Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

বিভৎস নির্যাতনের পর দুই বোনের একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিল ইরান

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম

বিভৎস নির্যাতনের পর দুই বোনের একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিল ইরান

দুই বোন তারানেহ রাহিমি ও রোমিনা রহিমি। ফাইল ছবি

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া যমজ দুই বোনের একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যজনকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, গ্রেফতারের পর তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে। নির্যাতনের কারণে দেখার সময় দুই বোনকে প্রায় চিনতেই পারেননি তাদের পরিবার। 

মাত্র ১৯ বছর বয়সে গ্রেফতার হন তারানেহ ও রোমিনা রহিমি। দুজনই তখনও উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। জানুয়ারিতে ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের সঙ্গে তারাও যোগ দিয়েছিলেন। এর প্রায় এক মাস পর গভীর রাতে মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাদের বাড়িতে ঢুকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তিরা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নির্দেশে কাজ করছিলেন।

গ্রেফতারের পর প্রায় চার মাস দুই বোনের কোনো সন্ধান পাননি তাদের মা মারজিয়েহ নুরমোহাম্মাদি। হাসপাতাল ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ করেও কোনো তথ্য না পেয়ে অবশেষে তিনি জানতে পারেন, তার দুই মেয়েকে কারাগারে রাখা হয়েছে।

মে মাসে ইসফাহানের দৌলতাবাদ কারাগারে মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে যান মারজিয়েহ। কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজের সন্তানদের দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী তাদের চাচাতো ভাই মাসউদ নুরমোহাম্মাদি জানান, দুই বোনের মুখ ছিল মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত। শরীরজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন। চুল ধরে টেনে এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে নেওয়ার কারণে তাদের মাথার অনেক অংশের চুল উঠে গিয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, তারানেহকে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করার জন্য তাকে বলা হয়েছিল—স্বীকারোক্তিতে সই না করলে তার বোন রোমিনাকে তার চোখের সামনে কারারক্ষীরা ধর্ষণ করবে। তারানেহ শেষ পর্যন্ত কীভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, তা জানা যায়নি।

মেয়েদের সেই সাক্ষাতের প্রায় পাঁচ মাস পর ইরানের আদালতের মাধ্যমে তাদের দণ্ডের খবর প্রকাশ্যে আসে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তারানেহকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রোমিনাকে দেওয়া হয়েছে ২৫ বছরের কারাদণ্ড। দণ্ড ঘোষণার পর থেকে পরিবারের কেউ তাদের আর দেখতে পারেননি।

দুই বোনের শাস্তির মধ্যে এত বড় পার্থক্যের কারণও স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যে বসবাসকারী তাদের চাচাতো ভাই মাসউদ নুরমোহাম্মাদি বলেন, ইরানি সরকারের কর্মকাণ্ড বোঝা কঠিন। তার অভিযোগ, সরকার নিজেদের আইনও অনুসরণ করে না।

তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আইনজীবীদের আপিল করার জন্য নির্দিষ্ট সময় থাকার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক অনেক ক্ষেত্রে সেই সুযোগও দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, কাউকে সাজা দিয়ে দ্রুত নিয়ে গিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে।

মাসউদের ধারণা, তারানেহকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার উদ্দেশ্য শুধু শাস্তি নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা। তার মতে, সরকার হয়তো মানুষকে বোঝাতে চাইছে—কেউ যতই নির্দোষ হোক, রাস্তায় নামলে তাকেও ধরে ফেলা সম্ভব।

চলতি বছর ইরানে ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ২৯ জন রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৬ জন নারী। এ ছাড়া শত শত বিক্ষোভকারী মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন অথবা এমন অভিযোগে বিচারাধীন রয়েছেন, যেগুলোর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। শুধু ইসফাহানেই এমন ব্যক্তির সংখ্যা ৭০-এর বেশি বলে জানা গেছে।

গত মাসে যুক্তরাজ্যসহ ৩১টি দেশ জানুয়ারির বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দেয়। দেশগুলো এসব মৃত্যুদণ্ডকে ভিন্নমত দমনের প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে।

মাসুদ নুরমোহাম্মাদি ২২ বছর আগে ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। পেশায় তিনি স্বাস্থ্যসেবা-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। দুই বোনের ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার কারণে তিনিও হুমকি পাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও খুদে বার্তায় কেউ কেউ তাকে তার বাড়ির ঠিকানা জানে বলেও হুমকি দিয়েছে।

মাসুদের ভাষ্য, ৮ ও ৯ জানুয়ারি ইসফাহানে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের সঙ্গে দুই বোনও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। গ্রেফতারের পর পরিবার দীর্ঘদিন জানতই না তারা কোথায়। আদালত, হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের খোঁজ করা হয়। একপর্যায়ে তাদের মায়ের কাছে ফোন করে জানানো হয়, দুই মেয়েকে কারাগারে রাখা হয়েছে এবং সেখানে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতে।

গ্রেফতারের পর তাদের একাকী কারাকক্ষে রাখা হয়েছিল বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাদের আইনজীবীদের ভাষ্য, আদালতে তারানেহ জানিয়েছিলেন, নির্যাতনের মাধ্যমে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। দুই বোন বিক্ষোভে সহিংসতায় জড়িত ছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি বলেও পরিবারের দাবি। এর আগে তারা কখনো কোনো বিক্ষোভে অংশ নেননি।

এখন মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটছে পরিবারের। মাসুদ বলেন, তার মা এখন তার সঙ্গেই থাকেন। মেয়েদের কথা মনে পড়লেই তিনি কাঁদেন—এমনকি এক মুহূর্তও এমন যায় না, যখন তাকে কাঁদতে দেখা যায় না।

তথ্যসূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম