Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

সম্পদ বণ্টনে ইসলাম কি সত্যিই নারীদের ঠকিয়েছে?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:২৪ পিএম

সম্পদ বণ্টনে ইসলাম কি সত্যিই নারীদের ঠকিয়েছে?

ইসলামে নারীর উত্তরাধিকার। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

বর্তমান সমাজে একটি প্রচলিত অভিযোগ হলো— ‘ইসলামে উত্তরাধিকার সূত্রে নারীরা বঞ্চিত। পুরুষ পায় দ্বিগুণ, নারী পায় পুরুষের অর্ধেক— এটা অন্যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইসলাম নারীর প্রতি কোনো অবিচার করেনি বরং এটি সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য ব্যবস্থা দিয়েছে, যা দায়িত্ব ও অধিকার উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত।

ইসলাম কখনো নারীদের ঠকায়নি বরং তাদের সম্মান, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছে। পুরুষের দ্বিগুণ অংশ বৈষম্য নয়, বরং দায়িত্বের ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিফলন। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন প্রকৃত অর্থে মানব ইতিহাসের সর্বাধিক ন্যায়সঙ্গত আর্থিক বণ্টনব্যবস্থা, যা পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সমন্বয় ঘটিয়েছে।

মীরাছ: ইসলামে উত্তরাধিকার আইন

মীরাছের সুন্দর বণ্টন সমাজে অসন্তোষ নয়, বরং ঐক্য ও ন্যায়ের বীজ বপন করে। এটি ধনীকে মনে করায় দায়িত্ব, গরিবকে দেয় অধিকার; পুরুষকে শেখায় ত্যাগ, নারীকে দেয় নিরাপত্তা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলাম নিশ্চিত করেছে— যাতে কারও সম্পদ মৃত্যুর পর বিশৃঙ্খলার কারণ না হয়ে, হয়ে ওঠে পরিবারের মাঝে শান্তি ও ভালোবাসার বন্ধন। মীরাছ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-

يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ

‘আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে নির্দেশ দেন — ছেলের জন্য রয়েছে দুটি কন্যার সমান অংশ।’ (সূরা আন-নিসা: আয়াত ১১)

এই আয়াতকে অনেকে ভুলভাবে “বৈষম্য” মনে করেন। অথচ এটি ন্যায়বিচারের এক নিখুঁত দৃষ্টান্ত, কারণ ইসলামে অর্থনৈতিক দায়িত্বের ভার পুরুষের ওপর, নারীর ওপর নয়।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দায়িত্ব ও অধিকার

পুরুষের দায়িত্ব হলো- স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের পূর্ণ খরচ চালানো। স্ত্রীকে মহর (মোহরানা) প্রদান করা। পরিবারের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন-

ٱلرِّجَالُ قَوَّٰمُونَ عَلَى ٱلنِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَآ أَنفَقُوا۟ مِنْ أَمْوَٰلِهِمْ

‘পুরুষ নারীদের রক্ষণাবেক্ষণকারী, কারণ আল্লাহ তাদের একে অপরের উপর কিছু গুণে শ্রেষ্ঠ করেছেন এবং তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে।’ (সূরা আন-নিসা: আয়াত ৩৪)

প্রকৃতপক্ষে পুরুষের দ্বিগুণ অংশ আসলে অতিরিক্ত দায়িত্বের প্রতিফলন।

নারীর অধিকার

ইসলাম নারীকে শুধু মর্যাদা দেয়নি, দিয়েছে তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পূর্ণ অধিকার। একজন নারী যা উপার্জন করে, উপহার পায় বা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে — সবই তার নিজস্ব সম্পদ, কেউ তার অনুমতি ছাড়া তাতে এক টাকাও হাত দিতে পারে না। স্বামী, পিতা, ভাই — কেউই তার সম্পদের মালিক নয়। সে চাইলে তা নিজের ইচ্ছামতো ব্যয় করতে পারে, দান করতে পারে, কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় রাখতে পারে। ইসলামের এই অধিকার নারীর হাতে এমন এক নিরাপত্তা দিয়েছে, যা পৃথিবীর কোনো সভ্যতাই আগে দিতে পারেনি। আল্লাহ নারীকে শুধু ভালোবাসেননি — তাকে দিয়েছেন সম্মান, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার মুকুট। তাইতো-

> নারী তার প্রাপ্ত সম্পদের সম্পূর্ণ মালিক।

> সে চাইলেও সংসারের খরচ বহন করতে বাধ্য নয়।

> তার সম্পদে স্বামী বা অন্য কেউ অধিকার রাখে না।  রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

خُذِي فِي مَالِكِ مَا يَكْفِيكِ وَوَلَدَكِ بِالْمَعْرُوفِ

‘তুমি তোমার সম্পদ থেকে তোমার এবং তোমার সন্তানের জন্য যথাযথ ব্যয় করো।’ (বুখারি ৫৩৬৪)

নারী তার সম্পদের উপর সম্পূর্ণ স্বাধীন।

কখনও নারী পুরুষের চেয়ে বেশি পায়

নারী সবসময় পুরুষের অর্ধেক পায়— বিষয়টি এমন নয়। কুরআনে অন্তত ৩৪টি ভিন্ন পরিস্থিতি বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যে-

> কখনও নারী সমান পায়,

> কখনও বেশি পায়,

> কখনও একাই উত্তরাধিকারী হয়। যেমন-

একজন মা যদি মৃত সন্তানের একমাত্র উত্তরাধিকারী হন, তাহলে তিনি এক-তৃতীয়াংশ (⅓) পান।

আবার কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকলে নারী সমস্ত সম্পদের উত্তরাধিকারী হতে পারেন।

ইসলামই এনেছিল নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিপ্লব

ইসলামের আগ পর্যন্ত আরব সমাজে নারীদের উত্তরাধিকার বলতে কিছুই ছিল না। ইসলামই নারীকে দিয়েছে সম্পদের অধিকার, সম্মান ও আত্মমর্যাদা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দেন-

لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ ٱلْوَٰلِدَانِ وَٱلْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَآءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ ٱلْوَٰلِدَانِ وَٱلْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ ۚ نَصِيبًۭا مَّفْرُوضًۭا

‘পিতা-মাতা ও আত্মীয়রা যা রেখে যান, তাতে পুরুষদের যেমন অংশ রয়েছে, তেমনি নারীদেরও নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে — অল্প হোক বা বেশি।’ (সূরা আন-নিসা: আয়াত ৭)

এই আয়াত নারীর অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা।

পরিশেষে ইসলাম নারীদের ঠকায়নি, বরং তাদের সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা দিয়েছে। পুরুষের দ্বিগুণ অংশ কোনো বৈষম্য নয়, বরং দায়িত্বের ভারসাম্যের প্রতিফলন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলাম পরিবারে ন্যায়বিচার, সহযোগিতা ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। যেখানে নারী তার সম্পদে নিরাপদ আর পুরুষ তার দায়িত্বে সম্মানিত।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম