Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

মিডল ইস্ট মনিটরের বিশ্লেষণ

ইমরান খান পাকিস্তানের বংশীয় রাজনীতি ও সেনাকর্তৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম

ইমরান খান পাকিস্তানের বংশীয় রাজনীতি ও সেনাকর্তৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

ইমরান খান পাকিস্তানের ক্ষমতাকাঠামোর জন্য জটিল এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছেন—তার অস্তিত্বই এই ব্যবস্থাকে বিব্রত করে, অন্যদিকে কারাগারে তার মৃত্যু হয়ে উঠতে পারে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক বড় অভিযোগ।

ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সামরিক ছায়ার নিচে থাকা দুই বংশীয় রাজনৈতিক পরিবার—শরিফ ও ভুট্টো-জারদারিদের জন্য এটাই এখন সবচেয়ে বড় সংকট।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ৭৩ বছর বয়সি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। তার নিজস্ব চিকিৎসককে মেডিকেল বোর্ডে রাখার পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগও পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থায় এগুলোকে ‘সুবিধা’ বলা হতো না; এগুলো সাধারণ নাগরিক অধিকার হিসেবেই বিবেচিত হতো।

কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনরা দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক অধিকারকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে যে একজন বন্দির চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার অধিকারও এখন সাংবিধানিক বড় অর্জন হিসেবে হাজির হচ্ছে।

সরকার আদালতের রায়ের একটি অংশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানানোয় পরিস্থিতির বিদ্রূপ আরও স্পষ্ট হয়েছে। যেন নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রকৌশল, গণহারে মামলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকৃতি সহ্য করা যায়; কিন্তু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোই এখন সাংবিধানিক সীমারেখা টেনে দিচ্ছে।

এর আড়ালে অবশ্য হাস্যকর পরিস্থিতির চেয়েও বড় বিষয় হলো—আতঙ্ক।

ইমরান খানকে কারাগারে রাখার উদ্দেশ্য ছিল তাকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। সমাবেশ, টেলিভিশন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা, একের পর এক মামলা দেওয়া, তার দলকে ক্লান্ত করে তোলা এবং বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে এমন ফল অর্জন করা, যা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সম্ভব হয়নি।

কিন্তু রাষ্ট্রের পরিকল্পনা উলটো ফল দিয়েছে। মানুষটিকে কারাগারে পাঠিয়ে তারা তার প্রতীকী শক্তিকেই আরও বড় করেছে।

প্রতিটি সাক্ষাৎ প্রত্যাখ্যানের ঘটনা প্রমাণে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিতর্ক অভিযোগে রূপ নিয়েছে। তাকে যত বেশি আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে তিনি তত বেশি দৃশ্যমান হয়েছেন। কারাগারের কক্ষ যেন পরিণত হয়েছে এক ধরনের সম্প্রচারকেন্দ্রে।

এটাই আসিম মুনিরের সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুঃস্বপ্ন।

সুস্থ একজন বন্দিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু দৃশ্যত অসুস্থ হয়ে পড়া একজন বন্দি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতীকে পরিণত হতে পারেন। আর কোনো বন্দির মৃত্যু তো তাকে ইতিহাসে পরিণত করে। ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করা সংসদের চেয়েও কঠিন।

বিদেশে ট্রাম্পের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে প্রশংসিত হতে পারেন মুনির। প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ছবি তুলতে পারেন, কূটনৈতিক বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারেন এবং পারমাণবিক শক্তিধর একটি জটিল রাষ্ট্রের অপরিহার্য ব্যবস্থাপক হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। কিন্তু বিদেশের এই জাঁকজমক দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকেই আরও স্পষ্ট করে।

একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখতে হয়—এটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ নয়; বরং ভয় পাওয়ার স্বীকারোক্তি।

পদক যত বড় হচ্ছে, রাজনৈতিক কল্পনার পরিসর যেন ততই ছোট হয়ে আসছে।

ইমরান খানকে মুক্তি দিলে তিনি যে রাজনীতিক হিসেবে কারাগারে গিয়েছিলেন, ঠিক সেই মানুষ হিসেবে ফিরবেন না। বরং কারাগার তাকে আরও বয়স্ক, আহত, কিংবদন্তিতুল্য এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক যুক্তি নিয়ে ফিরিয়ে দিতে পারে—রাষ্ট্রের পুরো দমনমূলক কাঠামোকে একজন মানুষকে ভোটারদের কাছ থেকে দূরে রাখার জন্য ব্যবহার করতে হয়েছে।

অন্যদিকে, তার শারীরিক অবস্থার অবনতি সত্ত্বেও তাকে কারাগারে রাখা হলে প্রতিটি আইনি জটিলতা ধীরে ধীরে একটি সহজ প্রশ্নে পরিণত হবে—কোন ধরনের শাসনব্যবস্থা একজন রাজনীতিককে এতটা ভয় পায় যে তার চিকিৎসক, পরিবারের সাক্ষাৎ এবং ফোনে কথা বলার অধিকারও নিয়ন্ত্রণের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়?

আর যদি কারাগারেই ইমরান খানের মৃত্যু হয়, তখন বিষয়টি আর শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা পরিণত হতে পারে রাজনৈতিক বিস্ফোরণে।

জীবিত একজন রাজনীতিককে সমালোচনা করা যায়, বিদ্রূপ করা যায়, দায়ী করা যায় কিংবা নির্বাচনে পরাজিত করা যায়। কিন্তু মৃত রাজনৈতিক বন্দিকে ঘিরে স্মৃতি অনেক বেশি সরল হয়ে যায়। নথি হারিয়ে যেতে পারে, অভিযোগের গুরুত্ব মুছে যেতে পারে, আইনি প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যাগুলোও গুরুত্ব হারাতে পারে। শেষ পর্যন্ত থেকে যেতে পারে একটি দৃশ্য—বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকার পর পর্যাপ্ত চিকিৎসার দাবি ওঠার মধ্যেই একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু।

সেই স্মৃতির ওপর ক্ষমতাসীনদের ব্যাখ্যা বসানো কতটা কঠিন, তা বলাই বাহুল্য। এই কারণেই মুনিরের কাছে ইমরান খান জীবিত ও মৃত—দুই অবস্থাতেই ঝুঁকিপূর্ণ।

জীবিত থাকলে তিনি গণসমর্থনসম্পন্ন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। আর মৃত হলে তিনি এমন এক স্থায়ী নৈতিক অভিযোগে পরিণত হতে পারেন, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন। এখানে শরিফ ও ভুট্টো-জারদারি পরিবারও কোনো ছাড় পাওয়ার যোগ্য নয়।

তারা চিরকাল নিজেদের সাংবিধানিক মূল্যবোধের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে পারেন না, অথচ একই সঙ্গে এমন একটি ব্যবস্থার সুবিধা নেবেন, যেখানে তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে বাইরে রাখা হয়েছে। তাদের অবস্থান অনেকটাই পরস্পরবিরোধী। তারা গণতন্ত্রের কথা বলেন, অথচ এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, যার স্থিতিশীলতা দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী নেতাকে নিষ্ক্রিয় রাখার ওপর নির্ভরশীল।

তারা বেসামরিক কর্তৃত্বের কথা বলেন, অথচ রাওয়ালপিন্ডির দীর্ঘ ছায়ার মধ্যেই শাসন করেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম দলীয় পরিচয়কে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মতো ধরে রাখেন, আবার অবাক হন কেন জনগণের কাছে নির্বাচনী রাজনীতি দিন দিন ব্যালট হাতে সামন্ততান্ত্রিক নাটকের মতো মনে হচ্ছে।

শরিফরা ক্ষমতা চান, কিন্তু সেই ক্ষমতার নিশ্চয়তা কে দিচ্ছে—তা স্বীকার করতে চান না। ভুট্টো-জারদারিরা গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চান, কিন্তু গণতান্ত্রিক ঝুঁকি নিতে চান না।

দুই পরিবারই এমন একটি ব্যবস্থার রাজনৈতিক অংশীদার, যার সমালোচনা তারা মাঝে মাঝে করেন, আবার বারবার সেই ব্যবস্থার সুবিধাও নেন।

এ কারণেই সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ শুধু একটি চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়। এটি এমন এক ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতাকে সামনে এনেছে, যেখানে মৌলিক অধিকার এতটাই অবদমিত যে সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়াকেও বিপ্লবী পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে।

একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র কোনো চক্ষু বিশেষজ্ঞকে ভয় পায় না। আত্মবিশ্বাসী সরকার পরিবারের সাক্ষাতের বিরুদ্ধে আদালতে লড়াই করে না। আর আত্মবিশ্বাসী সামরিক নেতৃত্বকে একজন ৭৩ বছর বয়সি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কারাগার, মামলা, তথ্যনিয়ন্ত্রণ ও বংশীয় রাজনৈতিক সহযোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয় না।

মুনির সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে পারেন। শরিফরা মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ভুট্টো-জারদারিরা রাষ্ট্রের নিজেদের ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারেন। তাদের হাতে পদ, প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা রয়েছে।

কিন্তু ইমরান খানের হাতে এমন একটি জিনিস রয়েছে, যা কোনো আদেশ, সাংবিধানিক সংশোধন বা নিয়োগের মাধ্যমে তৈরি করা যায় না—রাজনৈতিক অর্থ ও প্রতীকী শক্তি।

তাকে কারাগারে জীবিত রাখলে সেই শক্তি তাদের চ্যালেঞ্জ করবে। তাকে মুক্তি দিলে সেই শক্তি আবার রাস্তায় ফিরে আসতে পারে। আর তাকে মরতে দিলে সেই শক্তি তাদের সবার পরেও টিকে থাকতে পারে।

এটি আধিপত্য নয়। এটি এক ধরনের ফাঁদ। রাওয়ালপিন্ডির ‘জেনারেলিসিমো’ এমন এক বন্দিকে নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন, যাকে স্বস্তিতে মুক্তি দিতে পারছেন না, নিরাপদে ভেঙে ফেলতেও পারছেন না এবং হারাতেও পারছেন না।

আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক বংশগুলোরও একই ভয়াবহ সত্যটি বোঝা উচিত—যখন কোনো রাষ্ট্র একজন মানুষের হৃদস্পন্দন যেমন ভয় পায়, তেমনি ভয় পায় তার অনুপস্থিতিকেও, তখন সেই বন্দি আর কক্ষের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তি থাকেন না।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .