Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

তারাবিহ নামাজ কত রাকাত পড়বেন?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০৮ পিএম

তারাবিহ নামাজ কত রাকাত পড়বেন?

তারাবিহ নামাজ। ছবি: সংগৃহীত

রমজান ইবাদতের মাস। এ মাসে দিনের রোজার পাশাপাশি রাতের বিশেষ ইবাদত হলো তারাবিহ নামাজ। এশার নামাজের পর আদায় করা এই নফল নামাজ মুসলিম সমাজে গভীর গুরুত্ব বহন করে। তবে প্রতি বছরই একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—তারাবিহ কত রাকাত পড়া উচিত? আইম্মায়ে কেরামের মতে তারাবিহ বিশ রাকাত। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—

হজরত ইবনে কুদামা (রাহ.) বিশ রাকাত তারাবিহর ব্যাপারে ইজমা নকল করেছেন এবং ইমাম মালেক (রাহ.)-এর দ্বিতীয় মতের খণ্ডন করেছেন, যাতে বলা হয়েছে যে, তারাবিহর নামাজ ছত্রিশ রাকাত। ইবনে কুদামা (রাহ.) বলেন, কিয়ামে রমজান তথা তারাবিহর নামাজ বিশ রাকাত। এই নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তারাবির নামাজ চালু করেছেন স্বয়ং হজরত নবী কারিম (সা.)। কিন্তু বলা হয়, তারাবিহর নামাজ চালু করেছেন হজরত ওমর (রা.)। এর কারণ হলো, তিনিই সর্বপ্রথম হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর পেছনে জামাতের ব্যবস্থা করেছেন। তার নির্দেশেই হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) লোকদের নিয়ে তারাবিহর জামাত শুরু করেছেন।

এক বর্ণনায় এসেছে, রমজানের এক রাতে হজরত ওমর (রা.) বের হলে দেখেন, লোকজন বিক্ষিপ্তভাবে ছোট ছোট জামাত করে নামাজ পড়ছে। হজরত ওমর (রা.) বললেন, সবাইকে যদি এক ইমামের পিছনে জমা করে দিই (তাহলে ভালো হবে)। এরপর সবাইকে হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর পিছনে এক জামাতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

এরপর আরেক রাতে বের হয়ে দেখেন, লোকজন ইমামের পিছনে জামাতের সাথে নামাজ পড়ছে। ওমর (রা.) তখন বললেন, এটা উত্তম বিদআত (বুখারি ২০১০)। এরপর ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। এটাই সুফিয়ান ছাউরি (রহ.), আবু হানিফা (রহ.) ও শাফেঈ (রহ.)-এর মত। ইমাম মালেক (রহ.) বলেছেন, তারাবিহর নামাজ ছত্রিশ রাকাত। তিনি তখনকার মদিনাবাসীর আমল গ্রহণ করেছেন।

বিশ রাকাত তারাবিহর দলিল হলো— হজরত ওমর (রা.) যখন সাহাবিদেরকে হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর পেছনে দাঁড় করিয়েছিলেন তখন তিনি তাদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়েছিলেন। ইয়াযীদ ইবনে রুমান (রহ.) থেকে ইমাম মালেক (রহ.) বর্ণনা করেছেন যে, হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম (তিন রাকাত বিতরসহ) তেইশ রাকাত নামাজ পড়তেন।

হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি সাহাবি ও তাবেয়িদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়ার জন্য একজন ইমাম নিযুক্ত করেছেন। অন্যান্য সাহাবির সামনে হজরত ওমর (রা.) ও হজরত আলী (রা.)-এর নির্দেশ এবং সাহাবায়ে কেরামের এই আমল ইজমার পর্যায়ের।

ইবনে কুদামা (রহ.) আরও বলেন, যদি প্রমাণিত হয় যে, (ইমাম মালেক (রহ.)-এর যমানায়) মদিনাবাসী সকলেই ছত্রিশ রাকাত তারাবিহ পড়েছেন, তাহলেও ও হজরত ওমর (রা.) যা করেছেন এবং তার যুগে সাহাবায়ে কেরাম যে বিষয়ে ইজমা করেছেন, তারই অনুসরণ করা উত্তম। কোনো কোনো আলেম বলেছেন, মক্কাবাসীরা চার রাকাত অন্তরন্তর তাওয়াফ করতেন। মদিনাবাসীরা সে সওয়াব অর্জনের জন্য তাওয়াফের বদলে চার রাকাত নামাজ পড়তেন। কিন্তু বলাই বাহুল্য যে, সাহাবায়ে কেরাম যে রাকাত-সংখ্যার উপর ছিলেন সে অনুযায়ী আমল করাই শ্রেয়।

হজরত আলী (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি এক রমজানে বিভিন্ন মসজিদ ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। সেগুলোতে বাতি জ্বালিয়ে লোকজন নামাজ পড়ছে। তখন আলী (রা.) বললেন, আল্লাহ তাআলা হজরত ওমরের কবরকে আলোকিত করুন, যেমন তিনি আমাদের মসজিদগুলোকে আলোকিত করেছেন।

ইমাম মালেক (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, তারাবিহর নামাজ বিশ রাকাত। সুতরাং বিশ রাকাত উত্তম হওয়ার ব্যাপারে মুজতাহিদ ইমামগণের ইজমা সাব্যস্ত হচ্ছে। শায়েখ দারদীর মালেকী (রহ.) বলেছেন, রমজানে তারাবিহর নামাজ বিশ রাকাত। তা আদায় করবে ইশার নামাজের পর। বিতিরের তিন রাকাত ছাড়া বাকি প্রত্যেক দুই রাকাত পর পর সালাম ফেরাবে। মুস্তাহাব হলো, প্রত্যেক রাতে বিশ রাকাতে এক পারা (কুরআন) পড়া। এভাবে পুরো তারাবিহতে একবার কুরআনে কারিম খতম করা।

তদ্রুপ ইমাম শাফেঈ (রহ.) ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাবও বিশ রাকাত তারাবিহ পড়া। কেননা, হজরত মর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে এর উপর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা হয়ে গেছে। ইমাম ইবনে আবদুল বার (রহ.) বলেন, হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) থেকে এটাই সঠিক যে, তিনি সাহাবিদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়েছেন। এতে সাহাবিদের মধ্যে কারো দ্বিমত নেই। (আলইসতিযকার ৫/১৫৭)

মুখতাসারুল মুযানী কিতাবে (পৃ. ২১) আছে, ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেছেন, আমি মদিনাবাসীদের দেখেছি, তারা (তিন রাকাত বিতিরসহ) উনচল্লিশ রাকাত নামাজ পড়েন। তবে আমার নিকট বিশ রাকাত পড়া উত্তম। কেননা, এটাই হজরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত এবং আমি মক্কাবাসীদেরও দেখেছি, তারা বিশ রাকাত তারাবিহ এবং তিন রাকাত বিতির পড়েন।

ইমাম তিরমিজি (রহ.)-এর বক্তব্য

ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেন, হজরত ওমর (রা.), হজরত আলী (রা.) ও অন্যান্য সাহাবি থেকে যা বর্ণিত হয়েছে এর উপরই অধিকাংশ আহলে ইলমের আমল। অর্থাৎ তারাবিহর নামাজ বিশ রাকাত। সুফিয়ান ছাউরী (রহ.), আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) ও শাফেঈ (রহ.)-এর মাজহাবও এ অনুযায়ীই। শাফেঈ (রহ.) বলেছেন, মক্কাবাসীদের দেখেছি, তারা বিশ রাকাত তারাবিহ পড়েন। (জামে তিরমিজি : ২/৩২৭-৩২৮)

ইবনে রুশদ (রহ.) বলেন, ইমাম মালেক (রহ.)-এক বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম আবু হানিফা (রহ.), শাফেঈ (রহ.) ও আহমাদ (রহ.) বিতর ব্যতীত বিশ রাকাত তারাবিহর মত গ্রহণ করেছেন। (বিদাইয়াতুল মুজতাহিদ : ২/২৬২)

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, আমাদের শাফেঈ মাজহাব মতে তারাবিহর নামাজ বিশ রাকাত। প্রত্যেক দুই রাকাতে সালাম ফেরাবে এবং চার রাকাত পর পর ‘তারবীহা’ তথা আরাম করবে। আবু হানিফা (রহ.) ও তার অনুসারীগণ এবং আহমাদ (রহ.), দাউদ (রহ.) ও অন্যান্য ইমামগণের মতও এটাই। কাজী ইয়ায (রহ.) বলেছেন, জুমহুর উলামায়ে কেরামের মাজহাবও তা-ই। ইমাম মালেক (রহ.) বলেছেন, তারাবিহর নামাজ বিতর ব্যতীত ছত্রিশ রাকাত। (৫ -আলমাজমু : ৩/৫২৬)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) সাহাবিদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন, বিষয়টি সুপ্রমাণিত। তাই অনেক আলেমের মতে এটাই সুন্নাহ। কেননা হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) মুহাজির ও আনসার সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে বিশ রাকাত পড়েছেন। তখন এর ওপর কেউ কোনো আপত্তি করেননি। (মাজমূউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া : ২৩/১১২-১২৩)

মাজমূআতুল ফাতাওয়ান নাজদিয়ায় আছে- শায়েখ আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব তারাবিহ নামাজের রাকাত-সংখ্যা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে উল্লেখ করেছেন যে, হজরত ওমর (রা.) যখন হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর মাধ্যমে জামাতের ব্যবস্থা করেন তখন সাহাবায়ে কেরাম বিশ রাকাত তারাবিহ পড়েছেন।

মুসলিম উম্মাহর ইমামগণের এসব উদ্ধৃতি নিশ্চিত প্রমাণ করে— মুসলমানদের মাঝে বর্তমানে যে বিশ রাকাত তারাবি প্রতিষ্ঠিত এটাই হক। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। বিশ রাকাতই সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত। চার মাজহাবের ইমামগণ এর ওপরই ইজমা করেছেন। হজরত ওমর (রা.)-ও এই সংখ্যার নির্দেশই দান করেছিলেন। আর সহিহ হাদিসের ভাষ্য হলো, আল্লাহ তাআলা হক ও সত্য গচ্ছিত রেখেছেন ওমরের যবান ও কলবে। (তিরমিজি ৩৬৮২; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ৩২৬৪৯; মুসনাদে আহমাদ ৫১৪৫, ২১২৯৫, ২১৪৫৭; ইবনে হিব্বান ৬৮৮৯)।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—

> তারাবিহ সুন্নতে মুআক্কাদা (জোরালো সুন্নত)।

> জামাতে আদায় করা উত্তম।

> ধীরে-সুস্থে কিরাত ও মনোযোগ সহকারে আদায় করাই মূল লক্ষ্য।

তারাবিহ নামাজ রমজানের রাতকে আলোকিত করে। এটি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। আল্লাহ তাআলা সবাইকে ২০ রাকাত তারাবিহ আন্তরিকতা, মনোযোগ ও তাকওয়ার সঙ্গে আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম