দরুদ ও সালাম পাঠের অলৌকিক বরকত ও সুসংবাদ
Advertisement
মুহাম্মাদ রুহুল্লাহ শাজুলি
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা গচ্ছিত থাকে। আর এই মহব্বত প্রকাশের সবচেয়ে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হলো নবীজির (সা.) ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করা। এটি শুধু একটি ইবাদত বা দায়িত্বই নয়, বরং মুমিনের জীবনকে রহমত, বরকত ও প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেওয়ার এক অলৌকিক চাবিকাঠি। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠান। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর ওপর দরুদ পাঠ কর এবং পরম শ্রদ্ধায় সালাম পেশ কর।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫৬)
হাদিসের আলোকে দরুদ ও সালাম পাঠের ৯টি বিস্ময়কর ফজিলত ও অলৌকিক বরকত তুলে ধরা হলো—
১. অবারিত কল্যাণ ও দশ গুণ রহমত লাভ
প্রিয়নবীর (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার ওপর বিশেষ রহমত ও বরকত নাজিল করেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন—
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلاَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا
‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তার ওপর ১০টি রহমত নাজিল করবেন।’ (মুসলিম ৪০৮, তিরমিজি ৪৮৫)
অন্য বর্ণনায় হজরত আনাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে একবার দরুদ পড়বে— আল্লাহ তার ওপর ১০টি রহমত নাজিল করবেন, ১০টি পাপ মুছে দেবেন এবং মর্যাদা ১০ ধাপ বাড়িয়ে দেবেন।’ (নাসাঈ ১২৯৭, মুসনাদে আহমাদ ১২০০৫)। অন্য সনদে ১০টি নেকি লেখার কথাও এসেছে। (তাবারানি ২২/৫১৩, মুসনাদে আহমাদ ৭৫৬১)
২. ফেরেশতাদের বিশেষ দোয়া লাভ
যতক্ষণ বান্দা দরুদ পাঠে ব্যস্ত থাকে, ফেরেশতারাও ততক্ষণ তার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করতে থাকেন। হজরত আমের ইবনে রবিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবায় ইরশাদ করেন—
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصَلِّي عَلَيَّ إِلاَّ صَلَّتْ عَلَيْهِ الْمَلاَئِكَةُ مَا صَلَّى عَلَيَّ، فَلْيُقِلَّ عَبْدٌ مِنْ ذَلِكَ أَوْ لِيُكْثِرْ
‘আমার ওপর দরুদ পাঠকারী যতক্ষণ দরুদ পড়তে থাকে, ফেরেশতারাও ততক্ষণ তার জন্য দোয়া করতে থাকেন। সুতরাং বান্দা চাইলে দরুদ কমও পড়তে পারে বা বেশিও পড়তে পারে।’ (মুসনাদে আহমাদ ১৫৭১৫, ইবনে মাজাহ ৯০৭)
৩. ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি
জীবনের যাবতীয় চাওয়া-পাওয়া ও চিন্তামুক্তির সহজ উপায় হলো বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজিকে বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি আমার দোয়ার পুরো অংশই আপনার দরুদের জন্য নির্ধারণ করতে চাই।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন—
إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ، وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ
‘তাহলে তো তোমার সব চিন্তা ও মকসুদ হাসিলের জন্য এটাই যথেষ্ট হবে এবং তোমার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (তিরমিজি ২৪৫৭)
৪. কেয়ামতের দিন নবীজির সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার সৌভাগ্য
পরকালে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য পাওয়ার প্রধান উপায় দরুদ পাঠ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلاَةً
‘কেয়ামতের দিন ওই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী ও প্রিয় হবে, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে।’ (তিরমিজি ৪৮৪)
৫. নবীজির সুপারিশ বা শাফায়াত অবধারিত হওয়া
নবীজির শাফায়াত লাভের বিশেষ দরুদ সম্পর্কে হজরত রুওয়াইফি ইবনে সাবিত আল-আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এই দরুদ পড়বে তার জন্য আমার সুপারিশ ওয়াজিব হয়ে যাবে—
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَنْزِلْهُ الْمَقْعَدَ الْمُقَرَّبَ مِنْكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আনজিলহুল মাক্বআদাল মুক্বাররাবা মিনকা ইয়াওমাল ক্বিয়ামাহ।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ নাজিল করুন এবং কেয়ামতের দিন তাঁকে আপনার নিকটবর্তী আসনে সমাসীন করুন।’ (আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি ৪৪৮১, মাজমাউজ জাওয়ায়িদ ১০/২৫৪)
৬. সওয়াবের পাত্র কানায় কানায় পূর্ণ হওয়া
আহলে বাইত ও নবীজির ওপর পূর্ণাঙ্গ বরকত পেতে বিশেষ দরুদ পাঠের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে চায় তার সওয়াবের পাত্র কানায় কানায় ভরে দেওয়া হোক, সে যেন এভাবে দরুদ পড়ে—
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ وَأَزْوَاجِهِ أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ وَذُرِّيَّتِهِ وَأَهْلِ بَيْتِهِ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যি ওয়া আযওয়াঝিহি উম্মাহাতিল মুমিনিনা ওয়া জুররিয়্যাতিহি ওয়া আহলি বাইতিহি কামা সাল্লাইতা আলা আলি ইবরাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! দরুদ নাজিল করুন উম্মুল মুমিনিন স্ত্রীগণ, সন্তান-সন্ততি ও আহলে বাইতসহ উম্মি নবী মুহাম্মদের (সা.) ওপর— যেমন দরুদ নাজিল করেছিলেন ইবরাহিম (আ.)-এর পরিবারের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।’ (আবু দাউদ ৯৮২)
৭. অসচ্ছলদের জন্য সদকার সমান সওয়াব
যাদের অর্থ দান করার আর্থিক সামর্থ্য নেই, তারা দরুদের মাধ্যমে দান-সদকার সওয়াব লাভ করতে পারেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলমান দান করতে অসমর্থ হলে সে যেন দোয়ায় বলে—
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ وَصَلِّ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন আবদিকা ওয়া রাসুলিকা ওয়া সাল্লি আলাল মুমিনিনা ওয়াল মুমিনাত, ওয়াল মুসলিমিনা ওয়াল মুসলিমাত।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনার বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদের ওপর দরুদ পাঠান এবং সমস্ত মুমিন পুরুষ-নারী ও মুসলিম পুরুষ-নারীর ওপর দরুদ ও রহমত নাজিল করুন।’
এটি তার জন্য জাকাত ও পবিত্রকারী সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (ইবনে হিব্বান ৯০৪)
৮. ফেরেশতাদের মাধ্যমে সরাসরি নবীজির কাছে সালাম পৌঁছানো
উম্মতের প্রতিটি সালাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দরবারে সরাসরি পেশ করা হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ لِلَّهِ مَلاَئِكَةً سَيَّاحِينَ فِي الأَرْضِ يُبَلِّغُونِي مِنْ أُمَّتِي السَّلاَمَ
‘আল্লাহ তাআলার এমন কিছু ভ্রমণকারী ফেরেশতা রয়েছেন, যারা পুরো পৃথিবীতে বিচরণ করেন এবং আমার উম্মতের প্রেরিত সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেন।’ (নাসাঈ ১২৮২, মুসনাদে আহমাদ ৩৬৬৬)
৯. দোয়া কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত
দরুদ ছাড়া যেকোনো দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় আটকে থাকে। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন—
إِنَّ الدُّعَاءَ مَوْقُوفٌ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ لاَ يَصْعَدُ مِنْهُ شَيْءٌ حَتَّى تُصَلِّيَ عَلَى نَبِيِّكَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
‘যে পর্যন্ত তুমি তোমার নবীর ওপর দরুদ না পড়বে, ততক্ষণ দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝে স্থগিত থাকে; তার কিছুই উপরে ওঠে না।’ (তিরমিজি ৪৮৬)
একজন প্রকৃত আশেকে রাসুলের কাছে দরুদ পাঠের মূল প্রেরণা কেবল ফজিলত লাভ নয়, বরং প্রিয় নবীজির অসীম এহসান ও ভালোবাসার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। যিনি সারাজীবন উম্মতের হেদায়েত ও পরকালীন মুক্তির চিন্তায় কান্না করেছেন, তার প্রতি সালাম পেশ করা প্রতিটি মুমিনের আত্মিক কর্তব্য। আসুন, আমরা আমাদের প্রতিদিনের পথচলাকে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠের মাধ্যমে সুরভিত করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি দরুদ পাঠের তৌফিক দিন এবং কেয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরম সুপারিশ নসিব করুন। আমিন।
লেখক: ইসলামিক স্কলার ও মুফাচ্ছিরে কুরআন, পীরসাহেব, শাজুলিয়া দরবার শরিফ

