিক যুগে নবজাগরণ
তিব্বত, নেপাল, ভুটান ও ভারতের দুর্গম অরণ্য ও তুন্দ্রার মতো এলাকায় এই ছত্রাক পরিচিত ‘ক্যাটারপিলার ফাঙ্গাস’ বা ‘ইয়ারসাগুম্বা’ নামে, যার অর্থ ‘গ্রীষ্মে ঘাস, শীতে কীট’। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় এটি শরীরের সক্ষমতা বাড়ায় বলে বিশ্বাস করা হয়। ১৯৯৩ সালে চীনের এক অ্যাথলেটিক কোচ তার দলের বিশ্বরেকর্ডগড়া পারফরম্যান্সের কৃতিত্ব দেন কর্ডিসেপস-সমৃদ্ধ এক টনিককে—যা ছত্রাকটির আধুনিক জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
২০০১ সালে নেপালে ব্যবসা বৈধ হওয়ার পর থেকে কর্ডিসেপস চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে অভিজাত উপহার হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুপারশপ থেকে অনলাইন মার্কেট—সবখানেই দেখা যায় ‘সিন্থেটিক’ কর্ডিসেপসযুক্ত সাপ্লিমেন্ট। ২০১৩ সালের এক গবেষণা জানায়, বিশ্ববাজারে এই ছত্রাকের মূল্য বছরে ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে দামী পরজীবী প্রাণী হিসেবে পরিচিত এই ছত্রাক দরিদ্র হিমালয় অঞ্চলের মানুষের অন্যতম আয়সূত্র। কিন্তু এর বাণিজ্য ও আহরণ প্রায়ই অবৈধ, অপ্রতুলভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং অসংগতিপূর্ণ। ২০২0 সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) প্রজাতিটিকে ‘বিপন্ন’ ঘোষণা করে জানায়—১৫ বছরে এর পরিমাণ কমেছে কমপক্ষে ৩০%।
বিপজ্জনক শিকার, ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ
মূল্য ও দুর্লভতার কারণে পশ্চিমা বিশ্বে এ নিয়ে গবেষণা কম হলেও চীন, নেপাল ও ভারতের গবেষকেরা সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতার কথা জানিয়েছেন—লিভার, কিডনি, হৃদ্রোগ, প্রদাহরোধী ও ভাইরাস প্রতিরোধী সম্ভাবনা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ও ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ হিসেবে এর সম্ভাবনা যাচাই করছে।
কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধির ফলে হিমালয়জুড়ে দেখা দিচ্ছে তীব্র পরিবেশগত সংকট। অঞ্চলটি ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। তার ওপর ছত্রাক সংগ্রহের জন্য খনন কাজ মাটিক্ষয় বাড়াচ্ছে, দূষণ ছড়াচ্ছে নদীতে এবং বন উজাড়ের পথ খুলে দিচ্ছে।
দুর্যোগপ্রবণ মালভূমি, হঠাৎ বন্যা, তুষারধসে প্রতি বছর বহু মানুষের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে কর্ডিসেপসের খোঁজে যত মানুষ মারা গেছে—এভারেস্ট শীর্ষ জয়ের চেষ্টায় তার চেয়েও বেশি।
এছাড়া ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহে শিশু শ্রম একটি বড় সমস্যা। উচ্চমূল্যের আশা পাচারচক্র, চোরাচালান ও সংঘাতকেও উসকে দিচ্ছে।
নেপালের সংসদ সদস্য রাজেন্দ্র বজগইন বলেন, মানুষ এটি নিয়ে লড়াই করছে—কিন্তু আমরা নিশ্চিতও নই এটা আদৌ কাজ করে কিনা। ইয়ার্তসার ব্যবসায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। সীমান্তও সুরক্ষিত করতে হবে। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হলো—চীনের কত মানুষ আসছে এটি কিনে পাচার করতে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
হিমালয়জুড়ে জীবিকা, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে এই ‘হিমালয়ান ভায়াগ্রা’র অবারিত বাণিজ্য—যার ভবিষ্যৎ এখন ঝুঁকির মুখে।

