প্রেম করলেই ঘরছাড়া! বিয়ের পর তরুণ-তরুণীদের জীবন কাটে আত্মগোপনে
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
ভারতের হরিয়ানায় বিয়ে করা অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য বিয়ের পরের জীবন মানেই অন্তহীন আত্মগোপনের অধ্যায়।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের হরিয়ানায় বিয়ে করা অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য বিয়ের পরের জীবন মানেই নতুন কোনো সংসারে পা রাখা নয়; বরং তাদের শুরু হয় এক অন্তহীন আত্মগোপনের অধ্যায়। সামাজিক রীতিনীতি, একই গ্রাম বা গোত্রে বিয়ের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং খাপ পঞ্চায়েতের ফতোয়ার জেরে অনেক দম্পতিকে রাতের আঁধারে বাড়ি ছাড়তে হয়। কেউ আশ্রয় নেন বন্ধুর ঘরে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, আবার কেউ ঠাঁই পান পুলিশের নিরাপত্তায় গড়া ‘সেফ হাউসে’।
হিসার জেলার শ্রবণ ও আরতির গল্পটা ঠিক তেমনই। স্কুলে পড়ার দিনগুলোতেই তাদের পরিচয়, যা পরে রূপ নেয় প্রেমে। চলতি বছরের মে মাসে তারা যখন বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন দুজনেই বেশ ভালো করেই জানতেন যে তাদের গ্রাম এই সম্পর্ক সহজে মেনে নেবে না। ফলে কোনো ঢাকঢোল না পিটিয়ে তারা গোপনে আদালতে গিয়ে বিয়ে সেরে ফেলেন। দুজনের বর্তমান বয়স ২১ ও ১৯ বছর।
বিয়ের পর টানা চার মাস তাদের কাটাতে হয়েছে লুকিয়ে লুকিয়ে। কখনো বন্ধুর বাড়ি, আবার কখনো শহরের কোনো পার্ক বা শপিং মলে কাটিয়েছে তাদের সংগ্রামমুখর দিনগুলো। শ্রবণের বাবা মাস্তান সিং অবশ্য ছেলের ফোন পেয়ে প্রথমে খুশিই হয়েছিলেন। কারণ আরতিকে তাদের পরিবার অনেক আগে থেকেই চিনত। কিন্তু জটিলতা বাধে যখন জানা যায়, আরতির পরিবার এই বিয়ে কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না।
পঞ্চায়েতের ফতোয়া ও সামাজিক বয়কট
কিছুদিন পর পরিবারের আশ্বাসে দম্পতি গ্রামে ফিরলেও শুরু হয় পঞ্চায়েতের তৎপরতা। গত ২০ সেপ্টেম্বর গ্রামের প্রবীণরা একটি অনানুষ্ঠানিক সভা ডেকে এই প্রেমের বিয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কটের সিদ্ধান্ত নেন। একই গ্রামের মধ্যে বিয়ে করাকে তারা দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতির পরিপন্থি বলে ঘোষণা করেন।
গ্রামের প্রবীণ সদস্য কুলবন্ত গোসলের সাফ কথা, একই জাতি ও একই গ্রামের তরুণ-তরুণীর বিয়ে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাই এমন দম্পতিদের সামাজিকভাবে বর্জন করা উচিত। অন্যদিকে গ্রামের সরপঞ্চ রতন সিং অবশ্য দাবি করেন, এটি সরকারি পঞ্চায়েতের কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং গ্রামের প্রবীণদের ব্যক্তিগত মত। তার মতে, তারা প্রেমের বিরোধী নন, তবে একই গ্রামের মানুষের মধ্যে বিয়ে হলে গ্রামের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হতে পারে।
আরতির পরিবার এই বিয়েকে সরাসরি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছে। তার দাদি রোশনি আক্ষেপ করে বলেন, তারা চেয়েছিলেন আরতি পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। কিন্তু পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ায় তারা আর তাকে মেনে নিতে পারছেন না।
গোত্র ও গ্রামের বাইরের পুরোনো প্রথা
হরিয়ানার খাপ পঞ্চায়েতগুলোর মধ্যে একই গোত্র, একই গ্রাম বা নির্দিষ্ট সামাজিক সীমানার মধ্যে বিয়ের বিরোধিতা দীর্ঘদিনের এক সংস্কৃতি। দাহিয়া খাপের সভাপতি সুরেন্দর দাহিয়া দাবি করেন, তাদের প্রথা অনুযায়ী বিয়ের ক্ষেত্রে গ্রাম, এলাকা বা গোত্রের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব থাকা বাধ্যতামূলক। একই উৎসের মানুষদের মধ্যে বিয়ে হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও তার দাবি।
শুধু শ্রবণ আরতিই নন, হরিয়ানার বিভিন্ন প্রান্তে প্রেম করে বিয়ে করা অসংখ্য দম্পতিকে এমন নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে ৩৬টি অনার কিলিং বা সম্মান রক্ষার নামে হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে কেবল হরিয়ানাতেই ঘটেছে চারটি ঘটনা।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে কেবল সামাজিক নিয়ম ভাঙার ক্ষোভ কাজ করে না; বরং এর শেকড় প্রোথিত রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মানসিকতা এবং পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব হারানোর ভয়ে।
সেফ হাউসের বন্দি জীবন
হিসার শহরের কেন্দ্রীয় কারাগারের পেছনে রয়েছে একটি সরকারি অনুমোদিত সুরক্ষা-আবাস। হুমকির মুখে থাকা বা প্রেম করে বিয়ে করা দম্পতিদের সাময়িকভাবে সেখানে রাখা হয়। একসঙ্গে ১০ থেকে ১২টি দম্পতি থাকতে পারলেও সেখানে সুযোগ-সুবিধা বেশ সীমিত। অনেক সময় নিজেদেরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয়।
হিমাংশু ও বিমলার মতো ভিন্ন জাতির দম্পতিরাও সেখানে কাটিয়েছেন বন্দিদশা। হিমাংশু বাল্মীকি সম্প্রদায়ের আর বিমলা সাইনি সম্প্রদায়ের। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তারা যখন বিয়ে করেন, তখন পরিবার ও পঞ্চায়েতের ভয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন। বিয়ের পর পুলিশের সেফ হাউস এবং পরে সিরসায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে প্রায় তিন মাস লুকিয়ে ছিলেন তারা। নিরাপত্তার খাতিরে বন্ধ রাখতে হয়েছিল মোবাইল ফোন ও সব ধরনের যোগাযোগ।
দম্পতিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে প্রশাসনকেও পড়তে হয় নানা বিপাকে। জিন্দ ও হানসি জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এসব দম্পতির জন্য আলাদা কোনো বাজেট বা স্থায়ী অবকাঠামো নেই। কখনো পুলিশ লাইনের এক কোণে ছোট্ট ঘরে তাদের দিন কাটাতে হয়।
সব মিলিয়ে, ভালোবাসার টানে এক ছাদের নিচে বাঁচার স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণীদের কাছে বাস্তব জীবন হয়ে দাঁড়ায় চাকরি হারানো, পরিবারের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং নিরাপত্তার টানে সেফ হাউসের চার দেওয়ালে দিন কাটানোর এক নির্মম লড়াই।



