Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

পবিত্র মক্কা কি সৌদি রাজনীতির ঢাল হয়ে উঠছে?

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম

পবিত্র মক্কা কি সৌদি রাজনীতির ঢাল হয়ে উঠছে?

পবিত্র কাবা শরিফ। ফাইল ছবি

Advertisement

কোনো রাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে ধর্মীয় পবিত্রতাকে জড়িয়ে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে খুবই কার্যকর কৌশল হতে পারে। সৌদি আরব দাবি করেছে, মক্কার দক্ষিণে হুথির একটি ড্রোন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ভূপাতিত করা হয়েছে। 

রিয়াদের দাবি, ড্রোনটি পবিত্র নগরীর নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করা হয়। তবে হুথি মক্কা বা ইসলামের কোনো পবিত্র স্থানকে লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর কথা অস্বীকার করেছে।

এই দাবির সত্যতা নিয়ে বিরোধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাক্যে মক্কার নাম আসার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি জাতীয় নিরাপত্তা যেন ইসলামের পবিত্র ভূগোলের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। যেন সৌদি রাষ্ট্র, রাজপরিবার ও হারাম শরিফ একই বিষয়। কিন্তু তারা এক নয়।

কাবা পবিত্র। সৌদ পরিবার একটি শাসক পরিবার। এই দুটিকে এক করে দেখা শ্রদ্ধা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব, যার প্রচারণাগত প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ রিয়াদের বর্তমান সংকট শুধু ইয়েমেনকে ঘিরে নেই। হুথি সৌদি ভূখণ্ড ও অবকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। একই সময়ে উপসাগর, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবকে সংযুক্ত করা জ্বালানি পরিবহণপথ নিয়েও চাপের মুখে রয়েছে সৌদি আরব।

সৌদি আরবের বিপুল সম্পদ, অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্র এবং কয়েক দশকের পশ্চিমা সামরিক সহায়তা রয়েছে। তারপরও ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা একটি অস্বস্তিকর শিক্ষা দিয়েছে—অস্ত্রের মজুত আর ক্ষমতা এক বিষয় নয়। একটি যুদ্ধবিমান কেনা যায়, কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কেনা যায় না।

এটাই আরব রাজনৈতিক ব্যবস্থার বড় একটি বৈপরীত্য। এ অঞ্চলে বিপুল অস্ত্রভান্ডার, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এমন গোয়েন্দা সক্ষমতা রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা কোনো ব্যক্তির ফোনও অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু বর্তমান সংকট শুধু সামরিক সক্ষমতার বিষয় নয়। এটি বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রশ্ন।

রাষ্ট্র টিকে থাকার জন্য শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে হলে সেই শক্তি প্রয়োগের পেছনে গ্রহণযোগ্য কারণ দেখাতে হয়। তাই হুতিদের আঞ্চলিক গুরুত্ব শুধু তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বা নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার পরিমাণ দিয়ে বোঝা যায় না।

তাদের কর্মকাণ্ড এমন একটি তুলনা তৈরি করেছে, যেখানে একদিকে ফিলিস্তিনের বিষয়ে নিয়মিত বক্তব্য দেওয়া ধনী সরকারগুলো, অন্যদিকে দরিদ্র ইয়েমেনি একটি আন্দোলন, যারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও নিজেদের সামরিক কর্মকাণ্ডকে গাজা ও আঞ্চলিক ক্ষমতার বৃহত্তর সংঘাতের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।

এই কৌশলের সঙ্গে কেউ একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু তুলনাটি তৈরি হয়েছে এবং রাজতন্ত্রগুলো বোমা মেরে সেই তুলনা মুছে ফেলতে পারে না।

সৌদি আরবের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। কারণ দেশটি শুধু সাধারণ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের দাবি করে না। দেশটির বাদশাহ ‘দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম’ উপাধি বহন করেন। এটি কেবল অলংকারমূলক কোনো আরবি উপাধি নয়; এর মধ্যে একটি নৈতিক দাবিও রয়েছে। আর নৈতিক দাবি যত বড় হয়, তার দায়ও তত বেশি।

ইসলামী পরিভাষায় তত্ত্বাবধান বা রক্ষণাবেক্ষণ একটি আমানত। আমানতদার যা রক্ষা করেন, তার মালিক হয়ে যান না; বরং সেটি রক্ষার কারণে তার দায় আরও বেড়ে যায়। তাই পবিত্র স্থানগুলোর তত্ত্বাবধানকে সেগুলোর প্রশাসনিক কর্তৃত্বের জন্য কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যুক্তিসংগত নয়।

সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ১৩ শতাব্দীরও বেশি আগে কাবা ছিল। খেলাফত, সুলতানি শাসন, বিভিন্ন রাজবংশ, শরিফ ও সাম্রাজ্যের সময়ও কাবা টিকে ছিল। স্থায়িত্ব পবিত্র স্থানের; সরকারগুলো আসে ও যায়।

এর অর্থ এই নয় যে মক্কায় হামলার বিষয়টি তুচ্ছ। বরং ঠিক উলটো। এর গুরুত্ব এত বেশি যে কোনো অভিযোগকে এমন রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে একটি সাধারণ ভূরাজনৈতিক সংঘাত মুহূর্তেই সভ্যতার অস্তিত্বের সংকটে রূপ নেয়।

গত আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এ বিষয়কে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চুক্তির সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ধারায় বলা হয়েছে, একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। 

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবে হামলা হলে এই চুক্তি কার্যকর হতে পারে। তবে পরে ইসলামাবাদ স্পষ্ট করেছে, কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়নি।

এখানেই মক্কাকে ঘিরে ব্যবহৃত ভাষা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘পাকিস্তান আরেকটি সৌদি-ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে’—এটি একটি বক্তব্য। আর ‘পাকিস্তানকে কাবা রক্ষা করতে হবে’—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য। প্রথমটি কৌশল, আইন, জাতীয় স্বার্থ এবং ইয়েমেনের ভয়াবহ অতীত নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ তৈরি করে। দ্বিতীয় বক্তব্যটি পবিত্রতার আবরণে আসে এবং তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত করে।

এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব কোনো তথ্য বানিয়ে বলেছে। তথ্যের সত্যতা সন্দেহ নয়, প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। তবে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ না থাকলেও কোনো রাজনৈতিক দাবির পেছনে কার কী স্বার্থ রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তুলেছে যে এখানে যে প্রতীকী শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা জাতীয়তাবাদ নয়; বরং সেই পবিত্র স্থান, যার দিকে বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলমান নামাজে মুখ ফেরান।

এখানেই বিষয়টি আবার ইয়েমেনের দিকে ফিরে যায়। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপের পর ইয়েমেনে বছরের পর বছর বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। বেড়েছে ক্ষুধা, ধ্বংস হয়েছে অবকাঠামো এবং তৈরি হয়েছে বড় ধরনের মানবিক সংকট। 

সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে নানা কৌশলগত কারণ দেখানো হলেও এর মানবিক ক্ষয়ক্ষতিও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। আর এই বাস্তবতা সৌদি আরবের ‘দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম’ পরিচয়ের সঙ্গে একটি বৈপরীত্য তৈরি করেছে।

হজের আধ্যাত্মিকতাকে শুধু সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত একটি তীর্থযাত্রায় সীমাবদ্ধ করা এবং এর সঙ্গে যুক্ত নৈতিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করার মধ্যে গভীর বৈপরীত্য রয়েছে। 

হজের মূল তাৎপর্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা, স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি নিয়ে ফিরে আসা নয়। হজের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর একটি হলো মানুষের সমতা।

বাদশাহ ও শ্রমিক একই ইহরামের পোশাকে প্রবেশ করেন। ইহরাম হলো পবিত্রতা ও ইবাদতের বিশেষ অবস্থা, যা হজ বা ওমরাহ পালনের আগে মুসলমানকে গ্রহণ করতে হয়। দুই টুকরো কাপড়ের নিচে সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য অদৃশ্য হয়ে যায়। আল্লাহর সামনে পদমর্যাদা অর্থহীন হয়ে পড়ে।

এ কারণেই আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতার বৈপরীত্যটি স্পষ্ট। একটি রাজতন্ত্র মানুষের মৌলিক সমতার এই ধর্মীয় প্রতীক পরিচালনা করতে পারে, আবার একই সময়ে তীব্র শ্রেণিবিন্যাসভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারে। 

একটি রাষ্ট্র ইসলামের সর্বজনীন পবিত্র স্থানের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার দাবি করতে পারে, আবার নিজেদের নিরাপত্তাকে রাজবংশের টিকে থাকার সঙ্গে এক করে দেখতে পারে। একইভাবে, কোনো সরকার তার কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর হামলাকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারে, যেন রাজ্যের দিকে ছোড়া প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য কাবাও।

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই। প্রশ্নটি হলো, তত্ত্বাবধান কি মালিকানা, নাকি দায়বদ্ধতা? ইসলামের এই প্রশ্নের উত্তর সৌদি আরবের চেয়ে বহু পুরোনো। আর সেই উত্তর রাজাদের জন্যও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

আমেরিকার জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন: ওবামা

আমেরিকার জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন: ওবামা

এখন ইনশাআল্লাহকে ‘আলহামদুলিল্লাহতে’ পরিণত করতে পারি: এল-সায়েদ

এখন ইনশাআল্লাহকে ‘আলহামদুলিল্লাহতে’ পরিণত করতে পারি: এল-সায়েদ

ওহাইওর ইতিহাসে প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত অ্যামি অ্যাকটন

ওহাইওর ইতিহাসে প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত অ্যামি অ্যাকটন

মার্কিন কংগ্রেসে দ্বিতীয় ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী কে এই পিয়া দান্ডিয়া?

মার্কিন কংগ্রেসে দ্বিতীয় ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী কে এই পিয়া দান্ডিয়া?

যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাস গড়া কে এই আবদুল এল-সায়েদ?

যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাস গড়া কে এই আবদুল এল-সায়েদ?

আমেরিকানরা ‘স্পষ্ট বার্তা’ দিয়েছে: বারাক ওবামা

আমেরিকানরা ‘স্পষ্ট বার্তা’ দিয়েছে: বারাক ওবামা

আরও পড়ুন

আমেরিকার জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন: ওবামা

আমেরিকার জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন: ওবামা

এখন ইনশাআল্লাহকে ‘আলহামদুলিল্লাহতে’ পরিণত করতে পারি: এল-সায়েদ

এখন ইনশাআল্লাহকে ‘আলহামদুলিল্লাহতে’ পরিণত করতে পারি: এল-সায়েদ

পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে নাসার মহাকাশযান, প্রাণহানির ঝুঁকি কতটা?

পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে নাসার মহাকাশযান, প্রাণহানির ঝুঁকি কতটা?

ওহাইওর ইতিহাসে প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত অ্যামি অ্যাকটন

ওহাইওর ইতিহাসে প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত অ্যামি অ্যাকটন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম