দরুদ শরিফ পড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম সুন্দর মাধ্যম হলো দরুদ শরিফ পাঠ। এটি শুধু একটি জিকির নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশ পালন, নবীজির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং অসংখ্য সওয়াব অর্জনের বিশেষ আমল। একজন মুমিন যত বেশি দরুদ পাঠ করেন, তত বেশি তিনি নবীজির প্রতি নিজের ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশ করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং নবীজির ওপর দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসেও দরুদ পাঠের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ কিছু সময়ে দরুদ পাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই কখন, কীভাবে এবং কোন কোন সময়ে দরুদ শরিফ পড়া উত্তম, তা প্রত্যেক মুসলমানের জানা প্রয়োজন।
দরুদ শরিফের অর্থ ও তাৎপর্য
‘দরুদ’ ফারসি শব্দ। এর অর্থ শুভকামনা, কল্যাণ ও রহমত প্রার্থনা। ইসলামি পরিভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি আল্লাহর রহমত, মর্যাদা ও শান্তি কামনা করাকে দরুদ বলা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর ওপর রহমত অবতীর্ণ করেন এবং ফেরেশতারা তার জন্য রহমতের দোয়া করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তার প্রতি দরুদ পাঠ কর এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ কর।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫৬)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নবীজির ওপর দরুদ পাঠ করা মুমিনদের জন্য আল্লাহর বিশেষ নির্দেশ। আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীর (সা.) প্রতি সালাতের অর্থ তার প্রশংসা ও রহমত দান, ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে তা রহমতের দোয়া এবং মুমিনদের পক্ষ থেকে তা দরুদ ও সালাম পাঠ।
দোয়া করার ক্ষেত্রেও দরুদ পাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন—
إِنَّ الدُّعَاءَ مَوْقُوفٌ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَا يَصْعَدُ مِنْهُ شَيْءٌ حَتَّى تُصَلِّيَ عَلَى نَبِيِّكَ
‘নিশ্চয়ই দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে আটকে থাকে। যতক্ষণ না তুমি তোমার নবীর (সা.) ওপর দরুদ পাঠ কর, ততক্ষণ তা ওপরে ওঠে না।’ (তিরমিজি ৪৮৬)
তাই দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও নবীজির ওপর দরুদ পাঠ করা এবং শেষে দরুদ পাঠের মাধ্যমে দোয়া শেষ করা উত্তম।
দরুদ শরিফ পাঠের বিশেষ ফজিলত
দরুদ পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর রহমত, গুনাহ মাফ এবং মর্যাদা বৃদ্ধির মতো অসংখ্য কল্যাণ লাভ করতে পারেন। হাদিসে এর কয়েকটি বিশেষ ফজিলত তুলে ধরা হয়েছে—
১. একবার দরুদ শরিফে আল্লাহর পক্ষ থেকে দশটি রহমত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا
‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন।’ (মুসলিম ৪০৮)
অর্থাৎ, একজন মুমিন একবার দরুদ পাঠ করলেও আল্লাহর পক্ষ থেকে দশগুণ রহমত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। এটি দরুদ পাঠের অন্যতম বড় ফজিলত।
২. কিয়ামতের দিন নবীজির (সা.) নৈকট্য লাভ
দরুদ পাঠের আরেকটি বিশেষ পুরস্কার হলো কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য লাভ করা। তিনি বলেছেন—
إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلَاةً
‘কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে।’ (তিরমিজি ৪৮৪)
তাই জীবনের প্রতিটি দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর।
৩. নবীজির (সা.) নাম শুনে দরুদ শরিফ না পড়া দুর্ভাগ্যের কারণ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে তার ওপর দরুদ পাঠ করা উচিত। এ বিষয়ে তিনি কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। তিনি বলেন—
الْبَخِيلُ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ
‘কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলো, অথচ সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করল না।’ (তিরমিজি ৩৫৪৬)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজির (সা.) নাম শুনলে দরুদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এটি তার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম।
তাহলে কোন কোন সময়ে দরুদ শরিফ পাঠ করবেন?
দরুদ শরিফ পাঠের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই। পবিত্রতা বজায় রেখে দিন-রাতের যে কোনো সময় দরুদ শরিফ পাঠ করা যায়। তবে কুরআন ও হাদিসে কিছু বিশেষ সময় ও অবস্থায় দরুদ পাঠের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো—
১. নামাজের শেষ বৈঠকে
নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরুদে ইবরাহিম পাঠ করা হয়। এটি নামাজের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল। দরুদে ইবরাহিমের শুরু—
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
‘হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) ও তার পরিবারের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইবরাহিম (আ.) ও তার পরিবারের ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। (বুখারি ৩৩৭০, মুসলিম ৪০৬)
২. নবীজি (সা.)-এর নাম শুনলে
কোনো আলোচনায়, ওয়াজে, মাহফিলে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে তার ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করা উচিত। এটি নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
৩. দোয়া করার আগে ও পরে
দোয়া করার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও নবীজির (সা.) ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করা এবং শেষে দরুদ শরিফ পাঠ করা উত্তম। এতে দোয়ার আদব রক্ষা হয় এবং দোয়া কবুলের আশা করা যায়।
৪. আজানের পর
আজান শেষ হলে প্রথমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করতে হবে। এরপর তার জন্য আল্লাহর কাছে ওয়াসিলার মর্যাদা প্রার্থনা করতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ ثُمَّ صَلُّوا عَلَيَّ
‘তোমরা যখন মুয়াজ্জিনের আজান শুনবে, তখন সে যা বলে তোমরাও তা বলবে। এরপর আমার ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করবে।’ (মুসলিম ৩৮৪)
৫. জুমার দিন ও জুমার রাতে
শুক্রবার দরুদ পাঠের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ
‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। সুতরাং এ দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ কর।’ (আবু দাউদ ১০৪৭)
তাই জুমার দিন ও আগের রাত থেকে বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠের অভ্যাস করা উচিত।
৬. কোনো মজলিস বা বৈঠক শেষ করার সময়
কোনো বৈঠক, আলোচনা কিংবা মজলিস শেষে দরুদ শরিফ পাঠ করা উত্তম। মজলিসে আল্লাহর জিকির ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠের গুরুত্ব রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো দল যে মজলিসে বসে আল্লাহকে স্মরণ করে না এবং নবীজির ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করে না, তারা সেই মজলিসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ (তিরমিজি ৩৩৮০)
৭. মসজিদে প্রবেশের সময়
মসজিদে প্রবেশের সময় সাধারণ জিকির ও দোয়ার পাশাপাশি নবীজির (সা.) ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করা যায়।
৮. মদিনায় রওজা জিয়ারতের সময়
মদিনায় মসজিদে নববিতে প্রবেশের সময়ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করা। বিশেষ করে মদিনা মুনাওয়ারায় মসজিদে নববিতে প্রবেশ করলে এবং তার রওজা জিয়ারত করার সময়ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সালাম ও দরুদ শরিফ পেশ করা উচিত।
এটি তার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশের সুন্দর মাধ্যম।
৮. বিপদ-আপদ ও দুশ্চিন্তার সময়
বিপদ-আপদ, দুশ্চিন্তা ও সংকটের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করার পাশাপাশি দরুদ শরিফ পাঠ করা যায়। দরুদ শরিফ পাঠ নিজেই একটি ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। তাই বিপদের সময়ও বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠের অভ্যাস রাখা উচিত।
৯. বই, চিঠি ও লেখালেখির সময়
ইসলামি বই, প্রবন্ধ, চিঠি কিংবা অন্য কোনো লেখায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উল্লেখ করলে তার নামের সঙ্গে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ লেখা বা বলা উচিত। এটি নবীজির প্রতি সম্মান প্রকাশের একটি সুন্দর প্রচলিত রীতি।
দরুদ শরিফ এমন একটি বরকতময় আমল, যার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর রহমত লাভ করতে পারেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন। একবার দরুদ শরিফ পাঠে আল্লাহর পক্ষ থেকে দশবার রহমত লাভ, কিয়ামতের দিন নবীজির নৈকট্য অর্জনসহ অসংখ্য ফজিলতের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
তাই শুধু বিশেষ দিন কিংবা বিশেষ সময়ে নয়, বরং জীবনে প্রতিটি দিন ও রাতে দরুদ শরিফ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। কাজের ফাঁকে, অবসর সময়ে, নামাজের পর এবং বিশেষ করে জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ শুধু মুখের দাবির বিষয় নয়, বরং তার প্রতি ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করা, তার সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তার আদর্শে জীবন গড়ার মধ্য দিয়েই সেই ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ ঘটে। তাই আসুন, জীবনের প্রতিটি দিনের আমলনামাকে দরুদ শরিফের সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ করি। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে দরুদ শরিফের আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: ইসলামিক স্কলার, মুফাচ্ছিরে কুরআন ও পীর সাহেব, শাজুলিয়া দরবার শরিফ




