নেতানিয়াহুকে হটাতে গাদি আইজেনকটের পাশে দুই আরব দল, তবে বাধা এক জায়গায়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠনের প্রচেষ্টায় বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে দেশটির দুই আরব-অধ্যুষিত রাজনৈতিক দল। তবে তাদের সমর্থন পেলেও আইজেনকটের সরকার গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে তার জোটেরই ডানপন্থী দল ইসরাইল বেইতেনু। দলটি আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর কোনো সরকারে যোগ দিতে রাজি নয় বলে বারবার জানিয়েছে।
ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ জানিয়েছেন, নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা রোববার ঘোষণা করবেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের মতো আলোচনা শেষে এ কথা জানান তিনি।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহু কিংবা সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকট—কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। তিন বছর ধরে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইসরাইলকে নেতৃত্ব দেওয়া ডানপন্থী নেতানিয়াহুর বিপরীতে জাতীয় ঐক্য পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইজেনকট।
প্রথা অনুযায়ী, পার্লামেন্টের বেশি সদস্যের সমর্থন পাওয়া নেতাকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ নির্বাচনে ৬৭ জন পার্লামেন্ট সদস্য আইজেনকটকে সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৬ জন। সাতজন কোনো পক্ষেই সমর্থন দেননি।
হারজগ বলেন, ‘আলোচনার ফলাফল দেখে বিষয়টি পরিষ্কার মনে হতে পারে। কিন্তু আইন অনুযায়ী, কার সরকার গঠনের সক্ষমতা রয়েছে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আমার। দুই জোটের মধ্যে এবং জোটগুলোর অভ্যন্তরে পারস্পরিক ভেটোর কারণে বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু দলের নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে আমি সরাসরি ও দ্রুত বিষয়টি নির্ধারণের চেষ্টা করব।’
আইজেনকটের দল ইয়াশার বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইসরাইলের নাগরিকেরা পরিবর্তন বেছে নিয়েছেন এবং বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তার সরকারের ওপর সম্পূর্ণ অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।’ দলটি সব নাগরিকের জন্য কাজ শুরু করতে অবিলম্বে একটি জাতীয় জরুরি সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।
আরব দলগুলোর সমর্থন, জোটে মতবিরোধ
নির্বাচনে আরব-অধ্যুষিত দুটি রাজনৈতিক দল অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। দল দুটি মিলে ১৯টি আসন পেয়েছে। আইজেনকটের বিরোধী জোট তাদের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হলে সরকার গঠনে দল দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি।
বৃহস্পতিবার উভয় আরব দলই আইজেনকটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
তবে আইজেনকটের জোটের আরেক শরিক ডানপন্থী দল ইসরাইল বেইতেনু আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সরকারে থাকার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে।
দলটির নেতা আভিগদর লিবারম্যান একসময় নেতানিয়াহুর মিত্র ছিলেন, পরে তার সমালোচকে পরিণত হন। আরব দলগুলো হামাসকে স্পষ্টভাবে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে—এটিকে আপত্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। যদিও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের হামলার নিন্দা একাধিকবার জানিয়েছে দলগুলো।
অতি-ধর্মপ্রাণ ইহুদিদের সামরিক সেবায় ছাড় নিয়ে বিরোধ
এদিকে, আগের পাঁচটি নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়া অতি-ধর্মপ্রাণ ইহুদিদের দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট হারজগের সঙ্গে বৈঠকে নেতানিয়াহুকে আবার প্রধানমন্ত্রী করার সুপারিশ করেনি। তবে আইজেনকটের পক্ষেও অবস্থান নেয়নি দলটি।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে সাতটি আসন পাওয়া দলটি কোনো পার্লামেন্ট সদস্যকেই সরকার গঠনের জন্য সুপারিশ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
আরেক অতি-ধর্মপ্রাণ ইহুদি দল শাসের সঙ্গে মিলে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক বাধ্যতামূলক সেবা থেকে অব্যাহতি বহাল রাখার দাবি জানিয়ে আসছে।
নেতানিয়াহু এই অব্যাহতি বজায় রাখলেও আইন করে তা স্থায়ী করেননি। গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইসরাইলের বহু সংরক্ষিত সেনাকে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সামরিক সেবা থেকে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের অব্যাহতি নিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের আইনপ্রণেতা আইজ্যাক পিনড্রাস বলেন, ‘যে সরকারই গঠিত হোক না কেন, আমাদের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হবে তোরাহ শিক্ষার্থীদের অবস্থান নির্ধারণ করা।’
অন্যদিকে, বাম থেকে ডান—সব ধরনের ধর্মনিরপেক্ষ ইসরাইলির সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করা আইজেনকট সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি বন্ধের বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছেন।
আইজেনকটের জোটের কয়েকজন মিত্র অতি-ধর্মপ্রাণ ইহুদিদের সমালোচনা করেছেন। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ এই জনগোষ্ঠীর হলেও তাদের জন্মহার ধর্মনিরপেক্ষ ইসরাইলিদের তুলনায় অনেক বেশি। সমালোচকদের মতে, তারা রাষ্ট্রের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের এই অবস্থানের মূল উদ্দেশ্য নেতানিয়াহুকে শাস্তি দেওয়া এবং নিজেদের সমর্থনকে নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া। তবে নেতানিয়াহু সরকার গঠন করতে পারলে দলটি তাতে যোগ দিতে পারে।
সরকার গঠনে আরব দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
প্রেসিডেন্ট হারজগ কোনো আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিলে তিনি ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো হতে পারে। নির্ধারিত সময়ে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কাউকে দায়িত্ব দেবেন।
নতুন পার্লামেন্টে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমসহ নেতানিয়াহুর জোটের আসন ৫৩টি। অন্যদিকে আইজেনকটের জোটের আসন ৪৮টি।
নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী সরকারের প্রতি ক্ষোভ এবং কয়েকজন মন্ত্রীর বর্ণবাদী বক্তব্য ও আরব ইসরাইলিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের দীর্ঘদিনের অভিযোগের কারণে নির্বাচনে আরব-অধ্যুষিত দলগুলো ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছে।
আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বিরোধীদের সম্ভাব্য জোটের বিষয়টি নিয়েও বারবার সমালোচনা করেছেন নেতানিয়াহু।
বুধবার প্রকাশিত এক ভিডিওতে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, নির্বাচনে বিদেশি শক্তির অর্থায়নের বিষয়ে ‘গুরুতর সন্দেহ’ রয়েছে। একই সঙ্গে আরব নাগরিকদের আনুগত্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সূত্র: এনডিটিভি
