Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের ফোন চেক করতে পারবে? ইসলাম কী বলে

Advertisement

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের ফোন চেক করতে পারবে? ইসলাম কী বলে

দাম্পত্য সম্পর্ক ইসলামে শুধু সামাজিক একটি চুক্তি নয়, এটি একটি পবিত্র আমানত।

Advertisement

দাম্পত্য সম্পর্ক ইসলামে শুধু সামাজিক একটি চুক্তি নয়, এটি একটি পবিত্র আমানত। ভালোবাসা, দায়িত্ব ও বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সম্পর্কের ভেতরে যখন সন্দেহ ঢুকে পড়ে, তখন মানুষ নীরবে এমন কিছু করতে শুরু করে যার পরিণতি হয় আরও গভীর দূরত্ব। 

আজকের সময়ে সেই নীরব কাজের নাম প্রায়ই একটাই—স্বামী বা স্ত্রীর মোবাইল ফোন বিনা অনুমতিতে পরীক্ষা করা। 

ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি হলো কোনো মানুষের গোপনীয়তা অকারণে অনুসন্ধান করা বৈধ নয়। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।

বহু ইমাম ও ফিকহবিদ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা কেবল অপরিচিতের জন্য নয়, বরং নিকটতম সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রযোজ্যতা রয়েছে। স্বামী–স্ত্রী হওয়া মানেই একজন আরেকজনের সব ব্যক্তিগত পরিসরে জোরপূর্বক প্রবেশের অধিকারী হয়ে যাওয়া নয়। 

ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী দাম্পত্য নৈতিকতা নিয়ে আলোচনায় বলেছেন, সংসারে শান্তি টিকে থাকে বিশ্বাসের মাধ্যমে, অনুসন্ধানের মাধ্যমে নয়। তাঁর মতে, অহেতুক সন্দেহ থেকে জন্ম নেওয়া অনুসন্ধান অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট করে এবং ধীরে ধীরে ভালোবাসাকে অবিশ্বাসে পরিণত করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মোবাইল ফোনে থাকা ব্যক্তিগত কথোপকথন বা লেখা অনুমতি ছাড়া দেখা সেই নিষিদ্ধ অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। 

হানাফি ও মালিকি মাজহাবের অনেক আলেম মত দেন যে, স্বামী–স্ত্রীর মধ্যেও ‘হক” ও “হুদুদ” বা সীমারেখা আছে। স্ত্রী যেমন স্বামীর সম্পূর্ণ অন্তর্জগতের পাহারাদার নন, তেমনি স্বামীও স্ত্রীর প্রতিটি ব্যক্তিগত কথার তত্ত্বাবধায়ক নন। 

মোবাইল ফোন আজকের সময়ে মানুষের ব্যক্তিগত ডায়েরির মতো—এতে থাকতে পারে দোয়া, কান্না, দুর্বলতা কিংবা একান্ত চিন্তা, যা প্রকাশের জন্য প্রস্তুত নয়। 

তবে ইসলাম বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না। যদি প্রতারণার স্পষ্ট আলামত দেখা যায়, যদি দাম্পত্য জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, তখন অনেক আলেম বলেন—খোলামেলা কথা বলাই প্রথম ও অপরিহার্য পথ। 

অনুমতি নিয়ে, সম্মানের সঙ্গে, প্রয়োজনে পারিবারিক বা ধর্মীয় মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। গোপনে মোবাইল চেক করা শেষ বিকল্প তো নয়ই, বরং অধিকাংশ সময় তা সমস্যা আরও জটিল করে তোলে। 

ইমাম ইবনু তাইমিয়ার একটি মূলনীতি এখানে প্রাসঙ্গিক “যে কাজ বাহ্যিকভাবে সত্য উদঘাটনের উদ্দেশ্যে করা হয়, কিন্তু ভেতরে ফিতনা সৃষ্টি করে, তা কল্যাণ নয়।” 

অনেক সময় মোবাইল চেক করে সত্য পাওয়া গেলেও সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফিরে আসে না। কারণ বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে, সত্যও তখন শান্তি দিতে পারে না। 

ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে পাহারা নয়, প্রশান্তির বন্ধন হিসেবে দেখতে চায়। যেখানে স্বামী–স্ত্রী একে অপরের কাছে নিরাপদ, সন্দেহমুক্ত ও সম্মানিত। সেখানে অনুমতি ছাড়া মোবাইল দেখা শুধু একটি প্রযুক্তিগত অনধিকার প্রবেশ নয়, এটি বিশ্বাসের দরজায় নীরব আঘাত। 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা মোবাইলের নয়, মননের। সম্পর্ক টিকে থাকে নজরদারিতে নয়, বরং আমানত রক্ষার চেষ্টায়। আর যে সংসারে আল্লাহভীতি আছে, সেখানে মোবাইলের পাসওয়ার্ডের চেয়ে হৃদয়ের স্বচ্ছতাই বেশি জরুরি। 

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম