আলজাজিরার বিশ্লেষণ
১৯৪৬ সাল থেকে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন, ক্ষমতাসীনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন মানেই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জন্য বড় এক পরীক্ষা। ইতিহাস বলছে, এ নির্বাচনে সাধারণত নিজেদের আসন ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হয় হোয়াইট হাউসে থাকা দলকে। ১৯৪৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গত আট দশকে অনুষ্ঠিত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ১৮টিতেই প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। মাত্র দুবার ঘটেছে ব্যতিক্রম। এবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টিও কি সেই একই রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে পড়তে যাচ্ছে? জনমত জরিপের ইঙ্গিত, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা এবারও ভাঙার সম্ভাবনা কম।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদি শাসনকালের মাঝামাঝি সময়ে এ নির্বাচন হয়। এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটি এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট দেবেন মার্কিন নাগরিকেরা। আগামী দুই বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।
প্রেসিডেন্টের নাম ব্যালটে না থাকলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনকে তার শাসনামলের প্রতি জনসমর্থনের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়। সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর ভারসাম্য আনতে ভোটাররা বিরোধী দলকে সমর্থন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এ প্রবণতাকে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল পেনাল্টি’ বা ‘মিডটার্ম পেনাল্টি’ বলে থাকেন।
আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনে মাত্র দুবার প্রতিনিধি পরিষদে আসন বাড়াতে পেরেছে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল। ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটনের ডেমোক্র্যাট এবং ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকানরা এ ধারার ব্যতিক্রম ঘটিয়েছিল। বাকি ১৮ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল গড়ে ২৬টি আসন হারিয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে আসন
১৯৪৬ সাল থেকে প্রতিনিধি পরিষদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন কমার ঘটনা বেশি দেখা গেছে। এ সময় ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের দলের গড় আসন হারানোর পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯টি। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৩টি।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০১০ সালে। বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার দুই বছর পর মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের ৬৪টি আসন হারায়। এতে কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রিপাবলিকানদের হাতে।
এর আগে ১৯৪৬ সালে হ্যারি এস ট্রুম্যানের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটরা ৫৬টি এবং ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটনের দল ৫৪টি আসন হারিয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারায় ক্ষমতাসীন দল।
রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কার নজির রয়েছে ১৯৫৮ ও ১৯৭৪ সালে। ডুইট ডি আইজেনহাওয়ারের আমলে দলটি ৫০টি এবং জেরাল্ড ফোর্ডের সময় ৪৮টি আসন হারায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা ৪২টি আসন হারিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারায়।
১৯৪৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের সাতটিতে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ এক দল থেকে অন্য দলের হাতে গেছে। সেগুলো হলো ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৯৪, ২০০৬, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২ সালের নির্বাচন।
সিনেটে আসন
একই সময়ে অনুষ্ঠিত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ১৩টিতে সিনেটে আসন হারিয়েছে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল। তবে মাত্র ছয়বার কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তারা। বছরগুলো হলো ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৮৬, ১৯৯৪, ২০০৬ ও ২০১৪।
প্রতিনিধি পরিষদের মতো সিনেটের সব আসনে প্রতি দুই বছর পর নির্বাচন হয় না। সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর এবং প্রতি নির্বাচনে সাধারণত ১০০ আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে ভোট হয়। ফলে কোন কোন অঙ্গরাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে, সেটিও ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৫৮ সালে আইজেনহাওয়ারের রিপাবলিকানরা সিনেটে ১৩টি আসন হারায়, যা এ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ১৯৪৬ সালে ট্রুম্যানের ডেমোক্র্যাটরা ১২টি এবং ২০১৪ সালে ওবামার ডেমোক্র্যাটরা ৯টি আসন হারিয়েছিল। শেষোক্ত নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রিপাবলিকানদের হাতে।
তবে কখনো কখনো প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের ফলাফল ভিন্ন হয়েছে। ১৯৮২ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ২৬টি আসন হারালেও সিনেটে একটি আসন বাড়ায়। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের দল প্রতিনিধি পরিষদে ৪২টি আসন হারালেও সিনেটে একটি আসন যোগ করে। ২০২২ সালে জো বাইডেনের ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারালেও সিনেটে একটি আসন বাড়াতে সক্ষম হয়।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে কী হবে?
নির্বাচনে আসন হারানো আর কোনো কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো এক বিষয় নয়। ১৯৬৬ সালে লিন্ডন জনসনের ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৪৭টি আসন হারিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছিল। আবার ১৯৮৬ সালে রিগ্যানের রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র চারটি আসন হারালেও সিনেটে আটটি আসন কমে যাওয়ায় কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ হারায়।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন ও সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট— দুই কক্ষেই পাস হতে হয়। ফলে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে যেকোনো একটি কক্ষ থাকলে প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা আটকে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারে এবং অভিশংসনের প্রক্রিয়াও চালাতে পারে। অন্যদিকে সিনেট প্রেসিডেন্টের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ আটকে দিতে পারে। এর মধ্যে আজীবন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা ফেডারেল বিচারকরাও রয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত তিনটি আসন বাড়াতে হবে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন চারটি আসন। সিনেটে দুই দলের আসনসংখ্যা সমান ৫০-৫০ হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নির্ণায়ক ভোটের কারণে নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতেই থাকবে।

