আল জাজিরার প্রতিবেদন
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও যেভাবে টিকে আছে ইরানিরা
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১২ পিএম
আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মেট্রো ও বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) সেবা বিনামূল্যে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তীব্র জ্বালানি সংকট ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ব্যয় কমাতে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে ইরান সরকার। সরকারি কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সবাইকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
গত শনিবার ইরান সরকার ঘোষণা করেছে, আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী বছরের মার্চের শেষ পর্যন্ত সরকারি অফিসে কর্মীদের সরাসরি উপস্থিতির সময় হবে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা। বাকি নির্ধারিত কর্মঘণ্টা কর্মীরা বাসা থেকে কাজ করে পূরণ করবেন।
সরকারি সংস্থাগুলোকে সপ্তাহে অন্তত এক দিন এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণপরিবহন ব্যবহার করে অফিসে যাতায়াত করেন। এরই মধ্যে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীকে মেট্রোতে করে অফিসে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা গেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রচারণার অংশ হিসেবেই এসব ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে।
গাড়ির ব্যবহার কমাতে আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মেট্রো ও বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) সেবা বিনামূল্যে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুরোনো ও জরাজীর্ণ সরকারি গাড়ির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক, গ্যাসচালিত বা হাইব্রিড গাড়ি ব্যবহারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তবে এ পরিবর্তন বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ধাপে ধাপে ও আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কিছু ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে কর্তৃপক্ষ।
সরকার-সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোকে কর্মঘণ্টা শেষে হিটিং ব্যবস্থা বন্ধ এবং বাতি নিভিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও জরুরি সেবার ক্ষেত্রে পরে আলাদা ব্যবস্থা ঘোষণা করা হবে।
এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি নির্দেশনায় সরকারি সংস্থাগুলোকে উপযুক্ত কর্মীদের বাসা থেকে কাজের সুযোগ দিতে বলেন। এতে সরকারের পেট্রল, বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যয় কমানোর কথা বলা হয়।
চলতি মাসের শুরুতে পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, ‘সরকারের মাধ্যমেই আমরা জ্বালানি ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার কমানোর কাজ শুরু করেছি।’ সরকারের কর্মীদের জন্য নেওয়া এসব ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাওয়া জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
যুদ্ধের চাপেও বাড়ছে সংকট
প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ ইরান এর আগেও জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। অব্যবস্থাপনা ও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে দেশটিতে আগেও জ্বালানি সাশ্রয়ের নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে জ্বালানি ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে নতুন ধরনের পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে অর্থসংকটে থাকা ইরান সরকার তৃতীয় স্তরের জ্বালানি কোটার দাম এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বাড়িয়েছে। ফলে মাসে ১১০ লিটার বা প্রায় ২৯ গ্যালনের বেশি পেট্রল ব্যবহার করলে আগের তুলনায় দ্বিগুণ দাম দিতে হবে। আমদানি করা গাড়িসহ কিছু শ্রেণির যানবাহনকে সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্তরের জ্বালানি ব্যবহারের আওতায় রাখা হয়েছে।
চলতি ইরানি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে, অর্থাৎ ২২ আগস্ট পর্যন্ত ইরানে দৈনিক গড়ে ১২ কোটি ২০ লাখ লিটার পেট্রল উৎপাদিত হয়েছে। বিপরীতে দৈনিক ব্যবহার হয়েছে ১৩ কোটি ২০ লাখ লিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি লিটার ঘাটতি ছিল। ষষ্ঠ মাসের প্রথমার্ধেও উৎপাদন ও ব্যবহারের মধ্যে প্রায় একই পরিমাণ ঘাটতি ছিল।
জুলাই থেকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে জ্বালানি আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগে এই আমদানির মাধ্যমে উৎপাদন ও চাহিদার ঘাটতি কিছুটা পূরণ করা হতো। একই অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সুপারট্যাংকারে ইরানের তেল রপ্তানিও বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও প্রভাব পড়েছে।
তবে অবরোধের বাইরে সমুদ্রে সংরক্ষিত অপরিশোধিত তেল ধীরে ধীরে চীনের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি এবং বড় জ্বালানি মজুতকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইরানের জ্বালানিমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ বলেন, ‘উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ এখন পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’
যুদ্ধের ধাক্কায় অর্থনীতিতে বড় পতন
এরই মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ ইরানিদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। চলতি সপ্তাহে ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র প্রকাশিত তথ্যেও যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের শেষ থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে ইরানের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১০ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে তেল ও গ্যাস উত্তোলন কমেছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
তেল খাতসহ শিল্প ও খনন খাতের উৎপাদন কমেছে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। নির্মাণ খাত কমেছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, সামগ্রিক সেবা খাত ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পরিবহন, সংরক্ষণ ও যোগাযোগ খাত ১৭ শতাংশ কমেছে।
সরকারি কর্মীদের কতজনকে বাসা থেকে কাজের আওতায় আনা হবে বা এতে কাজের দক্ষতার ওপর কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে সরকার এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
তবে সরকারি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অদক্ষতার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ইরানি মনে করছেন, নতুন এই পদক্ষেপগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আরও বড় একটি সমস্যার দিক তুলে ধরছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মোহসেন নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘আমার অজনপ্রিয় মত হলো, সরকারি খাতের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া এবং ৭০ শতাংশ মন্ত্রণালয় বন্ধ করে দিলেও দেশে কোনো সমস্যা হবে না।’
সরকারি খাতে কর্মী কত
ইরানের প্রশাসনিক ও কর্মসংস্থান সংস্থার উপপ্রধান জবিহোল্লাহ সালমানি আগস্টে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সরকারি বেতনভোগী কর্মীর সংখ্যা ২৪ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। এর সঙ্গে কাউন্সিল, ফায়ার সার্ভিস, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের ধরলে এই সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি হবে।
২০২৬ সালের মার্চের শেষ দিকে শেষ হওয়া আগের ইরানি বছরে সরকারি কর্মীদের গড় মাসিক বেতন ছিল প্রায় ২৪ কোটি রিয়াল। বর্তমান বিনিময় হারে এর পরিমাণ প্রায় ১০৪ মার্কিন ডলার।
সাংবাদিকরা সালমানির কাছে জানতে চান, উৎপাদন বা কাজের ওপর বড় ধরনের প্রভাব না ফেলে এসব কর্মীর কতজনকে বেতনভুক্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব। জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনো আমাদের কাছে এই সংখ্যা নেই।’
তবে বিভিন্ন সংস্থাকে এ বিষয়ে তথ্য দিতে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেতনভুক্ত কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৭৫ হাজার। এর মধ্যে শিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী কর্মীরাও রয়েছেন। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন প্রায় ৬ লাখ কর্মী।
বাসা থেকে কাজ করে সুবিধা
সরকারের নতুন কর্মসূচির প্রভাব এরই মধ্যে কিছু কর্মীর দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে শুরু করেছে।
সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করেন তরুণ আমির-হোসেইন। চলতি মাসের শুরু থেকে তাকে সপ্তাহে দুই দিন বাসা থেকে কাজ করতে হচ্ছে।
এর আগে তার অফিস সময় ছিল সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা। সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুধবার থেকে তা পরিবর্তন হয়ে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা হচ্ছে।
আমির-হোসেইনের কাজের বেশিরভাগই ল্যাপটপে করা সম্ভব। তবে মাঝে মাঝে ফোনে সমন্বয় করতে হয় অথবা অন্য গবেষণাকেন্দ্রে যেতে হয়।
তার ভাষায়, বাসা থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতা মোটের ওপর ইতিবাচক।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো অফিসে থাকলে যতটা কাজ করতাম, তার চেয়েও বেশি কাজ বাসা থেকে করতে পারি।’
নিয়মিত যাতায়াতের জন্য অনলাইন রাইড শেয়ারিং সেবা ব্যবহার করেন আমির-হোসেইন। তাই বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ তার যাতায়াতের খরচও কমিয়েছে।
তবে ইরানে অবস্থানরত এক অর্থনীতিবিদ আল জাজিরাকে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, সরকারের এসব পদক্ষেপ মূলত তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য এগুলো কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়।





-6aafb8ac1017b.jpg)