Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি— ইসলাম কী বলে?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি— ইসলাম কী বলে?

দ্বিতীয় বিয়ে ও প্রথম স্ত্রীর অধিকার: ইসলামি শরিয়ত ও প্রচলিত আইনের বিশ্লেষণ। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

বিয়ে কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত এবং আমানত। বর্তমান সমাজে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা এবং অস্পষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।। ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তাই এই সংবেদনশীল বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের জন্য স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইসলাম কি একাধিক বিয়ের অনুমতি দেয়?

ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে একজন পুরুষকে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—

فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً

‘তোমাদের কাছে নারীদের মধ্যে যারা ভালো লাগে, তাদের মধ্য থেকে দুই, তিন অথবা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা কর যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না—তবে একজনই যথেষ্ট।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩)

কুরআনুল কারিমের এই আয়াত সুস্পষ্ট করে দেয় যে, একাধিক বিয়ে ইসলামে কোন বাধ্যবাধকতা নয়; বরং এটি একটি অনুমতি, যা ন্যায়বিচারের কঠোর শর্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি ফরজ?

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা কি বৈধ? ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ফরজ বা শর্ত নয়। যদি বিয়ের মৌলিক শর্তসমূহ (সাক্ষী, ইজাব-কবুল ও মোহরানা) পূর্ণ হয়, তবে অনুমতি ছাড়াও সেই বিয়ে বৈধ হবে।

তবে ইসলামের শিক্ষা এখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে যে দায়িত্ব/শর্ত বা বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে—

ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব— মূল শর্ত

একাধিক বিয়ের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ন্যায়বিচার। শুধু ভরণপোষণ নয়, বরং সময়, দায়িত্ব, আচরণ ও মর্যাদার ক্ষেত্রেও ন্যায়পরায়ণতা জরুরি। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন—

وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ

‘তোমরা নারীদের মধ্যে পুরোপুরি ন্যায়বিচার করতে কখনোই সক্ষম হবে না, যদিও তোমরা চেষ্টা কর।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১২৯)

এই আয়াত মানুষকে সতর্ক করে দেয়— ন্যায়বিচার করা কতটা কঠিন। তাই যার মধ্যে এই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা নেই, তার জন্য একাধিক বিয়ের পথে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

স্ত্রীর অনুভূতি ও সম্মান: সুন্নাহর শিক্ষা

যদিও প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ফরজ নয়, তবে তার অনুভূতির প্রতি সম্মান ও ন্যায়পরায়ণ আচরণ করা সুন্নাহ ও উত্তম চরিত্রের অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি ৩৮৯৫)

এই হাদিস প্রমাণ করে—স্ত্রীর প্রতি দয়া, সম্মান ও ন্যায্যতা ঈমান ও চরিত্রের পরিচয়।

গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে— ইসলাম কী বলে?

গোপনে বিয়ে করা শরিয়তের দৃষ্টিতে তখনই অবৈধ হবে, যদি—

  • বিবাহের মৌলিক শর্ত (ইজাব-কবুল, সাক্ষী, মহর) পূরণ না হয়
  • বা প্রথম স্ত্রীর হক নষ্ট হয়

তবে বাস্তবতায় গোপন বিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই—

  • অন্যায়
  • অবিচার
  • পারিবারিক ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা ইসলাম সমর্থন করে না।

নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের জায়গা

ইসলাম কেবল বৈধতা শেখায় না; বরং দায়িত্ববোধও শেখায়। প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ফরজ না হলেও—

  • তাকে জানানো
  • তার কষ্ট বোঝা
  • ন্যায্যতা নিশ্চিত করা— এসবই তাকওয়া ও উত্তম আচরণের অংশ।

হজরত ওমর (রা.) বলতেন— ‘ন্যায়বিচারই শাসন ও সম্পর্কের মূল ভিত্তি।’

দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শরিয়তের দৃষ্টিতে ফরজ নয়—এটি সত্য। তবে এটাও সত্য যে, ইসলামের শিক্ষা শুধু আইনি বৈধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তা করবে, তার উচিত—

  • নিজের সক্ষমতা যাচাই করা
  • আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা মনে রাখা
  • প্রথম স্ত্রীর হক ও অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো

কারণ একদিন আল্লাহর সামনে শুধু বিয়ের বৈধতা নয়— ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব পালনের হিসাবও দিতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ, তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে পারিবারিক জীবন পরিচালনার তৌফিক দিন। আমিন।

ইসলামে বহুবিবাহ নিয়ে FAQ

প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি বাধ্যতামূলক? 

উত্তর: ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে বৈধ হতে অনুমতি নেওয়া শর্ত নয়। তবে বাংলাদেশের প্রচলিত পারিবারিক আইন অনুযায়ী প্রথম স্ত্রীর লিখিত অনুমতি নেওয়া আইনি বাধ্যবাধকতা।

প্রশ্ন: ইনসাফ করতে না পারলে কি একাধিক বিয়ে করা যাবে? 

উত্তর: না। কুরআন অনুযায়ী যদি কেউ স্ত্রীদের মধ্যে সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তার জন্য একটির বেশি বিয়ে করা জায়েজ নয়।

প্রশ্ন: গোপনে বিয়ে করলে কি তা কবুল হবে? 

উত্তর: ইজাব-কবুল, সাক্ষী ও মোহরানা ঠিক থাকলে বিয়ে হয়ে যাবে। তবে তথ্য গোপন করে কারো হক নষ্ট করা বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ইসলাম সমর্থন করে না।

প্রশ্ন: দুই স্ত্রীর ভরণপোষণ কি সমান হতে হবে? 

উত্তর: হ্যাঁ। উভয় স্ত্রীর আবাসন, খাবার এবং মৌলিক চাহিদাগুলো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সমানভাবে পূরণ করা স্বামীর ওপর ফরজ।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম