মেজর নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করবে যুক্তরাষ্ট্র
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৬ পিএম
সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা নিদাল হাসান। গেটি ইমেজ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন সাবেক মেজরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসাধারণ দেখতে পারবে।
প্রতিরক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডে নিরস্ত্র ১৩ জন মার্কিন সেনাকে গুলি করে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি সরাসরি সম্প্রচার (লাইভস্ট্রিম) করা হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, গত প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এটিই হবে প্রথম প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জন মিলস বলেছেন, এটি সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্তটি ‘আধুনিক যুগে নজিরবিহীন’ এবং এর ‘আইনি বৈধতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে’।
হেগসেথ বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করব যেন মানুষ এটি দেখতে পারে এবং এটি যেন সবার জন্য উন্মুক্ত হয়। মানুষের বোঝা উচিত, এ ধরনের কাজের জন্য কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হয়।’
পেন্টাগন এই সপ্তাহের শুরুর দিকে ঘোষণা করেছিল, তারা হাসানকে মৃত্যুদণ্ড দেবে। এটি হবে ৬০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে কোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা।
রক্ষণশীল টিভি চ্যানেল রিয়েল আমেরিকাস ভয়েসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হেগসেথ বলেন, হাসানের জন্য ‘সেনাদের একটি ফায়ারিং স্কোয়াড থাকবে। যেমনটা হওয়া উচিত।’
হাসান কোনো শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন কি না বা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হেগসেথ বলেন, ‘এতে কিছু যায় আসে না। ৩ ডিসেম্বর আমরা তাকে দেখব।’
পেন্টাগনের এক মুখপাত্র গত সোমবার জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সুপারিশ অনুমোদন করেছেন। সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি ট্রাম্প সমর্থন করেন কি না, তা জানতে বিবিসি হোয়াইট হাউসের কাছে প্রশ্ন রেখেছে।
গত বছর ১৭টি দেশে ২ হাজার ৭০০-এরও বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলেও মাত্র দুটি দেশে তা প্রকাশ্যে করা হয়েছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানে প্রকাশ্যে ১১টি এবং আফগানিস্তানে ছয়টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটেছে।
গত মঙ্গলবার মার্কিন সেনাবাহিনীর সেক্রেটারি জানিয়েছেন, টেক্সাসের ফোর্ট হুডে ৩ ডিসেম্বর এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে এটিই হবে প্রথম সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা ও মার্কিন সেনাবাহিনীর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হাসান ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডের একটি জনাকীর্ণ মেডিকেল ভবনে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাকে গুলি করে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।
আদালতে তিনি ‘যেকোনো ভুলের’ জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ২০১৩ সালে নিজের কোর্ট মার্শালের সময় তিনি বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন তিনি আফগানিস্তানে মুসলিম ও তালেবানদের রক্ষা করছিলেন।
সামরিক আইন অনুযায়ী, কোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া এর জন্য আপিল পর্যালোচনারও প্রয়োজন হয়, যেখানে একটি উচ্চতর আদালত সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনা করে এবং তা এগিয়ে নেওয়ার আইনি বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেয়।
মিলস জানান, হাসানের আপিল প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। তিনি সম্ভবত কেন্দ্রীয় আদালতে তার দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও সাজার বিষয়টি পর্যালোচনার আবেদন করবেন, যার ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যেতে পারে।
তাই মিলস বলেন, মৃত্যুদণ্ডটি যদি সত্যিই কার্যকর করা হয়, তবে তিনি অবাকই হবেন।
তিনি আরও বলেন, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং তা সরাসরি সম্প্রচারের (লাইভস্ট্রিম) উদ্যোগটি ট্রাম্প প্রশাসনের কেবলই মনোযোগ আকর্ষণের একটি প্রচেষ্টা মাত্র। এটি ঘটার সম্ভাবনা কম এবং এর মাধ্যমে ন্যায়বিচারের কোনো প্রতিফলন ঘটার প্রশ্নই আসে না।
ইয়েল ল স্কুলের ভিজিটিং লেকচারার ইউজিন আর ফিডেল বলেন, এটি ‘সত্যিই একটি দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত’।
তিনি বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করাটা মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল। সমাজ হিসেবে আমরা সেই পর্যায় অনেক আগেই পার করে এসেছি—অন্তত আজ পর্যন্ত আমি সেটাই মনে করতাম।’
ফিডেল বলেন, হাসান যদি আইনি লড়াই চালিয়ে যান, তবে ‘সেই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে চলবে’ এবং তা ‘হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদকালের চেয়েও অনেক দীর্ঘ হবে’।
কিছু অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তা কোনো না কোনোভাবে জনসাধারণের দেখার ব্যবস্থা রাখার নিয়ম রয়েছে। অনেক অঙ্গরাজ্যে সাংবাদিকদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি অন্যদের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকদের সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকার সুযোগও দেওয়া হয়।
তবে ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো বলেন, ‘এর আগে কখনও মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা হয়নি।’
তিনি বলেন, সরাসরি সম্প্রচারিত মৃত্যুদণ্ড এমন এক মাত্রার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, ‘যা সম্ভবত এই দেশে আমরা আগে কখনও দেখিনি’। দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পক্ষে—যদিও এর প্রচলন এখন কমছে। এ ক্ষেত্রে এমন যুক্তিও দেওয়া যেতে পারে যে, ‘আপনারা যদি মৃত্যুদণ্ডই চান, তবে আসুন দেখাই এই দেশে তা কীভাবে কার্যকর করা হয়’। এর ফলে মানুষ ঠিক কী ঘটছে, তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবে।
ডেনো বলেন, লাইভস্ট্রিম আয়োজনের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন; যেমন এতে বয়সসীমা বা বিধিনিষেধ থাকবে কি না এবং যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এটি দেখানো হবে, তার নীতিমালার সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক হবে কি না।
লাইভস্ট্রিমটি কোথায় দেখা যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। অধিকাংশ বড় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেই এমন নিয়ম রয়েছে, যা স্পষ্ট বা খোলামেলা বিষয়বস্তুর লাইভস্ট্রিমিং নিষিদ্ধ বা সীমিত করে।
ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও থ্রেডসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেটা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো লাইভ স্ট্রিম বা সরাসরি সম্প্রচার স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে। টিকটকেও অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইলন মাস্ক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) তাদের কন্টেন্ট বা বিষয়বস্তু তদারকির নীতি কিছুটা শিথিল করেছে। তবে তারা জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর দৃশ্য সংবলিত কন্টেন্ট তখনই সরিয়ে ফেলা হবে ‘যদি আমরা তাদের পরিবার বা কোনো অনুমোদিত প্রতিনিধির কাছ থেকে অনুরোধ পাই’।
ট্রাম্পের মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ব্যবহারকারীদের জন্য লাইভ-স্ট্রিম ভিডিওর কোনো সুবিধা নেই।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে যথাক্রমে চীন, ইরান, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও যুক্তরাষ্ট্র।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ বছর পর্যন্ত টানা ১৭ বছর যুক্তরাষ্ট্রে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। তবে ওই শেষ বছরেই তড়িঘড়ি করে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর পূর্বসূরি জো বাইডেনের দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করে দেন।
দেশটিতে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সে সময় ১১ বছর বয়সী এক অস্ট্রিয়ান কিশোরীকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর এক মার্কিন সেনাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছিলেন। এমনকি ভুক্তভোগীর পরিবার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির কাছে অপরাধীর প্রাণভিক্ষা বা ক্ষমা চেয়ে আবেদন করা সত্ত্বেও এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ মাসগুলোতে এক পলাতক মার্কিন সেনাকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।


