Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

নিষেধাজ্ঞা ইরানকে ভাঙতে পারেনি, আরও শক্ত করেছে

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪২ পিএম

নিষেধাজ্ঞা ইরানকে ভাঙতে পারেনি, আরও শক্ত করেছে

Advertisement

চলমান যুদ্ধ ও দীর্ঘ নৌ-অবরোধের মধ্যে গত ছয় মাস ধরে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অপরিশোধিত তেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। 

তবে এই বৈশ্বিক উত্তেজনার মাঝে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য কমিয়ে ৩.০ শতাংশ করলেও, আসল বিস্ময় দেখা গেছে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে। প্রচলিত কোনো অর্থনৈতিক ধারণার সঙ্গেই মিলছে না দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি। 

গত কয়েক মাসের তীব্র বোমারু হামলা, ভূখণ্ডে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট এবং আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতিতে আসেনি সেই চূড়ান্ত বিপর্যয়, যা অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে প্রায় নিশ্চিতভাবেই ঘটত। 

যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরণের ক্ষতির চিত্রই ফুটে ওঠে। আইএমএফ চলতি বছরের জন্য দেশটির অর্থনৈতিক সংকোচন ৫.৪ শতাংশে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। 

বিশ্বজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে দেশটির জীবনযাত্রার ব্যয়; জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮৮.৬ শতাংশে, যেখানে খাদ্য ও পানীয় খাতে দাম বেড়েছে ১৩৪.৬ শতাংশ এবং মাংসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত। 

ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞার খবরের পরপরই খোলা বাজারে ইরানি রিয়ালের দর নেমে গিয়ে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে ২০ লাখে। এ ছাড়া দেশের প্রধান জ্বালানি খাতও মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছে—যুদ্ধের কারণে গ্যাসের উৎপাদন প্রাক-যুদ্ধকালীন সময়ের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে এবং শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত রেশনিং চলছে। 

অথচ এই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি অদ্ভূতভাবে টিকে রয়েছে। সরকারি হিসাবে দেশে বেকারত্বের হার এখনো ৭.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ, বেতন ও পেনশন নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে এবং বাজারগুলোতে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। দেশে কোনো বড় ধরণের ব্যাংকিং সংকট তৈরি হয়নি, কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়নি কিংবা সরকার সার্বভৌম ঋণখেলাপি হয়ে পড়েনি। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, শান্তিকালীন সময়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য যেসব উপাদানকে প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা হয়—যেমন বিদেশি বিনিয়োগের অভাব, রফতানি খাতে রাষ্ট্রীয় একচ্ছত্র আধিপত্য এবং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা থেকে একরকম বিচ্ছিন্নতা—যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ঠিক সেই উপাদানগুলোই ইরানকে অর্থনৈতিক ধসের হাত থেকে রক্ষা করছে। 

এর মূল কারণ ইরান থেকে মূলধন পাচার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বৈশ্বিক বিনিয়োগের অভাব এবং আন্তর্জাতিক ঋণের নগণ্য পরিমাণের কারণে যুদ্ধের ধাক্কায় দেশটিতে বিদেশী মূলধন সরানোর কোনো পথ ছিল না। এমনকি মার্কিন-ইসরাইলি হামলার মুখে তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জ টানা ৮০ দিন বন্ধ থাকার পর চালু হলেও, শেয়ারসূচক অল-টাইম হাই বা নতুন রেকর্ড স্পর্শ করে। এই ঊর্ধ্বগতি মূলত বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন ছিল না; বরং রিয়ালের চরম অবমূল্যায়ন এবং বিদেশী মুদ্রায় স্থানান্তরের পথ বন্ধ থাকায় ইরানিদের নিজস্ব অর্থ খাটানোর অন্য কোনো নিরাপদ সুযোগ ছিল না। 

এ ছাড়া উন্মুক্ত বাজারে সম্পদ পুনরবণ্টনের জন্য দীর্ঘ চুক্তি ও দরকষাকষির প্রয়োজন হলেও, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকায় তেহরান মাত্র কয়েকটি সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েই কাঁচামাল বা অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটকালীন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থানান্তর করতে পারছে।

আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে গত ১৫ বছরে তৈরি হওয়া বিকল্প পথগুলোও যুদ্ধকালীন সময়ে কাজ এসেছে। চীন, রাশিয়া, তুরস্ক বা পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের স্থল, রেল ও ডার্ক-ফ্লীট তেল রফতানি ব্যবস্থা যুদ্ধের অনেক আগেই তৈরি ছিল। ফলে তীব্র অবরোধের মধ্যেও দেশটি যুদ্ধের সময়ে রফতানি করে তাদের নির্ধারিত বাজেটের ৬০ শতাংশের বেশি তেল রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে। 

তবে এটি নিশ্চিতভাবেই কোনো স্থায়ী স্বস্তি নয়; বরং রাষ্ট্র নিজের ঘাড়ে আঘাত না নিয়ে পুরো চাপটি দিয়ে দিচ্ছে সাধারণ জনগণের ওপর। মুদ্রার চরম অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি পণ্যের সরবরাহ বজায় রাখলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে ঠেকিয়েছে, যার ফলে এক গবেষণায় দেখা গেছে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। 

প্রসঙ্গত, অবকাঠামো সংস্কার স্থগিত রাখা ও নিজস্ব সঞ্চিত পুঁজি ব্যয় করার এই কৌশল ইরানের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে না। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে গত দেড় দশকে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হলেও, ইরান এমন এক অর্থনৈতিক সহনশীলতা অর্জন করেছে যা বিশ্বের উন্মুক্ত বাজারভিত্তিক দেশগুলোর নেই। 

এক্ষেত্রে বাহ্যিক অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে কোনো দেশকে দ্রুত নতিস্বীকার করানোর কৌশল যে সবসময় কার্যকর নয়, ইরানের সাম্প্রতিক অবস্থাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। 

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে কি ফের হামলা চালাবেন ট্রাম্প?

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে কি ফের হামলা চালাবেন ট্রাম্প?

‘ইরানবিরোধী যেকোনো শক্তির ব্যর্থতা অনিবার্য’

‘ইরানবিরোধী যেকোনো শক্তির ব্যর্থতা অনিবার্য’

যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অবরোধের বিষয়ে যা বলল ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অবরোধের বিষয়ে যা বলল ইরান

সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরও ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল ইরান

সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরও ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল ইরান

বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ইরানের কেশম দ্বীপ

বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ইরানের কেশম দ্বীপ

এবার ইরানের ওপর স্থল অবরোধ আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

এবার ইরানের ওপর স্থল অবরোধ আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন

বাবরি মসজিদ ভাঙার দৃশ্য দেখে কেঁদেছিলাম: সোনিয়া গান্ধী

বাবরি মসজিদ ভাঙার দৃশ্য দেখে কেঁদেছিলাম: সোনিয়া গান্ধী

কে এই আইজেনকোট, তার ফিলিস্তিন নীতি কী?

কে এই আইজেনকোট, তার ফিলিস্তিন নীতি কী?

পাকিস্তান ভেঙে ১২ প্রদেশ হচ্ছে?

পাকিস্তান ভেঙে ১২ প্রদেশ হচ্ছে?

নেতানিয়াহুকে হটানোর পথে আইজেনকোট, পেরোতে হবে কঠিন ৭ বাধা

নেতানিয়াহুকে হটানোর পথে আইজেনকোট, পেরোতে হবে কঠিন ৭ বাধা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম