পুরো জাকাত পরিশোধ না করলে কী হবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ১১:০১ পিএম
জাকাত। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলাম একটি সমন্বিত জীবনধারার ধর্ম, যেখানে বিশ্বাস, ইবাদত ও নৈতিক দিকের সমন্বয় ঘটানো হয়। মুসলমানদের জন্য জাকাত শুধুমাত্র আর্থিক দায়িত্ব নয়; এটি একধরনের আধ্যাত্মিক পরিচ্ছন্নতা, যার মাধ্যমে সম্পদ পবিত্র হয় এবং মানুষের মনকে কৃতজ্ঞতা, দয়া ও সহমর্মিতার দিকে পরিচালিত করে। পাশাপাশি, জাকাত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম এবং পাপমুক্তির সুযোগও এনে দেয়। তাই প্রশ্ন উঠে, জাকাত কিছু পরিমাণ পরিশোধ করলে কি আল্লাহ ক্ষমা করবেন?
কুরআনে জাকাত ও ক্ষমার মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ
‘তাদের সম্পদ থেকে সদকাহ গ্রহণ কর, যার মাধ্যমে তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশোধিত করবে।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ১০৩)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, জাকাত মানুষের সম্পদকে শুদ্ধ করার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক পবিত্রতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। অর্থাৎ জাকাত আদায় করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর কাছে পাপমুক্ত করতে পারেন।
আরও একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন—
اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَ الۡمَسٰكِیۡنِ وَ الۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡهَا وَ الۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُهُمۡ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الۡغٰرِمِیۡنَ وَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیۡمٌ حَكِیۡمٌ
‘নিশ্চয়ই সদকা হচ্ছে ফকির ও মিসকিনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য; (তা বণ্টন করা যায়) দাস আজাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত ৬০)
এই আয়াত নির্দেশ করে, জাকাত কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যম। আনুগত্য মানে আল্লাহর নৈকট্য এবং ক্ষমার সম্ভাবনা বৃদ্ধি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে জাকাতের গুরুত্ব ও ক্ষমার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন—
مَنْ أَدَّى الزَّكَاةَ وَتَابَ أَغْفَرَ اللَّهُ لَهُ ذُنُوبَهُ
‘যে ব্যক্তি জাকাত আদায় করে এবং পরিশোধ করার পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসে (তাওবা করে), আল্লাহ তার পাপ ক্ষমা করবেন।’
একটি অন্য হাদিসে এসেছে—
الزكاة تطهر المال وتهدي النفس
‘জাকাত সম্পদকে পবিত্র করে এবং আত্মাকে শুদ্ধি প্রদান করে।’ (মুসলিম ও বুখারি)
এ থেকে বোঝা যায়, জাকাত শুধু আর্থিক পরিশোধ নয়, বরং আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ও ক্ষমা লাভের মাধ্যম।
ইসলামিক স্কলারদের মতামত
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমদ (রাহ.) ও অন্যান্য মুজতাহিদরা একমত যে, নিসাব পূর্ণ হলে জাকাত আদায় করা ফরজ। এটি সামাজিক ন্যায়বিচার রক্ষা ছাড়াও পাপমুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ইমাম তিরমিজি এবং আল্লামা ইবনে কাইয়িম (রাহ.) বলেন, ‘জাকাত আদায় করলে অর্থাৎ আল্লাহর হক আদায় করলে, তা গুনাহ মোচনের পথ খুলে দেয়।’
মুফাসসির ও ফিকহ স্কলাররা উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে সঠিকভাবে জাকাত প্রদান করে এবং অন্তরে আল্লাহর প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা ও নেকি প্রদান করবেন।
স্কলাররা সাধারণত বলেন, জাকাতের সঙ্গে পবিত্রতার মনোভাব ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য থাকলে তা ব্যক্তিকে পাপমুক্ত করতে যথেষ্ট।
জাকাত পরিশোধ কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়; এটি আধ্যাত্মিক পরিশোধ, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। কুরআন ও হাদিস স্পষ্ট করে বলছে, যে ব্যক্তি নিসাবমতো জাকাত আদায় করবে, আল্লাহর পথে আনুগত্য প্রদর্শন করবে, তিনি পাপমুক্তির সম্ভাবনা অর্জন করবেন। ইসলামিক স্কলাররা মনে করেন, জাকাত ও অন্তরের সত্যনিষ্ঠি একসঙ্গে থাকলে আল্লাহ ক্ষমা ও বরকত প্রদান করবেন। অতএব, জাকাত আদায় করা কেবল অর্থনৈতিক ন্যায় নয়, বরং আধ্যাত্মিক মুক্তি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।

