আন্দোলন-সংগ্রামে নারীর অংশগ্রহণ, ইসলামের দৃষ্টিতে একটি বিশ্লেষণ
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম
নারীরা কি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে পারবে? ইসলাম কি এ বিষয়ে অনুমতি দেয়, নাকি নিরুৎসাহিত করে?
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমান সময়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আন্দোলন একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে- নারীরা কি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে পারবে? ইসলাম কি এ বিষয়ে অনুমতি দেয়, নাকি নিরুৎসাহিত করে?
ইসলামের মূল ভিত্তিতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং সৎকাজে সহযোগিতা করা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারিত।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী—তারা একে অপরের সহযোগী, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে। (সূরা তাওবা ৭১)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সমাজ সংস্কার ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে নারী-পুরুষ উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের সামাজিক অংশগ্রহণের বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তারা কেবল গৃহকেন্দ্রিক ছিলেন না, বরং শিক্ষা, পরামর্শ, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সংগ্রামী ভূমিকাও পালন করেছেন।
হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় উম্মে সালামা রা. এর পরামর্শ নবীজি সা. গ্রহণ করেছিলেন, যা প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার উজ্জ্বল উদাহরণ। আবার উহুদের যুদ্ধে নুসাইবা বিনতে কা’ব রা. এর সাহসিকতা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
তবে ইসলামে প্রতিটি কাজের জন্য কিছু শর্ত ও সীমারেখা নির্ধারিত রয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান করো এবং পূর্বের অজ্ঞতার যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না। (সূরা আহযাব ৩৩)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, এটি নারীদের সম্পূর্ণ গৃহবন্দি করার নির্দেশ নয়, বরং শালীনতা, সংযম এবং অশালীন প্রদর্শন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ।
হাদিসে এসেছে, নবীজি সা. বলেছেন, তোমরা আল্লাহর বান্দীদের মসজিদে যেতে বাধা দিও না। (সহিহ মুসলিম)
এটি প্রমাণ করে যে, নারীদের সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অনুমতি রয়েছে, তবে তা শালীনতা ও নিরাপত্তার শর্তে।
ইসলামী আইনশাস্ত্রের বড় বড় ইমামরাও এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ মতামত প্রদান করেছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. মনে করেন, নারীর বাইরে যাওয়া বৈধ, তবে তা ফিতনা বা অনৈতিক পরিবেশ থেকে মুক্ত হতে হবে।
ইমাম মালিক রহ., ইমাম শাফেয়ী রহ. এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মতেও একই ধরণের শর্ত প্রযোজ্য অর্থাৎ নিরাপত্তা, শালীনতা এবং শরীয়তের সীমা রক্ষা করা আবশ্যক।
সমসাময়িক আলেমদের একটি অংশ মত দেন যে, যদি কোনো আন্দোলন শান্তিপূর্ণ হয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য হয় এবং সেখানে অশালীনতা, বিশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে সেই ধরনের সামাজিক কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ শরীয়তের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। তবে যদি পরিবেশ অনিরাপদ হয় বা শরীয়তের বিধান লঙ্ঘনের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তা পরিহার করাই অধিক নিরাপদ ও উত্তম।
ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমাজের অংশ এবং উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার। তবে সেই অংশগ্রহণ হতে হবে শালীনতা, সংযম, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় বিধানের আলোকে।
সবশেষে বলা যায়, ইসলাম নারীর অংশগ্রহণকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেনি, আবার সীমাহীন স্বাধীনতাও দেয়নি, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ নির্দেশ করেছে, যেখানে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধই প্রধান ভিত্তি।
লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

