ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হয়েই লুলার সামনে যে ৫ কঠিন চ্যালেঞ্জ
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৭ এএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবার জিতেছেন বামপন্থী নেতা লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা, যার ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে খ্যাতি আছে বেশ। রোববারের রানঅফে তিনি ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়েছেন। তার চতুর্থ মেয়াদ শুরু হবে জানুয়ারিতে। কিন্তু সামনের পথ সহজ নয়। অর্থনীতি নিয়ে পাঁচটি কঠিন চ্যালেঞ্জ তার অপেক্ষায় আছে।
গত কয়েক বছরে ব্রাজিলের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছে। তবু বাড়তে থাকা ঋণ আর পুরোনো কাঠামোগত সমস্যা লুলার জন্য মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়াতে পারে, জানাচ্ছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
১. আকাশছোঁয়া সরকারি ঋণ
লুলার বর্তমান মেয়াদে ব্রাজিলের সরকারি ঋণ ১০ শতাংশ পয়েন্টের বেশি বেড়েছে। এখন ঋণ দেশের মোট আয়ের ৮২ শতাংশের বেশি। এতে সরকারের ধার করার খরচও বেড়েছে। এর মূল কারণ, বছরের পর বছর বাধ্যতামূলক খরচ বাড়ছে। ফলে ফেডারেল বাজেটের ৮ শতাংশেরও কম অংশ নিজের মতো সাজানো যায়।
ঋণ নিয়ে লুলার বার্তা স্পষ্ট নয়। কখনো তিনি ঋণের দুশ্চিন্তাকে ‘বাজে কথা’ বলেছেন। তার যুক্তি, ভালো প্রবৃদ্ধি হলেই সমস্যা মিটে যাবে। তার দল জানিয়েছে, বর্তমান বাজেট-নীতি তারা ধরে রাখবে। এই নিয়মে খরচ বাড়ার হার সীমিত থাকে। আয়ের চেয়ে খরচ কত কম হবে, সেই লক্ষ্যও ঠিক করা থাকে। এ ক্ষেত্রে সুদ বাদ দেওয়া হয়। নিয়ম আরও কঠোর হতে পারে, এমন ইঙ্গিতও দিয়েছে তারা।
কিন্তু লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে। কারণ লুলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ন্যূনতম মজুরি মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্রুত বাড়াবেন। এতে পেনশনের খরচও বাড়ে। এর আগেই তিনি কল্যাণমূলক ভাতা বাড়িয়েছেন। নতুন খরচের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
২. চড়া সুদ ও জেদি মূল্যস্ফীতি
ব্রাজিলে সুদের হার ১৩.৭৫ শতাংশ। তবু বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৪.৬ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহনসীমা ১.৫ থেকে ৪.৫ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি সীমার বাইরে।
অর্থনীতি ধীর হওয়ার লক্ষণ বাড়ছে। তাই গত মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা পঞ্চমবার সুদ কমিয়েছে। কিন্তু বাজারের ধারণা, ২০২৯ সাল পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি সরকারি লক্ষ্য ৩ শতাংশের ওপরেই থাকবে।
লুলার ইশতেহারে কম সুদের প্রতিশ্রুতি আছে। তিনি বলেছেন, রাজস্ব শৃঙ্খলা হবে এমনভাবে, যাতে সামাজিক কর্মসূচিতে আঁচ না লাগে। কিন্তু বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ বলছেন, খরচ কমালেই কেবল সুদ দ্রুত কমবে। দুটি কথা কীভাবে মেলাবেন, তা স্পষ্ট নয়।
৩. ঋণের ভারে নুয়ে পড়া পরিবার ও ব্যবসা
ক্রেডিট ব্যুরো সেরাসার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৪ মিলিয়ন ব্রাজিলিয়ান ঋণের কিস্তি দিতে পিছিয়ে আছেন। ৯৩ লাখ ব্যবসাও একই অবস্থায়। এটি রেকর্ড। চড়া সুদই এর কারণ।
এ কারণে জনসাধারণের অসন্তোষ বাড়ছে। অথচ অন্য সূচকগুলো ভালো। বেকারত্ব রেকর্ড পরিমাণ কম। মজুরি বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্রুত।
লুলা আরেক দফা ঋণ পরিত্রাণের পরিকল্পনা করছেন। এবার ব্যাংক থেকে দুর্দশাগ্রস্ত পারিবারিক ঋণ ছাড়ে কেনা হবে। ছোট ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ কর-ঋণও মাফ পাবেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব উদ্যোগ সাময়িক স্বস্তি দেবে।
সরকার আরও একটি বিষয় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছে। সহজে পাওয়া যায়, কিন্তু খরচ বেশি, এমন ঋণের ব্যবহার কমানো দরকার। যেমন ক্রেডিট কার্ড ও জামানতহীন ভোক্তা ঋণ। তবে কোনো প্রস্তাবের বিস্তারিত এখনো জানানো হয়নি।
৪. সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক সমর্থনের অভাব
কংগ্রেসে নিজের অর্থনৈতিক এজেন্ডা পাস করানো লুলার জন্য কঠিন হবে। ১৯৮০-এর দশকে গণতন্ত্রে ফেরার পর এবারই সবচেয়ে রক্ষণশীল আইনসভা নির্বাচিত হয়েছে।
লুলা ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারালেও বলসোনারোর লিবারেল পার্টি ও তাদের মিত্ররা দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ পাবে।
লুলার সহযোগীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি কর-ছাড় কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। কিন্তু করের বোঝা বাড়ায় এমন পদক্ষেপে সাংসদেরা বারবার বাধা দিয়েছেন।
এই মেয়াদেই লুলা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রার্থী ঠিক করতে ও সিনেটের অনুমোদন পেতে হিমশিম খেয়েছেন। এই তালিকায় আছে সুপ্রিম কোর্ট, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রতিযোগিতা কমিশন। এবার কংগ্রেসও ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে যাওয়ায় সামনে এটি আরও কঠিন হবে।
৫. কর সংস্কারের অনিশ্চয়তা
২০২৩ সালে লুলা কংগ্রেসে ভোগ্যপণ্যের করের বড় সংস্কারে সম্মতি আদায় করেন। এর অধীনে নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালু হবে জানুয়ারিতে। তিন মাসেরও কম সময় বাকি। অথচ সরকার এখনো কার্যকর করের হার জানায়নি। স্বাধীন বিশ্লেষকদের ধারণা, হার হবে প্রায় ২৮ শতাংশ।
প্রচারের সময় প্রতিক্রিয়ার ভয়ে সরকার আরেকটি বিলও কংগ্রেসে পাঠায়নি। এটি স্বাস্থ্য বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ওপর নতুন কর নিয়ে। যেমন সিগারেট ও মদ। এই বিলম্বে রাজস্ব আসতেও দেরি হতে পারে। কর নীতি সামলানো নিয়ে সরকারের সমালোচনাও বেড়েছে।
