Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধে চীনের নীরব উপস্থিতি, বদলে যাচ্ছে সমীকরণ

Advertisement

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম

ইরান যুদ্ধে চীনের নীরব উপস্থিতি, বদলে যাচ্ছে সমীকরণ

Advertisement

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধকে এখন আর কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের সরাসরি সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুদ্ধের সামরিক ময়দানের বাইরে অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই চলছে। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে উঠে এসেছে চীন।

বেইজিং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। তবে ইরানের সঙ্গে চীনের গভীর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে ইরানি তেল কেনা এবং চীনা পণ্যের বিনিময়ে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া, ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা কৌশলকে জটিল করে তুলছে। ফলে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এ কারণেই বড় প্রশ্নটি এখন সামনে এসেছে—ইরান যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আরেকটি পরোক্ষ মঞ্চ হয়ে উঠছে?

ইরানের অর্থনীতির বড় ভরসা চীন

ইরানের অর্থনীতিতে চীনের গুরুত্ব নতুন নয়। তবে যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার সময়ে এই সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চীন ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কিনে থাকে। এসব তেলের বড় অংশ যায় চীনের ছোট ও স্বাধীন ‘টিপট’ শোধনাগারগুলোতে।

এসব শোধনাগারের আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততা তুলনামূলক কম। ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানি তেল কেনাবেচার ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরান ও চীনের মধ্যে তেল ও পণ্য বিনিময়ের একটি গোপন বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে ইরান চীনা পণ্য, যোগাযোগ সরঞ্জাম, যানবাহন ও অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করছে এবং বিনিময়ে তেল সরবরাহ করছে। এই ব্যবস্থায় প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যবহারও এড়িয়ে চলা হচ্ছে।

ওয়াশিংটনের জন্য এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা যত কঠোরই হোক, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি যদি তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যায়, তাহলে নিষেধাজ্ঞার চাপ পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন।

চীনা প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নিশানায়

ইরানের সঙ্গে চীনের এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও বসে নেই। ইরানের তেল বাণিজ্য, অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওয়াশিংটন।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অস্ত্র সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট উপাদান সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ১৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তালিকায় চীন, হংকং, রাশিয়া ও পাকিস্তানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানও ছিল।

এর আগে মার্কিন প্রশাসন ইরানি তেল আমদানির সঙ্গে যুক্ত চীনা ‘টিপট’ শোধনাগারগুলোর ব্যাপারেও সতর্কতা জারি করে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য চীনা সরবরাহ নেটওয়ার্কের ভূমিকা নিয়েও ওয়াশিংটনের নজরদারি বেড়েছে।

তবে চীনের বড় ব্যাংক বা আর্থিক ব্যবস্থাকে সরাসরি নিশানা করা ওয়াশিংটনের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ইরানকে চাপ দিতে গিয়ে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

তেল থেকে প্রযুক্তি, বদলে যাচ্ছে লড়াইয়ের ধরন

ইরান-চীন সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তি ও পণ্য সরবরাহ। আধুনিক যুদ্ধে একটি দেশকে সরাসরি অস্ত্র বা সেনা পাঠানোই একমাত্র সহায়তার পথ নয়। যোগাযোগব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক উপাদান, নেভিগেশন প্রযুক্তি, উৎপাদন সরঞ্জাম ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিও সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণেই ইরানের সরবরাহব্যবস্থায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি বাড়ছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক সরবরাহ সরাসরি সামরিক ব্যবহারে গেছে কি না, সে বিষয়ে সব অভিযোগেরই একই মাত্রার প্রমাণ নেই। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সরাসরি সামরিক সহায়তার মধ্যে পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ।

হরমুজে একই সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত ও মিল

ইরান যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির ওপর ইরানের ভৌগোলিক প্রভাব রয়েছে। আর চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানির কারণে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বেইজিংয়ের জন্য বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

যুক্তরাষ্ট্রও চায় এই নৌপথে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকুক। ফলে এখানে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের স্বার্থের একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে।

চীন একদিকে ইরানের পতন বা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিপর্যয় চায় না। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধও বেইজিংয়ের স্বার্থে নয়। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়বে।

চীনের এই দ্বৈত অবস্থানই বেইজিংয়ের কৌশলকে জটিল করে তুলেছে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের জ্বালানি স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, আবার এমন কোনো অবস্থানও নেওয়া যাবে না যাতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মধ্যস্থতাকারী হওয়ার সুযোগও দেখছে বেইজিং

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত চীনের জন্য শুধু ঝুঁকি নয়, কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে এবং বেইজিং সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রাখার আগ্রহ দেখিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও চীনের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তেহরানের প্রতি প্রকাশ্য ও সীমাহীন সমর্থনের বদলে বেইজিংকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে হচ্ছে।

অর্থাৎ চীনের লক্ষ্য শুধু ইরানকে টিকিয়ে রাখা নয়। একই সঙ্গে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক প্রভাবও ধরে রাখা।

দ্বৈরথের ভেতর আরেক দ্বৈরথ

ইরান যুদ্ধ তাই ধীরে ধীরে আরেকটি বড় প্রতিযোগিতার চিত্র সামনে আনছে। ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রভাব কাজে লাগিয়ে তেহরানকে দুর্বল করতে চাইছে। বিপরীতে বেইজিং বাণিজ্য, জ্বালানি ক্রয়, কূটনীতি ও বিকল্প সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে।

তবে এটিকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-চীন ‘অঘোষিত যুদ্ধ’ বলা এখনই অতিরঞ্জিত হবে। দুই দেশ ইরানের মাটিতে সরাসরি পরস্পরের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি। বরং ইরানকে ঘিরে তাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের সংঘাত ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে ইরানকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে এবং চীন কতটা পর্যন্ত সেই চাপ উপেক্ষা করে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারে।

ফলে ইরান যুদ্ধের আসল ‘চীন সমীকরণ’ হয়তো চীনের সরাসরি যুদ্ধে নামার প্রশ্নে নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব কি ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের কার্যকারিতাকে সীমিত করতে পারবে?

আর সেই পরীক্ষার ফল শুধু ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎই নয়, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরবর্তী অধ্যায়ের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে।

এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আলতাফ মোতির কলাম 

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি বৈঠক

ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি বৈঠক

চীনের চোখরাঙানি পাত্তা দিল না তাইওয়ান

চীনের চোখরাঙানি পাত্তা দিল না তাইওয়ান

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশকে থামাতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন অধ্যাপক চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশকে থামাতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র

জ্বালানি তেল রপ্তানি বন্ধ করল চীন, এশিয়ায় বড় ধরনের সংকটের শঙ্কা

জ্বালানি তেল রপ্তানি বন্ধ করল চীন, এশিয়ায় বড় ধরনের সংকটের শঙ্কা

পানির নিচে একসঙ্গে ১১৬ ড্রোন চালিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ল চীন

পানির নিচে একসঙ্গে ১১৬ ড্রোন চালিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ল চীন

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দিল যুক্তরাষ্ট্র

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দিল যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন

বারমুডায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নিখোঁজ, চলছে অভিযান

বারমুডায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নিখোঁজ, চলছে অভিযান

পাকিস্তানি নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা মার্কিন ডাক বিভাগে ১২৬ মিলিয়ন ডলারের প্রতারণা

মার্কিন ডাক বিভাগে ১২৬ মিলিয়ন ডলারের প্রতারণা

স্পেনে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ

স্পেনে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ

ইরান যুদ্ধে চীনের নীরব উপস্থিতি, বদলে যাচ্ছে সমীকরণ

ইরান যুদ্ধে চীনের নীরব উপস্থিতি, বদলে যাচ্ছে সমীকরণ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম